ইউটিউবে পরকালের পথে যাত্রা সিরিজের লেকচার কাজ করতে করতে বা খেতে খেতে শোনা কি আদবের খেলাফ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ইউটিউবে পরকালের পথে যাত্রা নামে একটি সিরিজ আছে, যেখানে মৃত্যু, পরকালের জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রশ্ন ০১. কেউ যদি এই সিরিজের লেকচারগুলো কাজ করতে করতে বা খাওয়ার সময় খেতে খেতে শুনে, তাহলে কি আদবের খেলাফ হবে?
প্রশ্ন ০২. লেকচারের মাঝে আলোচক সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত কতে থাকেন। খাওয়ার সময় বা কাজের সময় কুরআনের তিলাওয়াত শুরু হলে তখন করণীয় কি? আমি কি খাওয়া ওই সময়ের জন্য বন্ধ রেখে তিলাওয়াত শুনবো?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এর উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি মূলনীতি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ইসলামী আদব-আখলাক ও ফিকহের আলোকে আমরা উত্তর প্রদান করছি।
প্রশ্ন ০১: কাজ করতে করতে বা খেতে খেতে লেকচার শোনা কি আদবের খেলাফ?
উত্তর: ইসলামী আদব অনুযায়ী, দ্বীনি আলোচনা বা লেকচার শোনা একটি ইবাদত ও জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম। এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। তবে কাজ করতে করতে বা খেতে খেতে লেকচার শোনা নিষিদ্ধ বা হারাম নয়, কিন্তু এটি আদবের খেলাফ হতে পারে যদি তা মনোযোগের সাথে না শোনা হয়।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. কুরআন মজীদের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ "যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ সহকারে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের উপর রহমত বর্ষিত হয়।" (সূরা আল-আ'রাফ: ২০৪)
এই আয়াতটি কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে মনোযোগ সহকারে শোনার নির্দেশ দেয়। যদিও এটি ফরজ নয়, তবে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং আদবের অংশ।
২. হাদীসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৮, সহীহ মুসলিম: ৪৭)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, দ্বীনি আলোচনার সময় সম্মান ও মনোযোগ প্রদর্শন করা উচিত।
৩. ফিকহের নীতিমালা: হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, ইলমে দ্বীন অর্জনের সময় পূর্ণ মনোযোগ রাখা মুস্তাহাব। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন:
"ইলম অর্জনের সময় মনোযোগ ও আগ্রহের সাথে বসা উচিত, কারণ ইলম একটি মহান ইবাদত।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪২)
সারকথা: কাজ করতে করতে বা খেতে খেতে লেকচার শোনা হারাম নয়, তবে এটি আদবের খেলাফ। কারণ এতে লেকচারের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ থাকে না এবং দ্বীনি আলোচনার সম্মান হ্রাস পায়। উত্তম হলো, যখন লেকচার শুনবেন, তখন কাজ বা খাওয়া বিরত রেখে মনোযোগ সহকারে শোনা। তবে যদি কাজটি অত্যন্ত জরুরি হয় এবং লেকচারটি ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে, তাহলে তা জায়েয, তবে মনোযোগের চেষ্টা করা উচিত।
প্রশ্ন ০২: খাওয়ার সময় বা কাজের সময় কুরআনের তিলাওয়াত শুরু হলে করণীয় কী?
উত্তর: যদি লেকচারের মাঝে আলোচক কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেন, তাহলে কুরআন তিলাওয়াতের সময় খাওয়া বন্ধ রেখে মনোযোগ সহকারে শোনা উত্তম এবং আদবের অংশ। এটি মুস্তাহাব।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. কুরআনের নির্দেশ: উপরে উল্লেখিত আয়াত (সূরা আল-আ'রাফ: ২০৪) অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সময় মনোযোগ সহকারে শোনা এবং নীরব থাকা উচিত। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এবং অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরাম এই আয়াতের ভিত্তিতে বলেছেন যে, কুরআন তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব এবং মনোযোগ সহকারে শোনা উচিত।
২. হাদীসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ "যে সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরগুলোর মধ্যে কোনো ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর তা অধ্যয়ন করে, তাদের উপর প্রশান্তি নাজিল হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাদেরকে নিজের কাছে যারা আছে তাদের মধ্যে স্মরণ করেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯)
এই হাদীসে কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়নের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এর সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ রয়েছে।
৩. ফিকহের নীতিমালা: হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"কুরআন তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব। যখন কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে, তখন শ্রোতার জন্য মনোযোগ সহকারে শোনা এবং নীরব থাকা উচিত।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩১৪)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"কুরআন তিলাওয়াতের সময় খাওয়া-দাওয়া করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) নয়, তবে মনোযোগ সহকারে শোনা উত্তম।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৭)
সারকথা: যদি লেকচারের মাঝে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত শুরু হয়, তাহলে খাওয়া বন্ধ রেখে মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত শোনা উত্তম এবং আদবের অংশ। এটি মুস্তাহাব। তবে যদি খাওয়া বন্ধ করা সম্ভব না হয় (যেমন: গিলে ফেলার সময়), তাহলে গিলে ফেলার পর মনোযোগ সহকারে শোনা উচিত। কাজের সময়ও একই নিয়ম—কুরআন তিলাওয়াত শুরু হলে কাজ সাময়িকভাবে বিরত রেখে তিলাওয়াত শোনা উত্তম।
অতিরিক্ত নসীহত:
১. লেকচার শোনার নিয়ত: লেকচার শোনার সময় নিয়ত করা উচিত যে, আমি দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য শুনছি। এতে ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যাবে।
২. সম্মান প্রদর্শন: দ্বীনি আলোচনা ও কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ঈমানের অংশ। তাই এগুলোর সময় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
৩. ব্যবহারিক সমাধান: যদি কাজ বা খাওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়, তাহলে লেকচারটি পরে শোনার জন্য রেকর্ড করে রাখতে পারেন এবং সুবিধামত সময়ে মনোযোগ সহকারে শুনতে পারেন।
★উল্লেখ্য, উপরোক্ত সিরিজে যদি বাদ্য-বাজনা, মিউজিক এর ব্যাবহার থাকে,তাহলে তাহা শোনা কোনোক্রমেই জায়েজ হবেনা।
والله أعلم بالصواب