প্রশ্নে উল্লিখিত 'আল-খাসায়িসুল কুবরা'র হাদীসটির প্রকৃত সনদ সহীহ কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
//একজন সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! দুনিয়া আমার প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। (অর্থাৎ আমি চরমভাবে অভাবগ্রস্থ)। রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করলেন, ‘তোমার কি ঐ তাসবীহ স্মরণ নেই, যে তাসবীহ ফেরেশতা এবং মাখলুকের, যার বরকতে রুজি প্রদান করা হয়। যখন সুবহে সাদিক উদিত (শুরু) হয় তখন এ তাসবীহ ১০০ বার পাঠ করো।
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ
(সুবহা'নাল্লাহি ওয়া বিহা'মদিহি সুবহা'নাল্লাহিল আ'যীমি ওয়া বিহা'মদিহি আস্তাগফিরুল্লাহ)
অর্থ : মহাপবিত্র আল্লাহ এবং সকল প্রশংসা তার জন্য; মহাপবিত্র আল্লাহ, যিনি সমুচ্চ, মহান; এবং সকল প্রশংসা তার জন্য, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।
যদি ১০০ বার পড়ো তাহলে দুনিয়া তোমার নিকট অপমানিত হয়ে আসবে অর্থাৎ তুমি সহজেই স্বচ্ছলতা লাভ করবে।
ঐ সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু চলে গেলেন। কিছুদিন পর পুনরায় হাজির হয়ে আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! দুনিয়া আমার নিকট এত বেশি আসছে, আমি হতবাক! কোথায় উঠাব, কোথায় রাখব!
(উৎস: আল খাছায়িছুল কুবরা, ২য় খন্ড, ২৯৯ পৃষ্ঠা)//
Answer
وعلیکم السلام و رحمة الله و برکاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই/বোন,
আপনি যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, তার সনদ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। উত্তর হলো, আপনি যে সূত্রে (আল-খাসায়িসুল কুবরা) এই হাদীসটি পেয়েছেন, তা থেকে প্রমাণিত নয় যে হাদীসটির সনদ সহীহ। বরং এটি একটি অত্যন্ত দুর্বল (যয়ীফ) বা জাল (মাওযূ) হাদীস হিসেবে পরিচিত।
আসুন বিষয়টি বিস্তারিত বুঝে নিই:
১. হাদীসটির উৎস ও সনদ পর্যালোচনা
আপনি যে বইয়ের উল্লেখ করেছেন—‘আল-খাসায়িসুল কুবরা’—এটি ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) রচিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। তবে এই গ্রন্থে তিনি শুধু সহীহ হাদীসই সংগ্রহ করেননি; বরং দুর্বল ও জাল হাদীসও তিনি সেখানে উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে ফাযায়িল (গুণাগুণ) বিষয়ক অধ্যায়গুলোতে।
এই নির্দিষ্ট হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসীন (হাদীস বিশেষজ্ঞদের) মন্তব্য হলো:
- সনদে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী: এই হাদীসের সনদে এমন একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যিনি অজ্ঞাত (মাজহুল) এবং তার নামও স্পষ্ট নয়। হাদীসের সনদে এসেছে, "একজন সাহাবী" — কিন্তু সেই সাহাবীর নাম উল্লেখ নেই। নাম না থাকার কারণে এই হাদীসটি ‘মুরসাল’ বা ‘মু'দাল’ হিসেবে গণ্য হয়, যা দুর্বল হাদীসের একটি প্রকার।
- ইমামদের বক্তব্য: হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) নিজেও স্বীকার করেছেন যে এটি দুর্বল। এছাড়া ইমাম সাখাভী (রহঃ) তাঁর ‘মাকাসিদুল হাসানা’ গ্রন্থে এবং ইমাম ইবনে আর্রাক (রহঃ) তাঁর ‘তানযীহুশ শারী'আহ’ গ্রন্থে এই হাদীসটিকে জাল (মাওযূ) বলেছেন। অর্থাৎ, এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নামে বানানো একটি কথা।
২. হানাফী ফিকহ ও আকীদার দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের উসূল (নীতি) অনুযায়ী, ফাযায়িল (সাওয়াবের বর্ণনা) বিষয়ক হাদীসেও দুর্বল সনদ গ্রহণ করা নিয়ে কঠোরতা আছে। তবে জাল (বানানো) হাদীস কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এবং পরবর্তী হানাফী মুহাদ্দিসগণ যেমন ইমাম ত্বহাবী (রহঃ), ইমাম কাসানী (রহঃ) প্রমুখ সর্বদা সহীহ ও হাসান হাদীসের উপর নির্ভর করেছেন এবং জাল হাদীস থেকে সতর্ক করেছেন।
- ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাদ্দুল মুহতার’ এ উল্লেখ করেছেন যে, ফাযায়িলের ক্ষেত্রেও দুর্বল হাদীস দ্বারা আমল করা যাবে, তবে শর্ত হলো হাদীসটি জাল না হওয়া এবং কোনো সহীহ হাদীসের পরিপন্থী না হওয়া। যেহেতু প্রশ্নে উল্লিখিত হাদীসটি জাল বলেই গণ্য, তাই এটি দ্বারা আমল করা এবং একে সহীহ বলা উভয়ই অনুচিত।
৩. বিকল্প সহীহ শিক্ষা
আপনার উল্লেখিত দোয়া/তাসবীহটির মূল বাক্যগুলো (সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম ইত্যাদি) কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তবে নির্দিষ্ট এই ঘটনা ও ১০০ বার পড়ার এই বিশেষ ফযীলতটি সহীহ নয়।
রিযিকের জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে অনেক উত্তম দোয়া ও আমল রয়েছে। যেমন:
- ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা): আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা নিজেদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রবল বৃষ্টি পাঠাবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন ও নদী প্রবাহিত করবেন।" (সূরা নূহ: ১০-১২)
- তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য তাকওয়া অবলম্বন করবে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেবেন, যা তার ধারণাতীত।" (সূরা তালাক: ২-৩)
সংক্ষিপ্ত উত্তর ও উপদেশ
আপনি যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, তার সনদ সহীহ নয়; বরং এটি জাল (বানোয়াট) হাদীস। তাই এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নামে বর্ণনা করা, প্রচার করা বা একে সহীহ বলা জায়েয নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উপর মিথ্যা বলার ব্যাপারে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।" (সহীহ বুখারী)
আমাদের উচিত সহীহ হাদীস দ্বারা আমল করা এবং দুর্বল/জাল হাদীস থেকে দূরে থাকা। রিযিকের জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত ইস্তিগফার, তাকওয়া এবং অন্যান্য সহীহ দোয়া গুলো পাঠ করা সর্বোত্তম।