বিয়ের সময় অতীতের সম্পর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও উত্তরের বিধান কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
বিয়ের সময় অতীতের সম্পর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও উত্তরের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আগে হারাম সম্পর্ক ছিল, এখন নেই। বিয়ের সময় দেখা-দেখির পর্বে ছেলে যদি জিজ্ঞেস করে আগে সম্পর্ক ছিল কিনা—এমন অবস্থায় উত্তর না দিলে পাপ হবে কি? করণীয় কী?
উত্তর
১. মৌলিক নীতি: গোপন রাখা vs. মিথ্যা বলা
ইসলামী শরীয়তে মিথ্যা বলা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। তবে সত্য গোপন রাখা বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে চুপ থাকা জায়েয হতে পারে, বিশেষত যখন তা বললে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
২. বিয়ের প্রস্তাবে সততা ও গোপনীয়তার ভারসাম্য
বিয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশনা হলো:
- যে বিষয়গুলো বৈবাহিক জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে (যেমন: গুরুতর রোগ, শারীরিক অক্ষমতা, ইত্যাদি) সেগুলো প্রকাশ করা জরুরি।
- অতীতের পাপ বা গুনাহ সম্পর্কে জানানো জরুরি নয়, বরং তা গোপন রাখা উত্তম। কারণ আল্লাহ তাআলা পাপ ঢেকে রাখা পছন্দ করেন।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৯৯)
৩. সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার বিধান
যদি ছেলে সরাসরি জিজ্ঞেস করে "আগে কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা", তখন:
- মিথ্যা বলা যাবে না — কারণ মিথ্যা বলা হারাম।
- সত্য বলা বাধ্যতামূলক নয় — কারণ অতীতের পাপ প্রকাশ করা শরীয়তে উৎসাহিত নয়।
- এড়িয়ে যাওয়া বা চুপ থাকা — এটি জায়েয, তবে উত্তম পদ্ধতি হলো তওরিয়াহ (কৌশলী উত্তর) দেওয়া।
৪. তওরিয়াহ (কৌশলী উত্তর) কী?
তওরিয়াহ হলো এমন উত্তর দেওয়া যা শুনতে সত্য মনে হয়, কিন্তু বক্তা অন্য অর্থ বোঝায়। এটি মিথ্যা নয়, বরং জায়েয।
উদাহরণ:
- "আল্লাহর শুকর, আমি এখন ভালো আছি।"
- "আমি তওবা করেছি এবং নতুন জীবন শুরু করেছি।"
- "অতীতের কথা বলার চেয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা ভালো।"
৫. ফতোয়াভিত্তিক নির্দেশনা
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় বলেন:
"অতীতের পাপ সম্পর্কে কাউকে জানানো জরুরি নয়। বরং আল্লাহর কাছে তওবা করাই যথেষ্ট। বিয়ের সময় অতীতের পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা শরীয়তসম্মত নয়, এবং উত্তর না দেওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া জায়েয।"
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"বিয়ের প্রস্তাবে সততা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সততার অর্থ এই নয় যে, নিজের সমস্ত গুনাহ প্রকাশ করে দেওয়া। শরীয়তের দৃষ্টিতে গুনাহ গোপন রাখা উত্তম। যদি কেউ সরাসরি জিজ্ঞেস করে, তবে মিথ্যা না বলে কৌশলে উত্তর দেওয়া যেতে পারে।"
৬. করণীয় কী?
১. আল্লাহর কাছে তওবা করুন — অতীতের পাপের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করুন এবং দৃঢ় সংকল্প করুন যে ভবিষ্যতে আর করবেন না। 2. বিয়ের সময় অতীতের পাপ প্রকাশ করবেন না — এটি শরীয়তসম্মত নয়। 3. প্রশ্ন এড়িয়ে যান — কৌশলী উত্তর দিন বা বিষয় পরিবর্তন করুন। 4. মিথ্যা বলবেন না — মিথ্যা বলা হারাম, তবে তওরিয়াহ জায়েয। 5. বিয়ের পর ভালো স্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করুন — অতীতের জন্য অনুতপ্ত হয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সুন্দর করার চেষ্টাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
৭. গুরুত্বপূর্ণ নোট
- বিয়ের আগে পাপ প্রকাশ করা জরুরি নয়, কারণ ইসলাম পাপ গোপন রাখতে উৎসাহিত করে।
- বিয়ের পর যদি কখনো জানা যায়, তখন ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ভালো জীবনযাপন করাই প্রকৃত তওবার প্রমাণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন এবং হিদায়াত দান করুন। আমীন।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৬/৩৭২
- ফতোয়া উসমানি, ২/৪৫৬
- ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৯৮
- বেহেশতী জেওর, ২/৪৫
- সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৯৯