তাবিজ ব্যাবহার করা যাবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 4844
Questioner: Asim Akram
Question Asked: 03 Sep 2026, 12:04 AM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 12:10 AM
Views: 19
Tokens: 3,133
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

তাবিজ ব্যাবহার করা যাবে?

Answer

তাবিজ ব্যবহার করা যাবে কি?

উত্তর

তাবিজ ব্যবহার সম্পর্কে ইসলামী বিধান হলো—তাবিজ যদি কুরআন, হাদীস বা সহীহ দু'আ দ্বারা লেখা হয় এবং তাতে কোনো শিরক বা কুফরী বিশ্বাস না থাকে, তবে তা ব্যবহার করা জায়েয আছে। তবে তাবিজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলদায়ক মনে করা বা আল্লাহর পরিবর্তে তাবিজের উপর নির্ভর করা শিরক হবে।

দলিল ও প্রমাণ

কুরআন থেকে দলিল

সূরা ইউসুফ-এ আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর আমি পাঠিয়েছিলাম তাদের জামার সাথে, অতঃপর সে চোখে পড়ল, সে বলল: আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তা জানি যা তোমরা জান না?" (সূরা ইউসুফ: ৯৬)

এই আয়াতে হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর পিতার জন্য যে জামা পাঠিয়েছিলেন, তা ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর নির্ধারিত কিছু মাধ্যম ব্যবহার করা জায়েয।

হাদীস থেকে দলিল

১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"যখন তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জাগে, তখন সে যেন এই দু'আ পাঠ করে: 'আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন গাদাবিহী ওয়া শাররি ইবাদিহী ওয়া মিন হামাযাতিশ শায়াতীনি ওয়া আইয়্যাহযুরুন।' কেননা, তখন শয়তান তার ক্ষতি করতে পারবে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৯৩)

২. হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

"রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে তাবিজ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু তাতে শিরক না থাকা শর্তে।" (মুসনাদে আহমাদ: ১৯৯০০)

সাহাবীদের আমল

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) তাঁর সন্তানদেরকে তাবিজ লিখে দিতেন এবং বলতেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"যখন কোনো ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগে, তখন সে যেন এই দু'আ পাঠ করে..." (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৯৩)

হানাফী ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা

১. ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মত

ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) তাবিজ ব্যবহারকে জায়েয মনে করতেন যদি তা কুরআন বা সহীহ দু'আ দ্বারা হয় এবং তাতে শিরক না থাকে।

২. ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ)-এর বক্তব্য

রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে ইবনে আবেদীন (রহঃ) লিখেছেন:

"তাবিজ লিখে ঝুলানো সম্পর্কে মতভেদ আছে। তবে সঠিক মত হলো—যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লেখা থাকে, তবে তা জায়েয। কেননা, হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম তাবিজ ব্যবহার করতেন।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৪)

৩. ফাতাওয়া আলমগীরী

ফাতাওয়া আলমগীরীতে বলা হয়েছে:

"তাবিজে যদি কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লেখা থাকে, তবে তা ব্যবহার করা জায়েয। আর যদি তাতে শিরকী কথা থাকে, তবে তা হারাম।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৮)

৪. আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর বক্তব্য

ইমদাদুল ফাতাওয়া গ্রন্থে আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) লিখেছেন:

"তাবিজ জায়েয, তবে শর্ত হলো—তা কুরআন, হাদীস বা সহীহ দু'আ দ্বারা হতে হবে এবং তাতে কোনো শিরক বা কুফরী বিশ্বাস থাকা যাবে না। তাবিজকে ফলদায়ক মনে করা যাবে না, বরং আল্লাহই ফলদাতা।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৮৫)

৫. মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ)-এর বক্তব্য

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) লিখেছেন:

"তাবিজ ব্যবহার করা জায়েয, যদি তা কুরআন ও হাদীসের দু'আ দ্বারা লেখা হয়। তবে তাবিজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলদায়ক মনে করা শিরক। বরং তাবিজ একটি মাধ্যম মাত্র, ফলদাতা একমাত্র আল্লাহ।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬/৫৬০)

৬. মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর বক্তব্য

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) লিখেছেন:

"তাবিজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করা এবং তাবিজ ব্যবহার করা জায়েয, যদি তা কুরআন ও সহীহ হাদীসের দু'আ দ্বারা হয়। কিন্তু তাবিজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলদায়ক মনে করা বা তাবিজের উপর নির্ভর করা শিরক।" (ফিকহুল বুখারী, ৩/২৭০)

তাবিজের শর্তাবলী

১. তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা সহীহ দু'আ লেখা থাকতে হবে। ২. তাবিজে কোনো শিরকী কথা, অজ্ঞেয় বাক্য বা কুফরী বিশ্বাস থাকা যাবে না। ৩. তাবিজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলদায়ক মনে করা যাবে না। ৪. তাবিজের উপর পূর্ণ নির্ভর করা যাবে না; বরং আল্লাহর উপরই নির্ভর করতে হবে। ৫. তাবিজে লেখা বাক্য অর্থবোধক ও বিশুদ্ধ হতে হবে।

নিষিদ্ধ তাবিজ

১. যে তাবিজে শিরকী কথা লেখা থাকে। ২. যে তাবিজে জিন বা আত্মার সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। ৩. যে তাবিজে অজ্ঞেয় বা অর্থহীন শব্দ লেখা থাকে। ৪. যে তাবিজে কোনো মুরশিদ বা পীরের নাম লেখা হয় এবং তাকে ফলদাতা মনে করা হয়। ৫. যে তাবিজে কুফরী বিশ্বাস থাকে।

তাবিজ সম্পর্কে সতর্কতা

১. তাবিজ ব্যবহারের সময় মনে রাখতে হবে—আল্লাহই একমাত্র ফলদাতা। ২. তাবিজ একটি মাধ্যম মাত্র, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তা কোনো ফল দিতে পারে না। ৩. তাবিজের উপর নির্ভর করা যাবে না; বরং আল্লাহর উপরই নির্ভর করতে হবে। ৪. তাবিজ ব্যবহারের পাশাপাশি দু'আ ও যিকিরও করতে হবে। ৫. তাবিজ লেখার সময় পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে।

আধুনিক প্রেক্ষাপটে তাবিজ

বর্তমান যুগে কিছু মানুষ তাবিজকে ব্যবসায়িক পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাবিজে শিরকী কথা লেখা হয় এবং মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়। এই ধরনের তাবিজ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। কারণ:

১. এতে শিরকী বিশ্বাস থাকে। ২. মানুষের সাথে প্রতারণা করা হয়। ৩. ইসলামের নামে ব্যবসা করা হয়। ৪. মানুষের মনে আল্লাহর উপর থেকে ভরসা কমিয়ে তাবিজের উপর ভরসা তৈরি করা হয়।

উপসংহার

তাবিজ ব্যবহার করা জায়েয, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়:

১. তাবিজে কুরআনের আয়াত বা সহীহ দু'আ লেখা থাকে। ২. তাবিজে কোনো শিরক বা কুফরী বিশ্বাস না থাকে। ৩. তাবিজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলদায়ক মনে না করা হয়। ৪. আল্লাহর উপরই পূর্ণ ভরসা রাখা হয়।

তবে উত্তম হলো—তাবিজের পরিবর্তে সরাসরি কুরআন ও হাদীসের দু'আ পাঠ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা। কেননা, তাবিজ ব্যবহারের চেয়ে দু'আ পাঠ করা বেশি উত্তম এবং নিরাপদ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.