অহংকার নিয়ে জানতে চাই
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।অহংকার করা কি কবিরা গুনাহ নাকি ইমান চলে যাবে?
Answer
উত্তরঃ
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। আমরা প্রতিটি অংশের উত্তর হানাফি ফিকহ ও আকিদার আলোকে দেব।
১. বিয়ের জন্য বা জিনার জন্য নারীর রূপ, পরিবার, বয়স, শারীরিক গঠন দেখা এবং তা না পেলে পছন্দ না করা কি অহংকার?
উত্তরঃ
প্রথমে স্পষ্ট করে বলা জরুরি যে জিনা (ব্যভিচার) সম্পূর্ণরূপে হারাম। কেউ যদি জিনার উদ্দেশ্যে নারীকে দেখে এবং তার মধ্যে নির্দিষ্ট গুণ না পেয়ে জিনা না করে, তাহলে এটি অহংকার নয় বরং পাপ থেকে বিরত থাকা। বরং জিনা না করাই ওয়াজিব। তাই এই প্রশ্নের ক্ষেত্রে জিনার প্রসঙ্গটি অপ্রাসঙ্গিক।
বিয়ের প্রসঙ্গেঃ
ইসলাম নারী-পুরুষের বিয়ের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় দেখার অনুমতি দিয়েছে। হাদিসে এসেছে, নারীকে চারটি গুণের জন্য বিয়ে করা হয়: ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "তোমরা দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধূলায় ধুসরিত হোক।" (বুখারি ও মুসলিম)
সুতরাং বিয়ের জন্য নারীর রূপ, পরিবার, বয়স, শারীরিক গঠন দেখা জায়েজ এবং এটি স্বাভাবিক মানবিক পছন্দ। তবে শুধুমাত্র এসব বাহ্যিক গুণের ওপর ভিত্তি করে কাউকে প্রত্যাখ্যান করা এবং দ্বীনকে গুরুত্ব না দেওয়া নিন্দনীয় হলেও অহংকার বলে গণ্য হবে না, যদি তা অহংকারের মানসিকতা থেকে না হয়।
অহংকার কখন হয়?
অহংকার (কিবর) হলো নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা এবং অন্যকে তুচ্ছ করা। বিয়ের ক্ষেত্রে পছন্দমতো গুণ না পেলে কাউকে না নেওয়া অহংকার নয়, যদি তা ন্যায্য পছন্দের ভিত্তিতে হয়। তবে যদি কারো দ্বীনদারি ও চরিত্র ভালো থাকা সত্ত্বেও শুধু তার অভাব-অভিযোগ (গরিব, কম সুন্দর ইত্যাদি) দেখে তাকে অপমান করে প্রত্যাখ্যান করা হয়, তাহলে তা অহংকারের পর্যায়ে যেতে পারে।
ফাতাওয়া উসমানী (১/৪২৭) এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৮০) তে এসেছে, বিয়ের জন্য নারীর রূপ দেখা জায়েজ, কিন্তু শুধু রূপের পিছনে না ছুটে দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আর কারও দ্বীন ভালো কিন্তু রূপ কম হলে তাকে তুচ্ছ করা অনুচিত।
সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত আচরণ অহংকার হবে না, যদি তা শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে হয় এবং অহংকারের মানসিকতা না থাকে।
২. অহংকার করা কি কবিরা গুনাহ, নাকি ইমান চলে যায়?
উত্তরঃ
অহংকার (কিবর) একটি কবিরা (বড়) গুনাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসলিম) তবে এটি শর্তসাপেক্ষে ইমান চলে যায় না।
অহংকারের প্রকারভেদঃ
১. সত্য অস্বীকার করাঃ যদি কোনো ব্যক্তি হঠকারিতা ও অহংকারবশত আল্লাহর আয়াত বা রাসূলের নির্দেশ অস্বীকার করে, তাহলে তা কুফরি। (সূরা আল-বাকারা ২:৩৪, ইবলিসের ঘটনা)
২. অন্যকে তুচ্ছ করাঃ যদি কেউ অহংকারবশত অন্য মুসলিমদের তুচ্ছ করে, তাদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, তবে তা কবিরা গুনাহ, কিন্তু ইমান যায় না, যতক্ষণ না সেটি কুফরি পর্যায়ে পৌঁছায়। হাদিসে এসেছে, "অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।" (মুসলিম)
হানাফি আকিদাঃ
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কবিরা গুনাহ ইমান নষ্ট করে না, তবে তা ইমানকে দুর্বল করে এবং মৃত্যুর আগে তওবা না করলে শাস্তির কারণ হয়। (আল-ফিকহুল আকবার, ইমাম আবু হানিফা)
ইবনে আবেদিন (রাদ্দুল মুহতার, ৪/২৬২) বলেন, "অহংকার হারাম ও কবিরা গুনাহ, কিন্তু এটি কুফর নয় যদি আল্লাহর নির্দেশ অস্বীকার না করা হয়।"
ফাতাওয়া আলমগীরি (২/২৭০) তে আছে, অহংকারীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে যে, সে তওবা না করলে আখিরাতে শাস্তি পাবে, কিন্তু দুনিয়াতে তার ওপর কুফরের হুকুম জারি হবে না।
সতর্কতাঃ
অহংকার খুবই ভয়াবহ গুনাহ। হাদিসে এসেছে, "যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে যাবে না।" (মুসলিম) তবে এর অর্থ এই নয় যে, অহংকারী চিরজাহান্নামী হবে; বরং কিছুকাল শাস্তি ভোগের পর মুমিনরা জান্নাতে যাবে, যদি তারা মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
সারকথাঃ
- সাধারণ অহংকার (মানুষকে তুচ্ছ করা) কবিরা গুনাহ, কিন্তু ইমান যায় না।
- যদি অহংকার সত্য অস্বীকার বা আল্লাহর বিধানকে অগ্রাহ্য করার পর্যায়ে যায়, তবে তা কুফর এবং ইমান চলে যেতে পারে।