আয়াতুল কুরসী পাঠের ফজিলত
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এই হাদিসের ব্যাখ্যা কি? আয়াতুল কুরসী পাঠ কারী মৃত্যুর পর কি কবরে সোয়াল জবাব হবে না? সে কি মৃত্যুর সাথে সাথে জান্নাতের প্রতিটি নিয়ামত ভোগ করবে? যেমন হুর, বালা খানা, নহর ইত্যাদি? তার কি হাশর ময়দান এ হিসাব দেওয়া লাগবে না? তার জন্য কি কিয়ামত এর মাঠে দাড়ানো লাগবে না?
Answer
আয়াতুল কুরসী পাঠের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যা
প্রশ্নের উত্তর
আপনি যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, তা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিম্নে প্রদান করা হলো:
হাদিসটির সনদ ও অবস্থা
আপনি যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন—"যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে, তার জান্নাতে যাওয়ার পথে একমাত্র বাধা হলো মৃত্যু"—এটি বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। তবে হাদিস বিশারদগণ এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে মতভেদ করেছেন।
ইমাম নাসাঈ (রহঃ) তাঁর 'আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ' গ্রন্থে এবং ইমাম তাবরানী (রহঃ) 'আল-মু'জামুল আওসাত'-এ এটি বর্ণনা করেছেন। তবে কিছু মুহাদ্দিস এই হাদিসকে দুর্বল (যয়ীফ) বলেছেন, আবার কেউ কেউ হাসান বলেছেন।
তবে হাদিসটির অর্থ ও মর্ম সঠিক এবং অন্যান্য সহিহ হাদিস দ্বারাও সমর্থিত। কেননা আয়াতুল কুরসী পাঠের অসংখ্য ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
হাদিসের ব্যাখ্যা
হাদিসটির অর্থ এই নয় যে, আয়াতুল কুরসী পাঠকারী ব্যক্তি মৃত্যুর পর হিসাব-নিকাশ ছাড়াই সরাসরি জান্নাতে চলে যাবে এবং তার কোনো কবরের প্রশ্ন বা হাশরের হিসাব হবে না। বরং এর অর্থ হলো:
প্রথম ব্যাখ্যা: আয়াতুল কুরসী পাঠের বরকতে তার জন্য জান্নাতে প্রবেশ করা সহজ হয়ে যাবে এবং সে জান্নাতে যাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যাবে। মৃত্যুই তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের শেষ ধাপ। অর্থাৎ সে এমন আমল করেছে যা তাকে জান্নাতের উপযুক্ত করে তুলেছে।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: এর অর্থ হলো, আয়াতুল কুরসী পাঠকারী ব্যক্তি কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাবে এবং হাশরের মাঠের কঠিন অবস্থা থেকে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তার কোনো হিসাবই হবে না।
কবরের প্রশ্ন ও হাশরের হিসাব সম্পর্কে
প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কবরের প্রশ্ন (সওয়াল) এবং হাশরের মাঠে হিসাব অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে তিনি তাদের প্রাপ্য পুরস্কার পূর্ণমাত্রায় দেবেন। আর আল্লাহ পাপীদের পছন্দ করেন না।" (সূরা আলে ইমরান: ৫৭)
ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, কবরের প্রশ্ন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হবে—তা সে নেককার হোক বা বদকার। তবে নেককারদের জন্য কবরের প্রশ্ন সহজ হবে এবং তারা কবরে শান্তিতে থাকবে।
আয়াতুল কুরসী পাঠকারীর জন্য বিশেষ সুবিধা
আয়াতুল কুরসী পাঠের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিসে এসেছে:
১. কবরের আযাব থেকে মুক্তি: আয়াতুল কুরসী পাঠকারী ব্যক্তি কবরের আযাব থেকে নিরাপদ থাকবে ইনশাআল্লাহ।
২. হাশরের মাঠে সুপারিশ: কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, আয়াতুল কুরসী পাঠকারীর জন্য এটি হাশরের মাঠে সুপারিশকারী হবে।
৩. জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা: আয়াতুল কুরসী পাঠের বরকতে সে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার হিসাবই হবে না বা কবরের প্রশ্ন হবে না। বরং তার হিসাব সহজ হবে এবং কবরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মত
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো, কবরের আযাব ও প্রশ্ন সত্য। প্রত্যেক ব্যক্তিকে কবরে প্রশ্ন করা হবে। তবে নেককারদের জন্য তা সহজ হবে এবং তারা সঠিক উত্তর দিতে পারবে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
১. কবরের প্রশ্ন: প্রত্যেক ব্যক্তির কবরে প্রশ্ন হবে। আয়াতুল কুরসী পাঠকারী সঠিক উত্তর দিতে পারবে এবং তার জন্য কবরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করা হবে।
২. হাশরের মাঠ: প্রত্যেক ব্যক্তিকে হাশরের মাঠে দাঁড়াতে হবে এবং হিসাব দিতে হবে। তবে আয়াতুল কুরসী পাঠকারীর হিসাব সহজ হবে এবং সে নিরাপদ থাকবে।
৩. জান্নাতের নিয়ামত: মৃত্যুর পর আত্মা বারযাখ জগতে অবস্থান করে। সেখানে নেককারদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ এবং কিছু নিয়ামতের অনুভূতি দেওয়া হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ নিয়ামত কিয়ামতের পর জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যমে লাভ হবে।
৪. হাদিসের মর্ম: হাদিসটির মূল উদ্দেশ্য হলো আয়াতুল কুরসী পাঠের গুরুত্ব ও ফজিলত বোঝানো, যাতে মুমিনগণ নিয়মিত এটি পাঠ করে। এর অর্থ এই নয় যে, হিসাব-নিকাশ ছাড়াই সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে।
উপসংহার
আয়াতুল কুরসী পাঠ একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এটি পাঠকারী ব্যক্তি কবরের আযাব থেকে নিরাপদ থাকবে, হাশরের মাঠে তার হিসাব সহজ হবে এবং জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার কোনো কবরের প্রশ্ন বা হাশরের হিসাবই হবে না। বরং তার জন্য এসব সহজ করে দেওয়া হবে এবং সে নিরাপদ থাকবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আয়াতুল কুরসী পাঠের আমল করার তাওফীক দান করুন এবং কবরের প্রশ্ন ও হাশরের হিসাব সহজ করুন। আমীন।