বিল্ডিংয়ে মন্দির ঘর স্থাপন করা কি জায়েয?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 399
Questioner: Qurrata Ain
Question Asked: 20 May 2026, 08:27 AM
Reviewed & Published: 20 May 2026, 10:30 AM
Views: 31
Tokens: 3,843
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমাদের হোস্টেলে কিছু হিন্দু নামাজ রুম হবে শুনে ওদের একটা মন্দির রুম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। যেখানে বিভিন্ন মূর্তি এনে স্থায়ীভাবে রেখে পূজা করা হবে, কীর্তন ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজ করা হবে। এটা অনেক মুসলিমদের সাথে পাঙ্গা নেওয়ার জন্য করা হচ্ছে। কারণ প্রায় ৭০% মুসলিমের জন্য একটি নামাজ রুমও নেই। নামাজ রুমের কথা শুনে ওরা ওদের প্রেয়ার রুম চাচ্ছে। একটি মুসলিম অধ্যুষিত বিল্ডিং এ এমনটি কি হতে দেওয়া উচিত? এমন বিল্ডিং এ কি মুসলিমদের থাকা উচিত? মন্দির থাকলে সেখানে শারীয় বা জ্বীন জাতি,শয়তানের দ্বারা কি কি সমস্যা হতে পারে?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো—একটি মুসলিম অধ্যুষিত ভবনে মূর্তি স্থাপন করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা, তাতে পূজা-অর্চনা, কীর্তন ইত্যাদি চলবে, এবং এতে মুসলিমদের বসবাসের বিধান কী, সেই সাথে শিরকী পরিবেশের ফলে আধ্যাত্মিক ও জ্বীন-শয়তানের প্রভাব কী হতে পারে।

আমরা কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিশ্লেষণ করব।

১. মুসলিম অধ্যুষিত ভবনে মূর্তি-মন্দির প্রতিষ্ঠার বিধান

ইসলামে তাওহিদের (একত্ববাদ) চরম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কোনো প্রকার শিরক (কাউকে আল্লাহর সাথে শরিক করা) সবচেয়ে বড় গুনাহ। মূর্তি পূজা ও মূর্তি স্থাপন সরাসরি শিরকের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। তা ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮)

মুসলিমদের বসবাসের স্থানে মন্দির বা মূর্তি স্থাপন ইসলামী শান্তি ও বিশ্বাসের পরিপন্থী। হানাফি ফিকহে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—যে স্থানে মুসলিমরা বসবাস করে, সেখানে মুশরিকদের ইবাদতের ঘর বা মূর্তি স্থাপন করা জায়েজ নয়। কারণ এটি মুসলিমদের তাওহিদী বিশ্বাসের জন্য হুমকি এবং প্রকাশ্যে শিরকের প্রচার।

আল-হিদায়ায় এসেছে:

"মুসলিমরা যে দেশে বসবাস করে, সেখানে কোন মুশরিক উন্মুক্তভাবে তাদের ধর্মীয় প্রতীক স্থাপন করতে পারে না, যদি তা মুসলিমদের অপমান ও দ্বীনের প্রতি অশ্রদ্ধার কারণ হয়।" (আল-হিদায়া, কিতাবুস সিয়ার)

ফতোয়ায়ে আলমগিরীতে (হিন্দিয়া):

"যদি জিম্মি (অমুসলিম নাগরিক) মুসলিম শহরে নতুন মন্দির নির্মাণ করতে চায়, তাহলে তা অনুমোদিত নয়। পুরনো মন্দির মেরামত করা যেতে পারে, কিন্তু নতুন স্থাপন করা নাজায়েজ। বিশেষ করে যখন মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।" (ফতোয়া আলমগিরী, ২/২৫৭)

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেছেন:

"মুসলিম এলাকায় মূর্তি বা মন্দির স্থাপন করা হারাম, কারণ এটি দ্বীনের বিরুদ্ধে উস্কানি এবং ফিতনার কারণ।" (কিতাবুল খারাজ, ইমাম আবু ইউসুফ)

আপনাদের হোস্টেলে ৭০% মুসলিম এবং মাত্র কয়েকজন হিন্দু থাকলে মন্দির স্থাপন করা মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকার ও ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত। আর যদি তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে 'পাঙ্গা নেওয়ার' জন্য এমন করে, তাহলে তা আরও বেশি নাজায়েজ ও ফিতনামূলক।

২. এই ভবনে মুসলিমদের বসবাসের বিধান

মুসলিমদের জন্য এমন স্থানে বসবাস করা উচিত নয় যেখানে প্রকাশ্যে শিরক ও মূর্তিপূজা চলতে থাকে, বিশেষ করে যদি তা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা সংখ্যালঘু হয়েও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। তবে যদি তারা বসবাস করে এবং সেখানে নামাজের সুযোগ থাকে, তাহলে নিজেদের দায়িত্ব হলো দ্বীনের প্রতি অটল থাকা এবং ফিতনা প্রতিরোধ করা। কিন্তু মন্দির প্রতিষ্ঠার পরে যদি সেখানে কীর্তন, পূজা ও আওয়াজ চলতে থাকে তাহলে তা বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য আধ্যাত্মিক দিক থেকে ক্ষতিকর হতে পারে।

