মাঝেমধ্যে মনে হয় যে, “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে আমি হয়তো তার সাথে থাকতে পারব না, চলে যাব।” এটা কি ঈমানের দুর্বলতা?

Family Life · Hanafi

Question No: 402
Questioner: disha ebnat
Question Asked: 20 May 2026, 08:45 AM
Reviewed & Published: 20 May 2026, 10:20 AM
Views: 51
Tokens: 3,549
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি বলি যে “যদি আমার হাজব্যান্ড দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে আমি হয়তো তার সাথে থাকতে পারব না, চলে যাব।” কিন্তু পরে আবার মনে হয়, মানুষ তো আল্লাহর জন্য কত কঠিন বিষয়ও সহ্য করে। তাহলে আমি কেন এটা সহ্য করতে পারব না?
এরপর ভয় লাগে—আমি যেহেতু এমন কথা বলছি, আল্লাহ কি আমার উপর রাগ করবেন? বা এমন কিছু ঘটিয়ে দিবেন যাতে আমাকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়? শুধু এই কারণে যে আমি বলেছি আমি এটা সহ্য করতে পারব না?
আর এখন আমার মনে এই ভয়ও আসে, এবং আপনাকে এই প্রশ্ন করা থেকে কি বুঝায় যে আমি আল্লাহকে নিয়ে খারাপ ধারণা করছি? বা আল্লাহ সম্পর্কে ভুল চিন্তা করছি?
এছাড়া, এ ধরনের ভুল বা ভয়ভিত্তিক চিন্তা আসার কারণে কি আমার গুনাহ হচ্ছে? আমার কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন সু-ধারণা রাখা উচিত যে, “ইন শা আল্লাহ, আমার জীবনে এমন কিছু হবে না”?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة

প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনি যে মানসিক দ্বন্দ্ব এবং ভয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন, তা স্বাভাবিক। এটি আপনার ঈমানের গভীরতা এবং আল্লাহর প্রতি আপনার দায়িত্ববোধেরই প্রমাণ। আসুন, আপনার প্রতিটি উদ্বেগ কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং হানাফি ফিকহের নির্দেশনা অনুযায়ী সমাধান করার চেষ্টা করি।

১. আপনার চিন্তা ও কথা বলা কি গুনাহ?

আপনার মনে যে কথা আসে, "স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে আমি থাকতে পারব না," এটি একটি শর্তসাপেক্ষ মানসিক প্রতিক্রিয়া। ইসলামে অন্তরের খেয়াল-খুশাল বা অনিচ্ছাকৃত চিন্তার জন্য গুনাহ হয় না। মহান আল্লাহ বলেন:

"আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে তা তার পক্ষে এবং যা সে অর্জন না করে তা তার বিপক্ষে নয়।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, "আমার উম্মতের অন্তরে যে খারাপ চিন্তা উদয় হয়, যতক্ষণ না তারা তা কথায় বা কাজে প্রকাশ করে, আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেন।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

সুতরাং, শুধুমাত্র মনে উদিত হওয়া এই চিন্তা আপনার জন্য গুনাহ নয়। বরং আপনি যেহেতু আবার ফিরে ভাবছেন যে, "আল্লাহর জন্য মানুষ কঠিন বিষয় সহ্য করে," এটি আপনার ঈমানের পরিপক্কতার লক্ষণ।

২. আল্লাহ কি রাগ করবেন এবং পরিণতি দেবেন?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি কোনো বান্দার মানসিক অবস্থা বা শর্তসাপেক্ষ কথা বলার জন্য তাদের ওপর বিপদ চাপিয়ে দেন না, বিশেষ করে যখন তিনি বা তিনি তার প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে চান। বরং আল্লাহ মানুষের দুর্বলতা জানেন এবং সহানুভূতিশীল।

হাদিসে এসেছে: "তোমরা নিজেদের জন্য ধ্বংস কামনা করো না। কেননা ধ্বংসের সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ।" (সুনান আবু দাউদ) - এর মানে হলো, আমরা ভয় ও হতাশার কথাগুলো নিয়ন্ত্রণ করব, কিন্তু যদি তা অনিচ্ছাকৃত হয় তাহলে আল্লাহ তার জন্য শাস্তি দেবেন না।

আপনার মধ্যে আফসোস এবং ভয় দেখা যাচ্ছে, যা প্রমাণ করে আপনি খারাপ উদ্দেশ্যে কথা বলেননি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: "ঈমানদার ব্যক্তির ভয় ও আশা সবসময় একসাথে থাকে।" তাই আপনার ভয়কেই এবাদতের পর্যায়ে নিয়ে যান।

সুপারিশ: দোয়া করুন: "হে আল্লাহ! আপনি আমার চেয়েও বেশি আমার কল্যাণ জানেন। আমি যদি কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, আমাকে ধৈর্যশীল করুন। আর যদি কোনো কিছু আমার জন্য ক্ষতিকর হয়, তা থেকে আমাকে রক্ষা করুন।"

৩. "আল্লাহকে নিয়ে খারাপ ধারণা" - এই ভয় কি সঠিক?

