মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর ১২ বছর পরে মিরাছ বন্টনের সমাধান কিভাবে করা যেতে পারে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
মাঝে মধ্যে ২/১ বার উদ্যোগ নেয়া হলেও ঐ ব্যক্তির ওয়ারিশের মধ্যে মিরাছ বণ্টন করা হয় নি। এই ১২ বছরে উনার কিছু জমি ও ডোবা এবং পুকুর বিক্রি করা হয়। বিক্রির টাকা দিয়ে মূলত ৪ ধরনের কাজ করা হয়ঃ ১)মৃতের ঋণ দেয়া হয়। ২) অবিবাহিত ৩ ছেলেমেয়ের বিয়েতে খরচ করা হয়। ৩) দুই ছেলের লেখাপড়ায় ব্যয় করা হয়। ৪) ওয়ারিশদের মধ্য থেকে অনেকেই তাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেয়। (তবে সবাই সমান ভাবে নেয় নি। কেউ কম কেউবা বেশি নিয়েছে)। তবে, যেহেতু ১২ বছর চলে গিয়েছে, এই ৪ খাতের কোন কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে, কত টাকায় জমিজামা বিক্রি হয়েছে সেগুলোর আনুমানিক হয়তো হিসেব করা যাবে কিন্তু সুনির্দিষ্ট হিসেব নেই।
এখন সর্বসম্মতভাবে চূড়ান্ত ভাবে মিরাছ বন্টনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখানে কয়েকটি প্রশ্নঃ
(এক) মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পর এই ১২ বছরে বিভিন্ন সময় তার সম্পদ বিক্রি করে ঋণ দেয়া সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করার পর বর্তমানে যে সম্পদ আছে সেগুলো ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করলে চলবে কিনা?
(দুই) মৃতের সম্পদ বিক্রির পর উপরে উল্লিখিত খাত সমূহে ব্যয়ের হিসেবের সমাধান কিভাবে করা যেতে পারে?
(তিন) যেহেতু মৃত ব্যক্তি জীবীত থাকাকালীন জমিজামা বিক্রি করে কিংবা ঋণ করে ৫ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সেহেতু উনার মৃত্যুর পর বাকী ৩ ছেলেমেয়েকে তার সম্পদ বিক্রি করে পড়ালেখা ও বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সমাধান ও মন্তব্য ঠিক আছে কিনা?
(চার) উপরেরে অবস্থার আলোকে বর্তমানে মিরাছ বন্টনের সমাধান কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে কিভাবে করা যেতে পারে?
Answer
মিরাছ বণ্টন সংক্রান্ত জটিল প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের বিবরণ: এক ব্যক্তি ১২ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি স্ত্রী, ২ পুত্র ও ৬ কন্যা রেখে যান। মৃত্যুর পর ১২ বছর ধরে সম্পদ বিক্রি করে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এখন মিরাছ বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
(এক) বর্তমান সম্পদ বণ্টন করা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমানে যে সম্পদ অবশিষ্ট আছে তা ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা যাবে। তবে শর্ত হলো, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে যেসব খরচ বৈধ ছিল (যেমন: ঋণ পরিশোধ, কাফন-দাফন) সেগুলো সম্পদ থেকে বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।
দলিল: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: ছেলের অংশ দুই মেয়ের সমান।" (সূরা আন-নিসা: ১১)
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৃতের সম্পদ থেকে যে খরচগুলো করা হয়েছে সেগুলোর বৈধতা যাচাই করা। ইসলামী আইন অনুযায়ী, মৃতের সম্পদ থেকে নিম্নোক্ত খরচগুলো করা বৈধ:
১. কাফন-দাফনের খরচ (মৃতের সম্পদ থেকে) ২. ঋণ পরিশোধ (মৃতের সম্পদ থেকে) ৩. অসিয়ত পূরণ (সম্পদের ১/৩ অংশ থেকে) ৪. ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন (অবশিষ্ট সম্পদ)
রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে প্রথমে কাফন-দাফনের খরচ, অতঃপর ঋণ পরিশোধ, অতঃপর অসিয়ত (১/৩ অংশ থেকে) পূরণ করতে হবে, তারপর অবশিষ্ট সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬:৭৬০)