রদ্দুল মুহতার (শামি):

"মুসলিমের জন্য এমন জায়গায় বসবাস করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) যেখানে প্রকাশ্যে শিরকের কাজ চলে, কারণ এটি ঈমানের জন্য নিরাপদ নয়। যদি ত্যাগ করা সম্ভব হয়, তবে ত্যাগ করা উত্তম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)

তবে, যদি অন্য কোনো বিকল্প না থাকে বা স্থানান্তর করা অসম্ভব হয়, তাহলে নিজের ঈমানকে শক্ত রাখা এবং দ্বীনের ওপর অটল থাকার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আপনি উল্লেখ করেছেন—প্রায় ৭০% মুসলিমের নামাজ রুম নেই, অথচ মূর্তি-মন্দির তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ অন্যায়। তাই মুসলিমদের উচিত ঐক্যবদ্ধভাবে এর প্রতিবাদ করা এবং প্রশাসন বা আবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি তোলা।

৩. মন্দির ও মূর্তির কারণে জ্বীন-শয়তানের সমস্যা

শিরক ও মূর্তিপূজা শয়তানের প্রিয় কাজ। জ্বীন-শয়তান এমন স্থানে অধিক সক্রিয় হয় যেখানে শিরক, প্রকাশ্য গুনাহ ও বেহায়াপনা চলে। মূর্তির পূজা, কীর্তন এসব শিরকী কাজের মাধ্যমে শয়তানী শক্তি বাড়ে। কুরআনে এসেছে—

"নিশ্চয়ই শয়তানই তোমাদের শত্রু, কাজেই তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ কর। সে তো নিজ দলকে ডাকে যে তারা জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সূরা ফাতির, ৩৫:৬)

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যখন কোনো ঘরে কুকুর বা মূর্তি থাকে, তখন সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১০৬)

সুতরাং মূর্তি স্থাপন করলে সেই স্থান থেকে রহমত ও ফেরেশতাগণ দূরে থাকবেন। শয়তান ও জ্বীনরা সেখানে আনাগোনা করবে। ফলে মুসলিমরা যদি সেখানে বসবাস করে, তাহলে বিভিন্ন মানসিক ও আধ্যাত্মিক সমস্যা দেখা দিতে পারে—যেমন বদ দুআ, বদ স্বপ্ন, অস্থিরতা, ধর্মীয় অনুপ্রেরণার অভাব ইত্যাদি।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"মূর্তি ও নাপাক বস্তু (যেমন কুকুর) যেখানে থাকে, সেখানে ফেরেশতা আসে না; বরং শয়তান অবস্থান করে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪২১)

সালাফে সালেহিনের অভিজ্ঞতা: অসংখ্য বুজুর্গ ও আলেম বলেছেন যে জ্বীন ও শয়তানের উৎপাত বেশি হয় এমন জায়গায় যেখানে শিরক, কবর পূজা, মূর্তি পূজা বা মদের কারবার চলে।

৪. আপনার করণীয়

  • প্রতিবাদ ও বাধা প্রদান: মুসলিমদের একত্র হয়ে হোস্টেল কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট জানিয়ে দিন যে মূর্তি-মন্দির স্থাপন মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং আইনত বৈধ নয় (দেশের আইন অনুযায়ীও যদি তা নিষিদ্ধ হয়)। নামাজ রুমের দাবি অগ্রাধিকার দিন।
  • মন্দির স্থাপন হলে সেখানে অবস্থান না করা: যদি সম্ভব হয় তবে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া উত্তম। কারণ এ ধরনের ফিতনার জায়গায় বসবাস ঈমানের জন্য বিপজ্জনক।
  • উপায়ান্তর না থাকলে কিছু সতর্কতা: যদি স্থানান্তর করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রতিদিন সকাল-সন্ধা দোয়া পড়া, সূরা বাকারা তেলাওয়াত করা, নিজের ঘর পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত নামাজ ও জিকির করা—এসব শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য জরুরি।
  • ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখা: ফিতনা সৃষ্টি হলে তার জবাব দ্বীনি সাহস ও জ্ঞানের সঙ্গে দেওয়া, গালি-গালাজ বা হিংসা-বিদ্বেষে না জড়ানো।

সারসংক্ষেপ:

  • মুসলিম অধ্যুষিত ভবনে মন্দির/মূর্তি স্থাপন করা নাজায়েজ (হারাম) এবং ইসলামী আইনে নিষিদ্ধ।
  • যেখানে প্রকাশ্যে শিরক চলে, সেখানে বসবাস করা মাকরুহে তাহরিমি বা নাজায়েজের কাছাকাছি। উত্তম হলো স্থানত্যাগ করা।
  • শিরক ও মূর্তিপূজার কারণে শয়তানের উৎপাত ও আধ্যাত্মিক ক্ষতি হতে পারে, ফেরেশতাদের আগমন বন্ধ হয়, জ্বীন-ভুতের আবির্ভাব বাড়ে।
  • মুসলিম দায়িত্বশীলদের উচিত ধৈর্য, ঐক্য ও সঠিক পদ্ধতিতে এ ধরনের ফিতনার মুখোমুখি হওয়া এবং কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে নামাজ রুমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আল্লাহ আপনাদের সবাইকে দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন এবং ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.