রুমমেটের প্রেম-ব্রেকআপের কথা শোনা ও পরামর্শ দেওয়ার ইসলামিক বিধান কী?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4053
Questioner: Faishi
Question Asked: 17 Aug 2026, 03:49 AM
Reviewed & Published: 17 Aug 2026, 04:45 AM
Views: 12
Tokens: 4,733
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ

আমি রুম শেয়ার করে থাকি,হোস্টেলে (মেয়ে)।তো আমার রুমমেটের সাথে আমার বেশ ক্লোজ সম্পর্ক & তার ফ্র্যান্ড রা আসলেও টুকটাক গল্প করা হয়

তো এর মধ্যে একজন যার রিলেশন ছিলো এখন ব্রেকআপ হয়েছে।এখানে এসে কান্নাকাটি করে।আমি প্র্যাকটিসিং, তাও আমার কাছে এসেও এটা ওটা বলতে থাকে

চাইলেও এভয়েড করতে পারি না। জিগ্যেস করি কিভাবে হলো,থাক কষ্ট পেয়ো না,আল্লাহর কাছে দুআ করো যেনো সহজ হয়ে যায়
আবার অনেক সময় পরামর্শ চায়, আমি বলি দেখো কি হয়,আল্লাহ ভরসা

আমার ভয় লাগে এসব কথা শোনা বা বলার জন্য আমার বিয়ের পরবর্তী জীবনে কোনো প্রভাব পরবে কিনা

এগুলো কিভাবে ডিল করা উচিত?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিষয়: রুমমেটের প্রেম-ব্রেকআপের কথা শোনা ও পরামর্শ দেওয়ার বিধান


সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার রুমমেটের প্রেম-ব্রেকআপের কথা শোনা, সান্ত্বনা দেওয়া বা পরামর্শ দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ এটি পরকীয়া সম্পর্ক (যিনা) সংক্রান্ত বিষয়, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। এমন আলাপ শোনা, বলা বা তাতে অংশ নেওয়া গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল। তবে আপনার রুমমেট কষ্টে আছে বলে তার প্রতি সহানুভূতি দেখানো এবং তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা ভালো কাজ। কিন্তু প্রেম-ব্রেকআপের বিস্তারিত আলোচনা, কান্নাকাটির কারণ জানতে চাওয়া বা এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।


বিস্তারিত উত্তর

১. পরকীয়া সম্পর্ক ইসলামে হারাম

প্রথমেই জেনে রাখা প্রয়োজন—ইসলামে বিবাহ বহির্ভূত প্রেম-সম্পর্ক (boyfriend-girlfriend relationship) সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং অতি নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)

এই আয়াতে শুধু ব্যভিচারই নয়, বরং তার "কাছেও" যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে সকল কাজ ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়—প্রেমের আলাপ, গোপন সাক্ষাৎ, সম্পর্কের গল্প ইত্যাদি—সবই নিষিদ্ধ।

২. গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অপরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)

প্রেম-ব্রেকআপের গল্প শোনা, তাতে সান্ত্বনা দেওয়া বা পরামর্শ দেওয়া—এসব গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতে করে সেই ব্যক্তি তার হারাম সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে এবং আপনি তা শুনছেন, যা তাকে উৎসাহিত করতে পারে।

৩. রুমমেটের প্রতি করণীয়

আপনার রুমমেট কষ্টে আছে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি হলো:

  • তাকে বুঝান যে এই সম্পর্কটি ইসলামে হারাম ছিল, তাই এটি ভেঙে যাওয়া তার জন্য আসলে রহমত।
  • তাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পরামর্শ দিন, তওবা করার উপদেশ দিন।
  • তাকে বলুন, "আল্লাহ তাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন, যদি সে তওবা করে।"
  • তার জন্য দোয়া করুন, তবে তার সাথে প্রেম-ব্রেকআপের বিস্তারিত আলোচনা করবেন না।

৪. কীভাবে ডিল করবেন

আপনি লিখেছেন, "চাইলেও এভয়েড করতে পারি না"—এটা ঠিক নয়। আপনি চাইলে এভয়েড করতে পারবেন। নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ডিল করতে পারেন:

  • যখন সে প্রেম-ব্রেকআপের কথা বলতে শুরু করবে, তখন বিনয়ের সাথে বলুন: "ভাই/আপু, এসব কথা ইসলামে বলা-শোনা জায়েজ নেই। আমি তোমার কষ্ট বুঝি, কিন্তু এ বিষয়ে আলোচনা করা আমার জন্য ঠিক না। তুমি আল্লাহর কাছে তওবা করো, আল্লাহ তোমার জন্য ভালো কিছুই করবেন।"
  • যদি সে পরামর্শ চায়, বলুন: "আমি এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারব না, কারণ এটা ইসলামসম্মত সম্পর্ক নয়। তুমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং এই সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকো।"
  • প্রয়োজনে রুম পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারেন, যদি পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।

৫. আপনার ভয় সম্পর্কে

আপনি ভয় পাচ্ছেন যে এসব কথা শোনা বা বলার কারণে আপনার বিয়ের পরবর্তী জীবনে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা। জেনে রাখুন—

  • আপনি যদি এসব আলোচনা থেকে বিরত থাকেন এবং তাকে সঠিক পথ দেখান, তাহলে আপনার কোনো গুনাহ হবে না, বরং আপনি সওয়াব পাবেন।
  • আপনার বিয়ের পরবর্তী জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না, ইনশাআল্লাহ। তবে শর্ত হলো—আপনি নিজে এসব গুনাহের কাজে লিপ্ত হবেন না এবং এ ধরনের আলোচনায় অংশ নেবেন না।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজ দেখে এবং তা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়, সে তা পরিবর্তন করুক।" (সহীহ মুসলিম: ৪৯)

৬. হাদীসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৮, সহীহ মুসলিম: ৪৭)

প্রেম-ব্রেকআপের আলোচনা ভালো কথা নয়, তাই চুপ থাকা বা বিষয়টি পরিবর্তন করা উত্তম।

৭. ইমাম আযম আবু হানীফা (রহঃ)-এর নীতি

ইমাম আযম আবু হানীফা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করে, সে যেন হারাম কাজে অংশ নিল।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)

সুতরাং, প্রেম-ব্রেকআপের আলোচনায় অংশ নেওয়া হারাম কাজে সহযোগিতার শামিল।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

১. আপনার রুমমেটের প্রেম-ব্রেকআপের কথা শোনা, সান্ত্বনা দেওয়া বা পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ২. তাকে বুঝান যে এই সম্পর্ক হারাম ছিল এবং এর থেকে দূরে থাকাই তার জন্য কল্যাণকর। ৩. তাকে তওবা করার পরামর্শ দিন এবং তার জন্য দোয়া করুন। ৪. প্রয়োজনে বিনয়ের সাথে বলুন যে এ বিষয়ে আলোচনা করা আপনার জন্য জায়েজ নয়।

তারপরেও তারা তাহা না শুনলে আপনি এ ধরনের আলোচনার মজলিস ত্যাগ করবেন। ৫. আপনার বিয়ের পরবর্তী জীবনে এতে কোনো প্রভাব পড়বে না, ইনশাআল্লাহ।


আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.