একাধিক কসম ভঙ্গ করলে কি আলাদা কাফফারা দিতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রশ্নটি বিস্তারিত পড়ার পর আপনার জন্য নিম্নোক্ত সমাধান ও মাসয়ালা তুলে ধরা হলো। যেহেতু আপনি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাই হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
আপনার সমস্যার সমাধান ও মাসয়ালা
আপনি একই ধরনের কাজ (গান-বাজনা শোনা, নাটক-সিরিয়াল দেখা) থেকে বিরত থাকার জন্য বারবার কসম করেছেন এবং প্রতিবারই তা ভঙ্গ করেছেন। এতে আপনার উপর একাধিক কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। কিন্তু যেহেতু আপনি প্রথম কসম ভঙ্গের পর ৮ জনকে খাবার দিয়ে রেখেছেন, তাই হিসাবটি নিম্নরূপ:
১. কাফফারার নিয়ম (হানাফি ফিকহ): কসম ভঙ্গ করলে কাফফারা হিসেবে একজন দাস মুক্ত করা অথবা দশজন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো অথবা দশজন মিসকিনকে তাদের প্রাপ্য ফিতরার পরিমাণ (সাড়ে তিন কেজি গম বা তার মূল্য) টাকা/খাদ্য দেওয়া ওয়াজিব। যদি এই তিনটি কাজের কোনোটি করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে পরপর তিনটি রোজা রাখতে হবে। (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৩)
২. আপনার ক্ষেত্রে করণীয়: যেহেতু আপনি প্রথম কসম ভঙ্গের কাফফারা হিসেবে ১০ জনকে খাওয়ানোর মনস্থির করেছিলেন এবং ৮ জনকে দিয়েছেন, এখন বাকি ২ জনকে সেই একই কাফফারা হিসেবে দিয়ে দিন। এটি আপনার প্রথম কসম ভঙ্গের কাফফারা পূর্ণ করবে।
৩. দ্বিতীয় কসম ভঙ্গের কাফফারা: আপনি ৮ জনকে দেওয়ার পর আবারও কসম করেছেন এবং তা ভঙ্গ করেছেন। এই দ্বিতীয় কসম ভঙ্গের জন্য আলাদা আরেকটি কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। অর্থাৎ, আপনাকে আরও ১০ জন মিসকিনকে খাবার দিতে হবে অথবা তাদেরকে ফিতরার পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে।
৪. রোজা রাখার বিধান: আপনি বলেছেন রোজা রাখা আপনার জন্য কষ্টকর। যেহেতু আপনি খাবার দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন (৮ জনকে দিতে পেরেছেন), তাই আপনার জন্য রোজা রাখার অনুমতি নেই। খাওয়ানোর সামর্থ্য থাকলে রোজা রাখা জায়েজ নয়। তাই আপনাকে অবশ্যই টাকা দিয়ে বা খাবার দিয়ে কাফফারা আদায় করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩৬)
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: আপনি বারবার কসম করে ভঙ্গ করছেন, এটি খুবই মারাত্মক গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা কসম ভঙ্গকারীকে কঠিন সতর্ক করেছেন। আপনার উচিত:
- কসম করা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা।
- গান-বাজনা, নাটক-সিরিয়াল থেকে বিরত থাকার জন্য দৃঢ় সংকল্প করা এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করা।
- চোখ ও কানের হেফাজতের জন্য পরিবেশ পরিবর্তন করা এবং ভালো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা।
সংক্ষিপ্ত উত্তর (আপনার প্রশ্নের সরাসরি জবাব)
আপনাকে পুনরায় ১০ জনকে দিতে হবে না। আপনার করণীয় হলো: ১. প্রথম কসমের বাকি ২ জনকে খাবার/টাকা দিয়ে দিন। ২. দ্বিতীয় কসম ভঙ্গের জন্য আরও ১০ জনকে খাবার/টাকা দিন। ৩. এরপর কোনো অবস্থাতেই কসম করবেন না এবং গান-বাজনা, নাটক-সিরিয়াল থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।
মোট কাফফারা: আপনার উপর মোট ২টি কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। প্রথমটির ৮ জন দেওয়া হয়েছে, বাকি ১২ জনকে (প্রথমটির ২ জন + দ্বিতীয়টির ১০ জন) এখন দিতে হবে।
দলিল ও রেফারেন্স
কুরআনুল কারিম:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ "আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অনিচ্ছাকৃত শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না; কিন্তু তোমরা যে শপথ ইচ্ছাকৃতভাবে কর, তার জন্য তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। এর কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাদ্য খাওয়ানো যা তোমরা তোমাদের পরিবারকে খাওয়াও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একটি দাস মুক্ত করা। কিন্তু যে সামর্থ্য রাখে না, তবে তার উপর তিন দিনের সিয়াম। এটা তোমাদের শপথের কাফফারা যদি তোমরা শপথ কর। আর তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর বিধানসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
হাদিস শরিফ:
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُخْتِي نَذَرَتْ أَنْ تَمْشِيَ إِلَى الْبَيْتِ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ لَا يَصْنَعُ بِمَشْيِهَا إِلَى الْبَيْتِ شَيْئًا... (رواه مسلم) "উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার বোন বায়তুল্লাহ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার মান্নত করেছে। তিনি বললেন: আল্লাহ তার হেঁটে যাওয়ার মাধ্যমে কোনো উপকার করবেন না..." (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৪৪) - [এটি মান্নত ভঙ্গের ক্ষেত্রে, তবে কসমের কাফফারার গুরুত্ব বোঝাতে]
হানাফি ফিকহের কিতাব:
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৪৩): কসম ভঙ্গের কাফফারা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
- রদ্দুল মুহতার (৩/৭৩৬): খাওয়ানোর সামর্থ্য থাকলে রোজা রাখা জায়েজ নয়।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৫৩৬): একাধিক কসম ভঙ্গ করলে প্রতিটির জন্য আলাদা কাফফারা ওয়াজিব হয়।