আপনি যে ভয় পাচ্ছেন যে, "আমার প্রশ্ন করা বা এই চিন্তা আসা কি আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণার দিকে নিয়ে যাচ্ছে?" এটি একটি সূক্ষ্ম ওয়াসওয়াসা (শয়তানের প্ররোচনা)। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা হলো, আল্লাহর রহমত ও কৃতিত্ব থেকে নিরাশ হওয়া অথবা তাঁর প্রতি অবিচার বা মন্দ সম্পর্কে বিশ্বাস করা। (যেমন: "আল্লাহ আমাকে হয়রানি করবেন")।

আপনি কিন্তু তা করছেন না। আপনি বলছেন, "ইন শা আল্লাহ, আমার জীবনে এমন কিছু হবে না," যা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসার প্রকাশ। বরং আপনি নিজের দুর্বলতার কারণে ভয় পাচ্ছেন, যা স্বাভাবিক। ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) তার রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেছেন: "আল্লাহর জন্য খারাপ ধারণা হলো, তাকে অবিচারকারী বা নিরর্থক সৃষ্টিকর্তা হিসেবে কল্পনা করা। কিন্তু নিজের দুর্বলতার অনুভব করা খারাপ ধারণা নয়, বরং এটি আল্লাহর সামনে বিনয়ের পরিচায়ক।"

প্রস্তাবিত মনোভাব: আপনি বলতে পারেন: "ইন শা আল্লাহ, আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না। আর যদি করেন, তাহলে আল্লাহ আমাকে ধৈর্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দেবেন।"

৪. আপনার কী করণীয়? (হানাফি ফিকহের নির্দেশনা)

নিম্নলিখিত পন্থাগুলো অবলম্বন করে আপনি মানসিক শান্তি পেতে পারেন:

  1. শর্তসাপেক্ষ কথা বলা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন:
    যখনই মনে হবে "যদি আমার স্বামী... তাহলে আমি চলে যাব," সাথে সাথে বলুন: "মা-শা-আল্লাহ, লা-হাওলা ওলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই)। এটি আপনার অন্তরকে শক্তিশালী করবে এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করবে।

  2. বর্তমানের প্রতি মনোযোগী হোন:
    আপনার স্বামী বর্তমানে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। ইসলামের একটি নীতি হলো: ভবিষ্যতের অজানা বিপদ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়া। আল্লাহ বলেন:

    "তোমরা যা জানো না তার পিছনে পড়ো না। কান, চোখ ও অন্তর এর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩৬)

  3. পরামর্শ ও আমল:

    • প্রতিদিন সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত (২২-২৪) পড়ুন, যা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর বর্ণনা করে, যা ঈমানকে মজবুত করে।
    • "রব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতান ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতান ওয়া কিনা আযাবান নার" - এই দোয়াটি বেশি পড়ুন।
  4. যদি পরিস্থিতি সত্যিই আসে, তাহলে ইসলামী সমাধান বিদ্যমান:
    স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর জন্য ফিকহে হানাফিতে কিছু অধিকার রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তালাক চেয়ে নিতে পারেন (খুলা) অথবা শর্ত মোতাবেক সহবাসের ব্যবস্থা চাইতে পারেন (বিবাহের শর্তে যদি থাকে)। তবে সাহস ও ধৈর্যের সাথে এ বিষয়ে স্থানীয় মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত, আগে থেকে চিন্তা করা নয়।

উপসংহার

প্রিয় বোন, আল্লাহর প্রতি আপনার সুধারণা রাখাই উত্তম। আপনি যদি বলেন, "ইন শা আল্লাহ, আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না। আর তিনি যদি করেন, তাহলে আল্লাহ আমাকে ধৈর্য ও সঠিক পথ দেখাবেন," এটি আপনার ঈমানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে।

উল্লিখিত চিন্তাগুলো শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র, যা একজন মুমিনের জন্য স্বাভাবিক। আপনি গুনাহগার হচ্ছেন না, বরং আপনার ভয় ও অনুশোচনা আপনার ইমানের গভীরতা প্রমাণ করে। আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমান ও ধৈর্যকে শক্তিশালী করুন এবং আপনাকে শান্তি দান করুন।

আল্লাহু আলিমু বিস-সওয়াব। (আল্লাহই অধিক জানেন)

প্রাসঙ্গিক তথ্যসূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন), কিতাবুত তালাক।
  • ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি), অধ্যায়: তালাকের কারণ।
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মাদ শফি), সূরা আল-বাকারা, ২৮৬।
  • বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি), ঈমান ও আখলাক অধ্যায়।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.