আপনজনকে অভিশাপ দিয়ে দেয়ার পর নিজের কাছে অস্বস্তি লাগলে করণীয় কি? অভিশাপ কিভাবে ফিরানো যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
খুবই ছোট একটি বিষয়ের ওপর মতবিরোধ হওয়ায় আমার স্বামী আমার চেহারায় আঘাত করেন, মনের কষ্ট ও ক্রোধ থেকে আমি তাকে খুবই কঠোর ভাবে অভিশাপ দেই। আমি তাকে বলেছি আল্লাহ একত্ব সত্য হলে তার ওপর বিপদ আসবে।
আমি তার ওপর রাগ সত্যিই কিন্তু আমি ভুল বশত বেশি কঠোর শব্দ ব্যবহার করে ফেলেছি। এমতাবস্থায় আমার করনীয় কি? তার উপর এজন্য আযাব আসবে? আমি তো তাকে মাফও করতে পারছিনা। মনে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছি আমি।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই আপনার কষ্টের কথা বুঝতে পেরেছি। স্বামীর দ্বারা চেহারায় আঘাত পাওয়া নিঃসন্দেহে খুবই বেদনাদায়ক ও অমানবিক আচরণ। ইসলাম এ ধরনের কাজকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। অন্যদিকে, ক্রোধবশত আপনি যে কঠোর অভিশাপ দিয়েছেন, তাও শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। নিচে বিস্তারিত উত্তর ও করণীয় তুলে ধরা হলো।
১. স্বামীর চেহারায় আঘাত করার বিধান
স্বামীর জন্য স্ত্রীর চেহারায় আঘাত করা সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে চেহারায় আঘাত করতে নিষেধ করেছেন।
হাদিস:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَّقِ الْوَجْهَ»
“তোমাদের কেউ যখন প্রহার করে, তখন সে যেন চেহারা থেকে বিরত থাকে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১২)
হানাফি কিতাবের উল্লেখ:
ফাতাওয়া আলমগীরিতে বলা হয়েছে, স্ত্রীকে প্রহার করার অনুমতি শুধুমাত্র নুশূজ (অবাধ্যতা) এর ক্ষেত্রে এবং তাও অত্যন্ত শর্তসাপেক্ষে। তাতে চেহারা, পেট ইত্যাদি স্পর্শকাতর অংশে আঘাত করা জায়েজ নয়।
(ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৪৮৬; রদ্দুল মুহতার, ৩/১৭২)
সুতরাং আপনার স্বামীর এই কাজটি মারাত্মক অন্যায়। তিনি এজন্য আল্লাহর কাছে তওবা করবেন এবং আপনার কাছ থেকে ক্ষমা চাইবেন।
২. অভিশাপ দেওয়ার বিধান
আপনি ক্রোধে বলে ফেলেছেন, “আল্লাহ একত্ব সত্য হলে তার ওপর বিপদ আসবে” – এটি একটি শর্তযুক্ত অভিশাপ। শরিয়তে কোনো মুসলিমকে অভিশাপ দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ।
হাদিস:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «لَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ»
“মুমিনকে অভিশাপ দেওয়া তাকে হত্যা করার মতো।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৪৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫)
হানাফি ফতোয়া:
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, কোনো মুসলিমকে অভিশাপ দেওয়া হারাম এবং তা কবিরা গুনাহ। তবে যদি কেউ অন্যায়ভাবে অভিশাপ দেয় এবং অভিশাপ যথার্থ না হয়, তাহলে তা অভিশাপকারীর ওপর ফিরে আসতে পারে।
(শরহু মা‘আনিল আছার, ২/৩৭০; রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২)
আপনার উক্তিটির মধ্যে “আল্লাহ একত্ব সত্য হলে” বলে তাওহিদের সত্যতার সাথে শর্ত যুক্ত করেছেন। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তাওহিদ অবশ্যই সত্য। তাই আপনার অভিশাপ অত্যন্ত কঠোর এবং ভয়াবহ। তবে আপনার উদ্দেশ্য ছিল স্বামীর ওপর বিপদ আসা, তাওহিদকে অস্বীকার করা নয়। তাই আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে তাওহিদকে অস্বীকার করেননি। তবে শব্দ ব্যবহারে সতর্ক না হওয়ার কারণে এই গুনাহ হয়েছে।
৩. অভিশাপের কারণে কি স্বামীর ওপর শাস্তি আসবে?
আল্লাহর আদালতে শাস্তি নির্ভর করে তাঁর ন্যায় ও হিকমতের ওপর। আপনার অভিশাপের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তি আসবে না, তবে যদি স্বামী অনুতপ্ত না হয় ও আপনার প্রতি জুলুম চালিয়ে যায়, তাহলে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি আসতে পারে। কিন্তু আপনি নিজেও এই অভিশাপের কারণে গুনাহগার হয়েছেন। তাই আপনার উচিত তওবা করা।
হাদিস:
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «لَا تَلْعَنُوا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُجِيبُ لَعْنَةَ الظَّالِمِ عَلَى الْمَظْلُومِ»
“তোমরা অভিশাপ দিও না, কারণ আল্লাহ অত্যাচারিতের অভিশাপও (অনেক সময়) কবুল করেন না।”
(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১৪৭৬০; সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯০২)
অর্থাৎ, সব অভিশাপই কবুল হয় না। তবে আপনার ক্ষেত্রে আপনি নিজেই স্বীকার করছেন যে আপনি ভুল শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাই তওবাই একমাত্র পথ।
৪. এখন আপনার করণীয়
ক. তওবা ও ইস্তিগফার:
আপনি যে কঠোর ভাষায় স্বামীকে অভিশাপ দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করুন। তওবার শর্ত:
- গুনাহর কাজ বন্ধ করা।
- অনুতপ্ত হওয়া।
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প।
বিশেষ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي تَوَبْتُ إِلَيْكَ مِنْ لَعْنِي لِزَوْجِي، وَأَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
“হে আল্লাহ, আমি আমার স্বামীকে অভিশাপ দেওয়া থেকে তোমার কাছে তওবা করছি, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই এবং তওবা করছি।”
খ. স্বামীর প্রতি ক্ষমার মনোভাব গড়ে তোলা:
আপনি এখন মনে ব্যথা পেয়েছেন এবং স্বামীকে মাফ করতে পারছেন না। এটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। তবে ইসলাম উৎসাহিত করে ক্ষমা করতে। আল্লাহ বলেন:
﴿وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ﴾
“যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।”
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)
আপনার জন্য উত্তম হবে ধীরে ধীরে ক্ষমার মন তৈরি করা। তবে জোর করে মাফ করতে বাধ্য না। সময় দিন। এতে আপনার সওয়াব হবে। স্বামী যদি ক্ষমা চায়, তবে ক্ষমা করা ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদার কাজ।
গ. স্বামীর ভূমিকা:
স্বামীকে বোঝানো উচিত যে তিনি মারাত্মক অন্যায় করেছেন। চেহারায় আঘাত করা জুলুম। তার উচিত:
- আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- ভবিষ্যতে কখনো হাত তুলবেন না।
- আপনার মনোভঙ্গ কমানোর চেষ্টা করা।
আপনি যদি তাকে মাফ না করতে পারেন, তবে অন্তত তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন এবং ইসলামি পরিষদ বা পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে সমাধান চাইতে পারেন।
ঘ. দোয়া করুন:
আপনার স্বামীর হিদায়াত ও নিজের ধৈর্যের জন্য দোয়া করুন। নিজের জিহ্বাকে সংযত করতে সাহায্য চান।
৫. প্রশ্নের সরাসরি জবাব
প্রশ্ন: তার ওপর কি আযাব আসবে?
উত্তর: আপনার অভিশাপের কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আযাব আসবে না। তবে যদি স্বামী তার অন্যায়ের জন্য তওবা না করে ও ক্ষমা না চায়, তাহলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতে পারেন। আপনি এই বিষয়ে চিন্তিত হলেও আপনার কর্তব্য শুধু তওবা ও ক্ষমার চেষ্টা করা। শাস্তি আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
প্রশ্ন: আমি তাকে মাফ করতে পারছি না। কী করব?
উত্তর: প্রথমে নিজের মনের ব্যথা স্বীকার করুন এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করুন। সময়ের সাথে হৃদয় নরম হতে পারে। যদি মাফ করা কষ্টকর হয়, তবে জোর করবেন না। তবে অন্তরে ক্ষোভ পুষে রাখবেন না। বরং দোয়া করুন অসীম ধৈর্যের জন্য। ইমাম গাজ্জালী রহ. বলেছেন, “ক্ষমা করলে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন।” (ইহইয়া উলুমিদ্দীন, ৩/১৫৮)
৬. চূড়ান্ত পরামর্শ
- আপনি নিজে তওবা করুন এবং জিহ্বা সংযত করার জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করুন।
- স্বামীকে দ্বীনের বিষয়ে সচেতন করুন, বিশেষ করে স্ত্রীর প্রতি দয়া ও ইহসানের গুরুত্ব বোঝান।
- একান্ত সম্ভব না হলে, কোনো দ্বীনি আলেম বা অভিভাবকের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন।
- মনে রাখবেন, দাম্পত্য কলহে শয়তান বিজয়ী হয়। তাই দুজনে মিলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সংশোধন চান।
রেফারেন্স কিতাব:
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ., ২/৪৫৬-৪৫৮)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি রহ., ৪/২১৫)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন, ৩/১৭২, ৬/৪১২)
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি রহ., ৮ম অধ্যায়, দাম্পত্য অধিকার)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ., সূরা নিসা ৩৪ নং আয়াতের তাফসির)
আল্লাহ আপনার কষ্ট দূর করুন এবং দাম্পত্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন। আমিন।