স্বপ্নে কোথাও হারিয়ে যাওয়া, কিয়ামত দেখা সহ নানাবিধ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আজকে আমি রাতে একটানা কয়েকটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।
প্রথম স্বপ্ন দেখেছি আমি কোথায় হারিয়ে গেছি রাস্তা খুজে পাচ্ছি না। চারপাশে পানি ছিল রাস্তা বন্ধ ছিল।
দ্বিতীয় স্বপ্ন দেখেছি কিয়ামত হচ্ছে। চার পাশে পানি আর ঘরবাড়ি সব ভেঙে যাচ্ছে।
তৃতীয় স্বপ্নে কি দেখেছি মন নেই তবে সেটাও একটি দুঃস্বপ্ন ছিল এটা আবছা মনে আছে।
এগুলোর ব্যাখ্যা কি?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি রাতে একটানা কয়েকটি খারাপ স্বপ্ন (দুঃস্বপ্ন) দেখেছেন এবং এর ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও এর সাথে সম্পর্কিত আমল সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দিচ্ছি।
স্বপ্ন সম্পর্কে ইসলামী বিশ্বাস
প্রথমত, জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী আকীদা অনুযায়ী স্বপ্ন তিন প্রকার:
১. সুন্দর স্বপ্ন (আর-রু'য়া) - এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এবং এটি সুসংবাদ বহন করে। ২. খারাপ স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন (আল-হুলম) - এটি শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, যা মানুষকে ভয় দেখায় ও দুশ্চিন্তায় ফেলে। ৩. মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন - মানুষ দিনের বেলায় যা নিয়ে চিন্তা করে, রাতে ঘুমের মধ্যে তার প্রতিফলন দেখতে পায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"সুন্দর স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" (সহীহ বুখারী: ৩১১৮; সহীহ মুসলিম: ২২৬১)
আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা
আপনি যে তিনটি দুঃস্বপ্ন দেখেছেন, তার মধ্যে প্রথম দুটির বিবরণ দিয়েছেন এবং তৃতীয়টি আবছা মনে আছে। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এসব দুঃস্বপ্নের কোনো নির্দিষ্ট "ব্যাখ্যা" বা "ভবিষ্যদ্বাণী" নেই যা ভবিষ্যতে ঘটবে। বরং এগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে সৃষ্টি, যা মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য হয়ে থাকে।
প্রথম স্বপ্ন (রাস্তা হারিয়ে ফেলা ও চারপাশে পানি): এটি শয়তানের পক্ষ থেকে সৃষ্ট একটি দুঃস্বপ্ন, যা আপনাকে বিভ্রান্তি ও পথহারা হওয়ার ভয় দেখানোর চেষ্টা। ইসলামী দৃষ্টিতে এর কোনো ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অর্থ নেই।
দ্বিতীয় স্বপ্ন (কিয়ামত হচ্ছে ও ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে): এটি একটি সাধারণ দুঃস্বপ্ন। কিয়ামতের দৃশ্য দেখে অনেকেই ভয় পেয়ে থাকেন। এটি শয়তানের পক্ষ থেকে সৃষ্ট, যা আপনাকে আতঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে।
তৃতীয় স্বপ্ন (আবছা মনে থাকা): যেহেতু আপনি মনে করতে পারছেন না, তাই এর কোনো আলোচনা প্রযোজ্য নয়।
দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে দুঃস্বপ্ন দেখলে নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে শিখিয়েছেন:
১. বাম দিকে থুথু ফেলা - ঘুম থেকে জেগে বাম পাশে তিনবার হালকা থুথু ফেলতে হবে (শুধু মুখের লালা, থুথু নয়)। ২. আউযুবিল্লাহ পড়া - "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ" (আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম) পড়তে হবে। ৩. শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা - আল্লাহর কাছে শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে হবে। ৪. পাশ পরিবর্তন করা - যে পাশে ঘুমিয়েছিলেন, সে পাশ থেকে অন্যপাশে ঘুরে শুতে হবে। ৫. উঠে নামায পড়া - সম্ভব হলে উঠে দু'রাকাত নামায পড়া উত্তম। ৬. কারো কাছে স্বপ্নের কথা না বলা - দুঃস্বপ্ন কারো কাছে বর্ণনা করা উচিত নয়, বিশেষ করে যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয় তাদের কাছে। ৭. কোনো ব্যাখ্যা না চাওয়া - দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে শয়তানের প্রভাব বাড়ে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন তোমাদের কেউ এমন কিছু (খারাপ স্বপ্ন) দেখে যা সে পছন্দ করে না, তখন সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬১)
গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
১. দুঃস্বপ্নকে গুরুত্ব না দেওয়া: ইসলামী দৃষ্টিতে দুঃস্বপ্নের কোনো বাস্তব প্রভাব নেই। এটি শয়তানের ভয় দেখানো মাত্র। তাই এগুলো নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।
২. নিয়মিত যিকির ও দোয়া: ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া এবং বিছানায় শোয়ার আগে দোয়া পড়া দুঃস্বপ্ন থেকে রক্ষা করে।
৩. বিছানার পূর্বের আমল: ঘুমানোর আগে অজু করা, ডান কাত হয়ে শোয়া এবং কিছু যিকির করা সুন্নত।
৪. তওবা ও ইস্তিগফার: দুঃস্বপ্ন দেখলে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা উচিত।
উপসংহার
আপনার দেখা স্বপ্নগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে সৃষ্ট দুঃস্বপ্ন মাত্র। এগুলোর কোনো ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অর্থ নেই এবং এগুলো নিয়ে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া বা খোঁজ করা উচিত নয়। বরং উপরোক্ত আমলগুলো করলে ইনশাআল্লাহ এগুলো থেকে মুক্তি পাবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে হিফাজত করুন। আমীন।