পিতা-মাতার ইসলামবিরোধী আচরণ, সুদ, বিয়েহীনতা ও পারিবারিক কলহের শরীয়তী সমাধান।
Family Life · Hanafi
Question
আমার পরিবারে অনেকে বছর যাবত বিবাদ লেগেই আছে। যা আমাদের ভাই বোনদের সাথে আমাদের বাবা মায়ের মধ্যে হচ্ছে । আমাদের বাবা মা আমাদের হক আদায়ে একদমই উদাসীন।উপযুক্ত ছেলে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা ,আত্মীয়র সম্পর্ক না রাখা(আমাদের সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে ) ,মানুষকে কষ্ট দেওয়া,গালি দেওয়া ,মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া , নিরীহ প্রাণীদের কারণ ছাড়াই মারা, আমাদের নিজের ব্যবস্থা নিজেদের করতে বলা সহ এমন অনেক অনেক ইসলাম বিরোধী কাজ আমাদের মা বাবা করে যাচ্ছে । বলা বাহুল্য তাদের মধ্যে কোনো দ্বীনের বুঝ নেই এবং তারা পরকালের পরিণতির কথা শুনতেই রাজি না । এতো বছর ধরে আমার বড় ভাই এসব ভালো খারাপ বুঝিয়েও কোনো ফল পাইনি। বরং এখন উনারা ভাইয়াকে সহ্যই করতে পারে না । আমাদের কারো বিয়ের কথা ভাবছে না , কোনো রকম দায়িত্ব পালন করছে না । অনেকে বলছে কেউ কালো জাদু করেছে আবার অনেকে বলছে বদনজর লেগেছে আমাদের পরিবারের উপর। এমতাবস্থায় আমাদের কি করা উচিত? আমাদের পরিবার টা একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে ।আমাদের বাবা মা অনেক বেশি উগ্র আর অসভ্যের মতো ব্যবহার করে এখন। এমন কোনো আত্মীয় বা বড়জন নেই যার কথা তারা মানবে ,সবার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে রাখার কারণে কেউ মাথা ঘামাই না ।আমরা ভাই বোন সবাই আলহামদুলিল্লাহ উচ্চ শিক্ষিত ।তাদের এরকম ব্যবহার আর অন্যায় আমরা মেনে নিতে পারছি না । সকলেরই বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে । আমাদের সম্পদের কোনো অভাব নেই । কিন্তু আমাদের বাবা টা সঠিক ব্যবহার করতে দিচ্ছেন না।সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে না পারার কারণে সুদের উপর টাকা ধার নিয়ে চলছে এবং আমাদের হারাম খাওয়াচ্ছে ।অনেক অনেক বার বুঝিয়েছি তাদের। তারা কোনো রকম সমাধান করতে রাজি না আমাদের সাথে । শুধু বলে খাচ্ছি ,থাকছি ব্যাস হয়েছে আর কিছু লাগবে না। আমাদের কি করা উচিত দয়া করে বলুন উস্তাদ জ্বি।কোনো রুকাইয়া করতে হবে নাকি অন্য কোনো সমাধান?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার পরিবারের এই জটিল পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টদায়ক, বিশেষ করে যখন পিতা-মাতাই ইসলামী দায়িত্ব পালনে উদাসীন এবং উগ্র মেজাজে আচরণ করছেন। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন তিনি আপনাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন এবং আপনার পিতা-মাতার হেদায়াত দান করেন। উত্তরে আমরা কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব।
১. পিতা-মাতার হক ও সন্তানের কর্তব্য
পিতা-মাতার হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ২৩)
তবে পিতা-মাতার আনুগত্য কেবল বৈধ বিষয়ে। যদি তারা ইসলাম বিরোধী কাজ করে বা সন্তানের উপর জোর করে তাহলে সে ক্ষেত্রে আনুগত্য জায়িয নেই। হাদীসে এসেছে:
“সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (বুখারী, মুসলিম)
আপনার পিতা-মাতার আচরণ (গালি দেওয়া, প্রাণী হত্যা, সুদী লেনদেন, সন্তানের বিয়ে না দেওয়া ইত্যাদি) ইসলামী শরীয়তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই অবস্থায় আপনাদের কর্তব্য হলো:
- তাদের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রেখে নরম ভাষায় বোঝানো।
- কঠোর বা তর্কাতর্কি না করা, কারণ তা পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে।
- তাদের জন্য দোয়া করা বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময়।
২. সুদ (রিবা) ও হারাম খাদ্য থেকে বাঁচার উপায়
আপনার পিতা সুদের উপর টাকা ধার নিয়ে চলছেন এবং তা দিয়ে খরচ করছেন। যদি তিনি জোর করে সুদী অর্থ খাওয়ান, তাহলে আপনাদের জন্য তা গ্রহণ করা জায়িয নয়। তবে বাধ্য হয়ে খেতে হলে কেবল প্রাণ বাঁচানোর পরিমাণ গ্রহণ করা যেতে পারে।
