পিতা যদি সন্তানদের সাথে সদাচরণ না করে, তাহলে সন্তানের করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন:
একজন পিতা যদি তার ছেলেদের প্রতি তাদের প্রাপ্য অধিকার (proper হক) আদায় না করেন, তাদের সাথে ভালোভাবে কথা না বলেন, সবসময় রাগান্বিত ও মারমুখী থাকেন, অন্যদের দিয়ে তাদের মারতে চান, ঝগড়া-ফ্যাসাদ করেন, সন্তানের মাকে অসম্মান করেন এবং ছেলেদের মায়ের সাথে কথা বলতে বাধা দেন, তাহলে ছেলে হিসেবে তার সাথে কতটুকু দায়িত্ব পালন করা উচিত?
উত্তর:
ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার (ইহসান) এবং তাদের আনুগত্য ফরজ। তবে এটি শর্তযুক্ত যে, পিতা যদি আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ দেন, তাহলে তার আনুগত্য করা যাবে না। পিতার প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নরূপ:
১. পিতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব:
-
পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব হলো: তাকে সম্মান করা, তার কথা শোনা (যদি তা শরিয়ত-বিরোধী না হয়), তার খেদমত করা, প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করা এবং তার সাথে সুন্দর আচরণ করা।
-
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের কোনো একজন বা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ্' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)
-
হাদিসে এসেছে:
নবীজি (সা.) বলেছেন: "পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)
২. পিতার অন্যায় আচরণের ক্ষেত্রে সন্তানের করণীয়:
-
পিতা যদি অন্যায় কাজ করেন (যেমন: মারধর, স্ত্রীকে অসম্মান, ঝগড়া-ফ্যাসাদ), তাহলে সন্তানের জন্য তার আনুগত্য করা জায়েজ নেই। তবে পিতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ না করে বরং সম্ভাব্য উপায়ে তাকে নাসিহাত (উপদেশ) দেওয়া ও তার অন্যায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা উচিত।
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, পিতা যদি সন্তানকে কোনো গুনাহের কাজের নির্দেশ দেন, তাহলে সন্তান তা মানতে বাধ্য নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮২)
-
পিতা যদি নিজের স্ত্রী (সন্তানের মা)-এর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করেন, তবে সন্তানের জন্য মায়ের পক্ষ নেওয়া এবং পিতাকে ভদ্রভাবে বোঝানো উচিত। মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ মানা যাবে না।
৩. ছেলে হিসেবে দায়িত্বের সীমা:
- সম্পর্ক ছিন্ন না করা: পিতার খারাপ আচরণের কারণে তাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করা জায়েজ নয়। যতটুকু সম্ভব, তার সাথে যোগাযোগ রাখা এবং তার প্রয়োজনে সাহায্য করা আবশ্যক।
- নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি রক্ষা: পিতা যদি শারীরিকভাবে আঘাত করেন বা অন্যের মাধ্যমে মারতে চান, তাহলে সন্তানের জন্য নিজেকে রক্ষা করা জরুরি। এক্ষেত্রে পিতার কাছ থেকে দূরে থাকা বা সাময়িকভাবে সম্পর্ক সীমিত করা বৈধ।
- মায়ের প্রতি দায়িত্ব: পিতা যদি মায়ের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেন, তবে সন্তানের জন্য মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তার সেবা করা ফরজ। পিতার এই নির্দেশ মানা যাবে না।
৪. ফতোয়া ও উলামাদের দিকনির্দেশনা:
-
ফতোয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ায় বলা হয়েছে:
"পিতা-মাতা যদি অন্যায় আচরণ করেন, তবুও তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা বা তাদের অপমান করা জায়েজ নয়। বরং তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলা, তাদের ভালো কাজে সহযোগিতা করা এবং মন্দ কাজে বাধা দেওয়া উচিত।"
-
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"পিতা যদি সন্তানের প্রতি জুলুম করেন, তবুও সন্তানের উচিত পিতার প্রতি দোয়া করা এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। কিন্তু পিতার জুলুম সহ্য করা জরুরি নয়; বরং নিজেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।" (মারিফুল কুরআন, সূরা বনি ইসরাইলের তাফসির)
সারসংক্ষেপ:
ছেলে হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো:
১. পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, তার প্রতি দোয়া করা এবং সম্ভব হলে তাকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করা।
২. পিতার অন্যায় নির্দেশ (যেমন: মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা) মানা যাবে না।
৩. নিজের ও মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পিতা যদি শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন, তাহলে আইনি বা পারিবারিকভাবে প্রতিকার চাওয়া বৈধ।
৪. পিতার প্রতি ঘৃণা না পোষণ করে বরং তার জন্য দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।