কখন হজ্জ ফরজ হয় এবং বর্তমান সম্পদ দিয়ে জমি কেনা যাবে কিনা?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
উস্তাদ, আমার হাজব্যান্ড আর আমি ঢাকায় থাকি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনিই।
তার কাছে বর্তমানে 11 লাখ টাকার মতো জমানো টাকা।
আর একটা ফ্ল্যাটের জন্য জমির শেয়ারের অর্ধেক মালিকানা আছে। ঢাকায় যেমনটা হয়।
তিনি চাচ্ছেন শেয়ার টা বিক্রি করে ঐ টাকা দিয়ে এলাকায় একটু ভালো দেখে জমি কিনতে যাতে পরবর্তীতে সেখানে বাড়ি করা যায় ।
বর্তমান শেয়ার বিক্রির পর অর্ধেক টাকা তার হবে আল্লাহ পাক চাইলে। আশাকরি 20/22 লাখে শেয়ার টা বিক্রি করা যেতে পারে ইং শা আল্লাহ। ২/৩ মাস লাগবে হয়তো।
আমার হাজব্যান্ডের সমস্ত সেভিংস এতটুকুই।
উল্লেখ্য - আমার শশুরের সম্পত্তি এখনো ভাগ হয় নি। ভাগ হলেও ঐখান থেকে আমাদের খরচের ধান উৎপাদন সম্ভব না।
আমাদের নিজেদের কোন বাসা বা বাড়ি কিছু নেই। আমার শশুর বাড়ি করেছেন, সেখানে এক রুমে থাকি যখন বাড়ি যাই।
আমার স্বামীর আরও ৪ জন ভাই ও ১ জন বোন আছেন। বাড়িতে তাদেরও ভাগ আছে।
.
এখন প্রশ্ন-
আমার হাজব্যান্ডের বর্তমান যে সম্পত্তি আছে তাতে কি তার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে?
নাকি আমরা এই টাকা দিতে জমি কিনে রাখতে পারবো?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য নিসাব (নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ) থাকা শর্ত, তবে এটি যাকাতের নিসাবের মতোই। হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত হলো, ব্যক্তির কাছে তার এবং তার পরিবারের (যাদের ভরণপোষণ তার দায়িত্বে) জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত এত পরিমাণ সম্পদ থাকা, যা দিয়ে সে মক্কা-মদিনা যাওয়ার খরচ বহন করতে পারে এবং ফিরে আসার পরও তার ও পরিবারের জন্য জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা থাকে।
আপনার প্রশ্নের আলোকে বিশ্লেষণ:
আপনার স্বামীর বর্তমান সম্পদ: ১. জমানো ১১ লক্ষ টাকা। ২. একটি ফ্ল্যাটের জমির অর্ধেক শেয়ার, যা বিক্রি করলে ২০/২২ লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে (আল্লাহ চাইলে)।
এখন বিধান:
১. বর্তমান অবস্থায় (১১ লক্ষ টাকা হাতে থাকা অবস্থায়): যেহেতু আপনার নিজেদের কোনো বাসা বা বাড়ি নেই, এবং শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও সেটি স্থায়ী সমাধান নয় (কারণ সেখানে অন্য ভাই-বোনদেরও ভাগ আছে), তাই এই ১১ লক্ষ টাকা দিয়ে হজ্জে যাওয়া আপনার স্বামীর জন্য ফরজ হবে না। কারণ, হজ্জে গেলে এই টাকা খরচ হয়ে যাবে, ফলে ফিরে আসার পর তার এবং আপনার (পরিবারের) থাকার কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। ইসলামে হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য "ইস্তিতাআত" (সামর্থ্য) শর্ত, যার মধ্যে নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)
২. শেয়ার বিক্রির পর (২০/২২ লক্ষ টাকা হাতে আসার পর): এই অবস্থায়ও যদি তিনি জমি কেনার পরিকল্পনা করেন, তাহলে সেই জমি কেনার পর যদি তার কাছে হজ্জের খরচের অতিরিক্ত টাকা না থাকে, তাহলেও হজ্জ ফরজ হবে না। তবে, যদি তিনি জমি কেনার পরও তার কাছে হজ্জের খরচ (যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি) এবং ফিরে আসার পর পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে অতিরিক্ত টাকা থাকে, তাহলে হজ্জ ফরজ হয়ে যাবে।
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
- বর্তমান ১১ লক্ষ টাকা দিয়ে হজ্জ ফরজ হয়েছে কি? না, ফরজ হয়নি। কারণ, এই টাকা দিয়ে হজ্জ করলে আপনার সংসারের ভরণপোষণ ও থাকার ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য প্রয়োজন "নিসাব" থাকা সত্ত্বেও তা যেন জীবিকার প্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত হয়।
- এই টাকা দিয়ে জমি কেনা যাবে কি? হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। বরং এটি একটি উত্তম সিদ্ধান্ত। কারণ, নিজেদের থাকার জন্য একটি স্থায়ী জমি বা বাসা তৈরি করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈধ। হাদিসে আছে, "মানুষের সুখের মধ্যে রয়েছে প্রশস্ত ঘর, ভালো сосед এবং আরামদায়ক বাহন।" (মুসনাদ আহমাদ)।
হানাফি ফিকহের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ নীতি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরামের মতে, হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য "নাফাকা" (নিজের ও পরিবারের খরচ) এবং "মাসকান" (বাসস্থান) এর ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। যদি কারো কাছে নিসাব পরিমাণ টাকা থাকে, কিন্তু সে টাকা দিয়ে হজ্জ করলে তার পরিবারের ভরণপোষণ ও থাকার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তার উপর হজ্জ ফরজ নয়। (বাদায়েউস সানায়ি, ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
আপনার স্বামীর করণীয়:
১. প্রথমে শেয়ারটি বিক্রি করুন। ২. সেই টাকা দিয়ে এলাকায় একটি ভালো জমি কিনুন। ৩. জমি কেনার পর যদি হাতে কিছু টাকা অবশিষ্ট থাকে, তাহলে সেটি দিয়ে হজ্জের খরচ বহন করা সম্ভব কিনা দেখুন। যদি সম্ভব হয় এবং ফিরে আসার পর পরিবারের জন্য খরচ ও থাকার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে হজ্জ ফরজ হবে। ৪. যদি জমি কেনার পর হাতে টাকা না থাকে, তাহলে হজ্জ ফরজ হবে না। তবে, যখনই সামর্থ্য হবে, তখনই হজ্জ করতে হবে।
মোটকথা: আপনার স্বামী জমি কেনার পর যদি তার কাছে হজ্জের খরচের অতিরিক্ত টাকা না থাকে, তাহলেও হজ্জ ফরজ হবে না। তবে, যদি তিনি জমি কেনার পরও তার কাছে হজ্জের খরচ (যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি) এবং ফিরে আসার পর পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে অতিরিক্ত টাকা থাকে, তাহলে হজ্জ ফরজ হয়ে যাবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।