ব্যাংকে চাকরি করা ছেলের সাথে বিয়ে করা কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3826
Questioner: Suraiya Akter
Question Asked: 11 Aug 2026, 08:29 PM
Reviewed & Published: 11 Aug 2026, 08:51 PM
Views: 11
Tokens: 3,332
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে জেনে বিয়ে করা ঠিক হবে? বলেছে পরে ব্যবসা করবে। কিন্তু এখন ব্যাংকে কাজ করে

Answer

ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে — এমন ব্যক্তির সাথে বিয়ে করা কি জায়েজ?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন ছেলে বর্তমানে ব্যাংকে চাকরি করছে। সে বলেছে, পরে ব্যবসা করবে। এখন জানতে চাওয়া হয়েছে— এমন ব্যক্তির সাথে বিয়ে করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ঠিক হবে কি না?


উত্তর

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ব্যাংকে চাকরি করা এবং বিয়ে করা— এই দুটি বিষয় আলাদা। বিয়ে করার জন্য মূল শর্ত হলো দীনদারি ও চরিত্র। তবে ব্যাংকের চাকরি যদি সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত থাকে, তবে তা হারাম উপার্জন। হারাম উপার্জনকারী ব্যক্তির সাথে বিয়ে করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) এবং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে যদি সে তওবা করে এবং ভবিষ্যতে হালাল উপার্জনের সংকল্প করে, তবে বিয়ে করা জায়েজ।


বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. ব্যাংকের চাকরির শরয়ী হুকুম

ইসলামী শরীয়তে সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"অর্থাৎ যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন দাঁড়াবে না, তবে যেভাবে দাঁড়ায় সে ব্যক্তি, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এজন্যে যে, তারা বলে— ক্রয়-বিক্রয় তো সুদেরই মত। অথচ আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি সুদ খায়, যে ব্যক্তি সুদ খাওয়ায়, যে ব্যক্তি সুদের দলিল লিখে এবং যে ব্যক্তি সুদের সাক্ষী থাকে— তাদের উপর আল্লাহর লানত (অভিশাপ)।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৭)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)在其著名的著作 রদ্দুল মুহতার -এ বলেন:

"সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত কোনো কাজে সাহায্য করা, যেমন— সুদের হিসাব লেখা, সুদের লেনদেনের সাক্ষী হওয়া, সুদের অর্থ বহন করা ইত্যাদি সকল কাজ হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৬)

সুতরাং, যে ব্যাংকে সুদী লেনদেন হয়— সেখানে চাকরি করা, সুদের হিসাব রাখা, সুদী লেনদেন সম্পন্ন করা ইত্যাদি কাজ হারাম।


২. হারাম উপার্জনকারী ব্যক্তির সাথে বিয়ের বিধান

বিয়ে করার ক্ষেত্রে ইসলাম সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে দীনদারি ও নৈতিক চরিত্রের উপর। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"কোনো নারীর সাথে চারটি বিষয় দেখে বিয়ে করা হয়— তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দীনদারি। তুমি দীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তবেই তুমি সফল হবে।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)

তবে হারাম উপার্জনকারী ব্যক্তির সাথে বিয়ে করা সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন:

  • হারাম উপার্জনকারী ব্যক্তির সাথে বিয়ে করা মাকরূহ (নাপসন্দ) — কারণ এতে পরিবারে হারাম অর্থ প্রবেশের আশঙ্কা থাকে।
  • তবে যদি সে তওবা করে এবং হালাল উপার্জনের সংকল্প করে, তাহলে বিয়ে করা জায়েজ।

ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) -তে উল্লেখ আছে:

"যে ব্যক্তি সুদ খায় বা হারাম উপার্জন করে, তার সাথে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করা মাকরূহ। কারণ এতে হারাম অর্থ ঘরে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৩০)


৩. ছেলেটির "পরে ব্যবসা করবে" বলার প্রেক্ষিতে বিধান

ছেলেটি যদি সত্যিই আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং ভবিষ্যতে হালাল উপার্জনের দৃঢ় সংকল্প করে, তবে:

  • বিয়ে করা জায়েজ — কারণ সে হারাম কাজ ছেড়ে দিতে চাচ্ছে।
  • তবে শর্ত হলো — সে যেন এখনই ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং হালাল উপার্জনের পথ খুঁজে নেয়।
  • যদি সে শুধু মুখে বলে "পরে ব্যবসা করব" কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকের চাকরিতে থেকে যায়, তাহলে সেটা ধোঁকা হিসেবে গণ্য হবে।

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:

"যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার সাথে বিবাহ করা উচিত নয়। তবে যদি সে তওবা করে এবং হালাল উপার্জনের সংকল্প করে, তাহলে বিবাহ করা যেতে পারে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৮০)


৪. বিবাহের মূল উদ্দেশ্য

বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো— দীনদারি, চরিত্র ও নৈতিকতা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দীনদারি ও চরিত্র তোমাদের পছন্দ হয়, তখন তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে।" (সুনানে তিরমিযী: ১০৮৪)

তাই প্রশ্নকারিণীকে বলব—

  • ছেলেটির দীনদারি ও চরিত্র কেমন— সেটা আগে দেখুন।
  • সে সত্যিই তওবা করতে চায় কি না— সেটা যাচাই করুন।
  • সে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করছে কি না— সেটা দেখুন।
  • যদি সে আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং হালাল উপার্জনের সংকল্প করে, তবে বিয়ে করা জায়েজ।
  • কিন্তু যদি সে ব্যাংকের চাকরিতে থেকে যায় এবং শুধু মুখে বলে "পরে ব্যবসা করব", তাহলে সতর্ক থাকা উচিত।

৫. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত

১. তওবার শর্ত — হারাম কাজ ছেড়ে দেওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা। ২. হালাল উপার্জনের চেষ্টা — ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে হালাল পেশায় যাওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করা। ৩. বিয়ের আগে পরামর্শ — পরিবারের বড়দের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ৪. দুআ করা — আল্লাহর কাছে হিদায়াত কামনা করা।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

  • যদি ছেলেটি আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং হালাল উপার্জনের সংকল্প করে — তবে বিয়ে করা জায়েজ
  • যদি সে ব্যাংকের চাকরিতে থেকে যায় এবং হারাম উপার্জন অব্যাহত রাখে — তবে তার সাথে বিয়ে করা মাকরূহ এবং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
  • বিয়ের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দীনদারি ও চরিত্র, শুধু সম্পদ বা চাকরি নয়।

"আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল উপার্জনের তাওফীক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।"


দলিলসমূহ

১. সূরা আল-বাকারা: ২৭৫ — সুদ হারাম ২. সহীহ মুসলিম: ১৫৯৭ — সুদের সাথে জড়িতদের উপর লানত ৩. সহীহ বুখারী: ৫০৯০ — দীনদারি দেখে বিয়ে করার নির্দেশ ৪. সুনানে তিরমিযী: ১০৮৪ — দীনদার ও চরিত্রবান ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার ৫. রদ্দুল মুহতার — ৪/১৮৬ — সুদী কাজে সাহায্য হারাম ৬. ফাতাওয়া হিন্দিয়া — ৫/৩৩০ — হারাম উপার্জনকারীর সাথে বিয়ে মাকরূহ ৭. ইমদাদুল ফাতাওয়া — ২/৩৮০ — তওবা করলে বিয়ে জায়েজ



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.