ব্যাংকার ভাইয়ের ইনকাম থেকে গ্রহণ করা কি জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
বি:দ্র: ভাইয়ার চাকরিটা সুদের সাথে জড়িত।ভাইয়া বর্তমানে অন্য জায়গায় চাকরির চেষ্টা করছেন। কিন্তু অন্য কোথাও এখনও হয় নি। আর বাসা থেকেও চাপ দেওয়া হচ্ছিল চাকরি পাওয়ার জন্য৷ তাই আপাতত এখানে জয়েন করেছেন। কিন্তু এখানে থাকার ইচ্ছা নাই।আর যেহেতু ম্যারিড চাকরি পাওয়া প্রয়োজন ছিল। এখন এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কি হতে পারে।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি বিস্তারিতভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রথম অংশ: ভাইয়ার উপহার খাওয়া জায়েজ হবে কি?
আপনার ভাইয়া ব্যাংকে চাকরি করেন যা সুদের সাথে জড়িত। তার আয়ের উৎস যদি সম্পূর্ণরূপে হারাম (সুদ-সম্পর্কিত) হয়, তাহলে সেই অর্থ দিয়ে কেনা জিনিস খাওয়া সম্পর্কে ইসলামী বিধান হলো:
হানাফি মাযহাবের মতানুযায়ী:
১. যদি কোনো ব্যক্তির সমস্ত আয় হারাম হয়, তাহলে তার কাছ থেকে উপহার গ্রহণ করা এবং তা খাওয়া মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হবে। তবে যদি জানা যায় যে, তার আয়ের মধ্যে কিছু হালাল অংশও আছে, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েজ হবে।
২. ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে, যদি কোনো ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হারাম হয়, তাহলে তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা মাকরূহ। কিন্তু যদি তার সম্পদের মধ্যে হালাল অংশও থাকে এবং হারাম অংশের পরিমাণ নির্দিষ্ট না হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েজ।
রদ্দুল মুহতার (শামী)-এ উল্লেখ আছে:
"إذا كان أكثر ماله حرامًا يكره الأخذ منه، وإن كان أكثر ماله حلالًا لا يكره" "যদি কারো অধিকাংশ সম্পদ হারাম হয়, তাহলে তার কাছ থেকে গ্রহণ করা মাকরূহ; আর যদি অধিকাংশ হালাল হয়, তাহলে মাকরূহ নয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৫)
আপনার ভাইয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
যেহেতু আপনার ভাইয়া ব্যাংকে চাকরি করেন এবং তার বেতন সুদ-সম্পর্কিত লেনদেনের সাথে জড়িত, তাই তার পুরো আয় হারাম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে:
- যদি তিনি ব্যাংকের এমন বিভাগে কাজ করেন যা সরাসরি সুদের লেনদেনের সাথে জড়িত নয় (যেমন: সাধারণ প্রশাসনিক কাজ), তাহলে তার বেতন সম্পূর্ণ হারাম হবে না, তবে মাকরূহ হবে।
- যদি তিনি সরাসরি সুদের লেনদেনের সাথে জড়িত থাকেন, তাহলে তার আয় হারাম হবে।
আপনার করণীয়:
১. আপনার ভাইয়ার কাছ থেকে উপহার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উত্তম, কারণ তার আয়ের উৎস সন্দেহজনক। ২. তবে যদি তিনি উপহার দেন এবং আপনারা তা ফেরত দিতে না পারেন বা সম্পর্কের অবনতি হয়, তাহলে সতর্কতার সাথে তা গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা বা গরিব-মিসকিনকে দান করে দেওয়া উত্তম। ৩. আপনার ভাইয়াকে বোঝান যে, তিনি যেন দ্রুত অন্য হালাল চাকরির সন্ধান করেন।
দ্বিতীয় অংশ: রিজিক অপবিত্র হবে কি? রক্ত-মাংস অপবিত্র হবে কি?
মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا "হে মানুষ! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ কর।" (সূরা আল-বাকারা: ১৬৮)
রিজিক অপবিত্র হওয়া সম্পর্কে:
আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষের রিজিক নির্ধারণ করেছেন। হারাম উপার্জন করলে তা রিজিকের পবিত্রতাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনার শরীর বা রক্ত অপবিত্র হয়ে যাবে। বরং এর অর্থ হলো:
১. হারাম খাবার খেলে তা শরীরে প্রভাব ফেলে এবং ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ২. তবে আপনার শরীর বা রক্ত শারীরিকভাবে অপবিত্র হবে না, বরং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব পড়তে পারে।
ইবাদত কবুল হবে কি?
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছুই কবুল করেন না।" (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনার ইবাদত একদম কবুল হবে না। বরং:
১. আপনার ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো আপনার নিজের উপার্জন ও খাদ্য। যেহেতু আপনার মূল খরচ আপনার আব্বুর হালাল আয় থেকে হয়, তাই আপনার ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে মূল বাধা নেই। ২. আপনার ভাইয়ার আনা জিনিস খেলে যদি সেগুলো হারাম হয়, তাহলে সেগুলো খাওয়া আপনার ইবাদতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সেগুলো এড়িয়ে চলা উত্তম।
তৃতীয় অংশ: ভাইয়ার করণীয়
আপনার ভাইয়ার জন্য নিম্নোক্ত পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে:
১. তওবা করা: তিনি যেন আল্লাহর কাছে তওবা করেন এবং এই চাকরি থেকে বের হওয়ার সংকল্প করেন।
২. হালাল চাকরির সন্ধান: তিনি যেন সাধ্যমতো হালাল চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
৩. সুদী লেনদেন থেকে দূরে থাকা: তিনি যেন ব্যাংকের মধ্যে এমন বিভাগে কাজ করার চেষ্টা করেন যা সরাসরি সুদের সাথে জড়িত নয়, অথবা অন্য কোনো হালাল চাকরি খুঁজে বের করেন।
৪. ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:
"لا يجوز العمل في البنوك الربوية إلا عند الضرورة القصوى" "সুদী ব্যাংকে চাকরি করা জায়েজ নয়, তবে চরম প্রয়োজন হলে (সেটাও সাময়িকভাবে) ভিন্ন কথা।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৮)
আপনার পরিবারের জন্য করণীয়:
১. আপনার ভাইয়াকে সহযোগিতা করুন এবং উৎসাহ দিন যেন তিনি দ্রুত হালাল চাকরি খুঁজে পান। ২. তার আনা জিনিসগুলো যদি সন্দেহজনক হয়, তাহলে বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন যে, আপনারা তার ভালোবাসা appreciate করেন কিন্তু হারাম সম্পদ থেকে দূরে থাকতে চান। ৩. আপনার আব্বুকে বলুন, তিনি যেন ভাইয়ের উপর চাপ না দেন এবং তাকে হালাল চাকরি খোঁজার সময় দেন। ৪. পরিবারের সবাই মিলে দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাকে হালাল রিজিক দান করেন।
উপসংহার:
আপনার ভাইয়ার আনা জিনিস খাওয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। যেহেতু তার আয়ের উৎস সন্দেহজনক, তাই তার আনা জিনিস খাওয়া থেকে বিরত থাকা বা সেগুলো গরিব-মিসকিনকে দান করে দেওয়া উত্তম। তবে আপনার নিজের শরীর বা রক্ত অপবিত্র হবে না, এবং আপনার ইবাদত কবুল হবে ইনশাআল্লাহ, কারণ আপনার মূল খরচ আপনার আব্বুর হালাল আয় থেকে হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب