হালাল- হারাম
Halal and Haram · Hanafi
Question
ব্যক্তি যাকে চিনে না, মানে আমার বাড়িওয়ালাকে আম্মু চিনে না, কখনও আম্মুর যাওয়ারও চান্স নাই ইন শা আল্লাহ।
তাহলে আমার বাড়িওয়ালার নামে যদি, উনি যেসব মন্দ আচরণ করেন আমাদের সাথে সেসব বললে কি গিবত হবে?
আবার উনার ছেলের বউ মোটা, সুন্দর না, উনাদের সাথে একদমই যায় না। এসব বললেও কি ভয়ংকর গিবত হবে, এগুলো বলা কি অনুচিত?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। গিবত (পরনিন্দা) সম্পর্কে ইসলামের বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে গিবতের সংজ্ঞা ও তার শর্তগুলো বুঝে নেওয়া জরুরি।
গিবতের সংজ্ঞা ও শর্ত
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গিবতের সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: "তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে।" জিজ্ঞেস করা হলো, "যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে তা থাকে?" তিনি বললেন, "যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে তা থাকে, তবুও তা তার গিবত হবে। আর যদি তা না থাকে, তবে তা হবে অপবাদ (বুহতান)।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
আপনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন—বাড়িওয়ালার মন্দ আচরণ এবং তার ছেলের বউ সম্পর্কে মন্তব্য—এগুলো যদি সত্য হয়, তবুও তা বলা গিবত হবে। কারণ, গিবতের জন্য শর্ত হলো, ব্যক্তিটি উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক, সে পরিচিত হোক বা না হোক, তার সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে শুনলে অপছন্দ করবে। বাড়িওয়ালাকে আপনার আম্মু চেনেন না বা তার সাথে যাতায়াত নেই, এর কারণে গিবতের গুনাহ মাফ হবে না। গুনাহের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচিতি বা অপরিচিতি কোনো শর্ত নয়।
কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি পছন্দ করবে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খায়? তোমরা তো তা ঘৃণাই করো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
এই আয়াতে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা কত বড় জঘন্য অপরাধ তা বোঝা যায়। হাদিসে এসেছে, মিরাজের রাতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যান যারা তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক খামচে ছিঁড়ছিল। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বলেন, "এরা হলো গিবতকারী এবং মানুষের সম্মানহানি কারী।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৭৮)
গিবতের ব্যতিক্রম (যেখানে বলা জায়েজ)
তবে ইসলামে কিছু বৈধ কারণ থাকলে গিবত করা জায়েজ আছে। ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন: রদ্দুল মুহতার) ছয়টি ক্ষেত্রে গিবত জায়েজ বলা হয়েছে:
১. অত্যাচারীর অভিযোগ: কারো দ্বারা অত্যাচারিত হলে, বিচারক বা ক্ষমতাবানের কাছে তার অত্যাচারের কথা বলা জায়েজ। (সূরা আন-নিসা: ১৪৮) ২. সাহায্য প্রার্থনা: কোনো অন্যায় পরিবর্তন করার জন্য বা ফতোয়া জানার জন্য কারো মন্দ আচরণের কথা আলেম বা সাহায্যকারীকে বলা। ৩. সতর্ক করা: কোনো মুসলিমকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য কারো দোষ সম্পর্কে সতর্ক করা। যেমন: কোনো মেয়ের সাথে বিবাহের প্রস্তাব এলে, তার সম্পর্কে খোঁজ নিলে সত্য বলা। ৪. ফাসিক প্রকাশ্য: যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাপাচার করে এবং নিজের পাপ নিয়ে গর্ব করে, তার পাপ সম্পর্কে বলা। ৫. পরিচয়: কাউকে চেনানোর জন্য তার পরিচিত নাম বা ডাকনাম ব্যবহার করা, যদিও তাতে তার দোষ প্রকাশ পায়। ৬. মশবাহাত: কোনো কাজে অংশগ্রহণকারীকে বোঝানোর জন্য বলা।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে সমাধান
আপনি বলেছেন, বাড়িওয়ালা আপনার সাথে মন্দ আচরণ করেন। এই ক্ষেত্রে আপনি যদি ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য বা অন্যায় প্রতিরোধের জন্য তার আচরণের কথা অন্য কাউকে (যেমন: পরিবারের অন্য সদস্য, পুলিশ, বা অভিভাবক) বলেন, তবে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু শুধু মনের ক্ষোভ থেকে বা তার সমালোচনা করার জন্য তার নাম উল্লেখ করে তার মন্দ আচরণের কথা বলা গিবত হবে এবং তা হারাম।
আর তার ছেলের বউ মোটা বা সুন্দর না—এটি সম্পূর্ণরূপে তার ব্যক্তিগত বিষয়, যা নিয়ে আলোচনা করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি তার শারীরিক গঠন নিয়ে পরিহাস বা সমালোচনা, যা গুনাহের কাজ। এতে কোনো বৈধ কারণ নেই, তাই এটি গিবত এবং ভয়ংকর গুনাহ। হাদিসে এসেছে, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার মুসলিম ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করে।" (মুসনাদে আহমাদ)
করণীয়
১. তাওবা করুন: আপনি যদি ইতিমধ্যে এসব কথা বলে থাকেন, তবে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করুন। গিবতের কাফফারা হলো, যে ব্যক্তির গিবত করা হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া (যদি তা জানা যায় এবং ক্ষতি না হয়) অথবা তার জন্য ইস্তিগফার করা। ২. কথা বলা বন্ধ করুন: ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকুন। ৩. সতর্কতা: প্রয়োজনে ক্ষতি থেকে বাঁচতে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য দিন, তবে কারো নাম নিয়ে অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা করবেন না। আল্লাহই ভালো জানেন।