- শরীয়তী হুকুম: সুদী লেনদেনে অংশগ্রহণ করা হারাম। পিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। যদি কোনোভাবেই না মানেন, তাহলে আপনারা নিজ নিজ উপার্জন বা হালাল আয়ের ব্যবস্থা করুন।
- যদি পিতা নিজের সম্পদ থেকে আপনাদের খাওয়ান, এবং তাতে সুদ মিশ্রিত থাকে, তাহলে সেটা গ্রহণ না করাই উত্তম। রাদ্দুল মুহতার (৫/৩৬০) এ এসেছে: “যে ব্যক্তি জানে যে তার পিতার খাদ্য হারাম, সে সেই খাদ্য খাবে না, তবে যদি ক্ষুধায় মারা যাওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে প্রাণ বাঁচানোর পরিমাণ খেতে অসুবিধা নেই।”
৩. বিয়ের ব্যবস্থা ও পিতার দায়িত্ব
ইসলামে পিতা-মাতার উপর সন্তানের বিয়ের ব্যবস্থা করা ওয়াজিব (যদি প্রয়োজন হয়)। ইমাম হাসকাফী (রহ.) বলেন:
“পিতার জন্য তার সন্তানের বিয়ে দেওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, যদি সন্তান বিয়ের প্রয়োজনীয়তা বোধ করে এবং সামর্থ্য থাকে।” (দুররুল মুখতার, ৩/১৫৬)
যেহেতু আপনার পিতা বিয়ের বিষয়ে উদাসীন, তাই আপনারা নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে পারেনে, তবে পিতার অনুমতি ছাড়া নয়। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী:
- ছেলের ক্ষেত্রে: পিতা যদি ন্যায্য কারণে বিয়ে দিতে না চান, তাহলে পুত্র পিতার অনুমতি ছাড়া কাযী বা ইসলামী আদালতের সাহায্য নিয়ে বিয়ে করতে পারে।
- মেয়ের ক্ষেত্রে: পিতা-মাতা যদি মেয়ের বিয়ে না দেন, তাহলে মেয়ে ইসলামী আদালতে অভিযোগ করতে পারে। কাযী বা স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে পিতাকে আদেশ দেয়া যেতে পারে।
তবে মনে রাখবেন, পিতার অনুপস্থিতিতে বা অসহযোগিতায় মেয়ের পক্ষে অন্য মাহরাম (যেমন চাচা, ভাই) ইত্যাদি ওয়ালি হিসেবে কাজ করতে পারে।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নতা
আপনাদের পিতা-মাতা আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। এটা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না।” (বুখারী, মুসলিম)
আপনাদের কর্তব্য হলো নিজের পক্ষ থেকে আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখা, যদিও পিতা-মাতা বিরক্ত হন। তাদের উগ্র ব্যবহার সহ্য করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সন্তানের জন্য সওয়াবের কাজ।
৫. কালো জাদু ও বদনযর (নযর-বদ)
আপনাদের পরিস্থিতিতে সহানুভূতিশীল আত্মীয়-স্বজনরা যা বলছেন, তা সম্ভব। ইসলামে জাদু ও বদনযরের কথা স্বীকৃত। তাই রুকইয়া (কুরআনি ঝাড়ফুঁক) করানো এবং নিজে কিছু আমল করা জরুরি।
- প্রস্তাবিত রুকইয়া: সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পড়া। পাশাপাশি “বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা’আসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা’ই ওয়া হুয়াস সামীউল আলীম” পড়া।
- উত্তম রুকইয়া হলো কোনো বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে করা। তবে নিজেরাও করতে পারেন।
৬. সর্বোপরি কল্যাণের দোয়া ও ধৈর্য
এমতাবস্থায় আপনাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দোয়া এবং দ্বীনি আলেমের পরামর্শ।
- দোয়া: “রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইয়ুনিন ওয়াজ্আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা” (সূরা ফুরকান, ৭৪)
- প্রতিদিন সূরা আল-ইমরানের শেষ রুকু (১৯০-২০০ আয়াত) পড়া বরকতময়।
আপনাদের যেমন সম্পদ আছে, তেমনই শিক্ষিত হওয়ায় নিজেরা উপার্জনের এবং পরিবার চালানোর যোগ্য। বিয়ের বয়স হয়ে গেলে পিতার অনুমতি ছাড়া ইসলামী আদালত অথবা স্থানীয় আলেমের শরণাপন্ন হতে দ্বিধা করবেন না।
সংক্ষিপ্ত সমাধান:
- পিতা-মাতার জন্য ক্রমাগত দোয়া করুন এবং নরম ভাষায় দ্বীন বুঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
- সুদী সম্পদ থেকে দূরে থাকুন এবং নিজেরা হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করুন।
- বিয়ের বিষয়ে অভিভাবকদের অসহযোগিতায় আলেম বা কাযীর সাহায্য নিন।
- কালো জাদুর সম্ভাবনা থাকলে রুকইয়ার ব্যবস্থা করুন।
- আত্মীয় ও সমাজের ভালো লোকদের সাথে যোগাযোগ রেখে তাদের মাধ্যমে পিতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তায়ালা আপনাদের পরিবারে শান্তি ও হেদায়াত দান করুন। আমীন।
ওয়াল্লাহু ওয়া রসূলুহু আ’লাম।