(দুই) ব্যবহারিক সমাধান
উত্তর: যেহেতু ১২ বছর ধরে বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই, তাই নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে সমাধান করা যেতে পারে:
১. মৃতের ঋণ পরিশোধ:
মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা সম্পদের উপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। যদি ঋণ পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তবে তা বৈধ। যদি কোনো ঋণ অবশিষ্ট থাকে, তবে বর্তমান সম্পদ থেকে তা পরিশোধ করতে হবে।
২. অবিবাহিত সন্তানদের বিয়ের খরচ:
মৃতের সম্পদ থেকে সন্তানদের বিয়ের খরচ করা জায়েয নয় যদি তা ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া করা হয়। কারণ, মৃতের সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হওয়ার পর প্রত্যেকের নিজস্ব সম্পদ। তাই কারো সম্মতি ছাড়া অন্য কারো অংশ থেকে খরচ করা জুলুম।
তবে, যদি সকল ওয়ারিশ সম্মত হয়ে এই খরচ করে থাকে, তাহলে তা বৈধ হবে। কিন্তু বণ্টনের সময় যারা কম পেয়েছে তাদের অংশ পূরণ করে দিতে হবে।
৩. লেখাপড়ার খরচ:
একই নিয়ম প্রযোজ্য। যদি সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে করা হয়ে থাকে, তবে বৈধ; অন্যথায় খরচকারীকে তা ফেরত দিতে হবে।
৪. ওয়ারিশদের নেওয়া টাকা:
যারা মৃতের সম্পদ থেকে টাকা নিয়েছে, তাদের নেওয়া টাকা তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে কেটে নেওয়া হবে। যদি কেউ তার প্রাপ্য অংশের বেশি নিয়ে থাকে, তবে তাকে ফেরত দিতে হবে।
ফতোয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে:
"মৃতের সম্পদ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন না হওয়া পর্যন্ত তা সকলের সম্মিলিত সম্পদ। কোনো ওয়ারিশ অপর ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া তা থেকে খরচ করতে পারবে না। যদি কেউ করে থাকে, তবে তাকে ফেরত দিতে হবে।" (ফতোয়া উসমানী, ২:৩৪৫)
(তিন) জীবিত অবস্থায় ৫ মেয়েকে বিয়ে দেওয়া এবং মৃত্যুর পর ৩ সন্তানের খরচ
উত্তর:
জীবিত অবস্থায় ৫ মেয়েকে বিয়ে দেওয়া:
মৃত ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজ সম্পদ থেকে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন - এটি সম্পূর্ণ বৈধ। এটি তার নিজস্ব ইচ্ছা ও সম্পদের উপর তার পূর্ণ অধিকার ছিল। এতে কোনো সমস্যা নেই।
মৃত্যুর পর ৩ সন্তানের বিয়ে ও লেখাপড়ার খরচ:
মৃত্যুর পর মৃতের সম্পদ থেকে সন্তানদের বিয়ে ও লেখাপড়ার খরচ করা সঠিক নয় যদি তা সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে না করা হয়। কারণ:
১. মৃতের সম্পদ মৃত্যুর সাথে সাথে ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টনের জন্য নির্ধারিত হয়। ২. কোনো ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া অন্য ওয়ারিশের অংশ থেকে খরচ করা জুলুম। ৩. তবে, যদি সকল ওয়ারিশ সম্মত হয়ে থাকে, তাহলে তা বৈধ হবে।
ইমদাদুল ফতোয়া-তে উল্লেখ আছে:
"মৃতের সম্পদ থেকে ওয়ারিশদের খরচ চালানো বা তাদের বিয়ে দেওয়া জায়েয নয়, যতক্ষণ না সকল ওয়ারিশ সম্মত হয়। যদি কেউ সম্মতি ছাড়া করে, তবে তাকে ফেরত দিতে হবে।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪:১৮৫)
(চার) কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে মিরাছ বণ্টনের সমাধান
উত্তর: নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে মিরাছ বণ্টন করা যেতে পারে:
ধাপ ১: মৃতের সম্পদ নির্ধারণ
বর্তমানে যে সম্পদ আছে তা নির্ধারণ করতে হবে। সাথে সাথে ১২ বছরে বিক্রি হওয়া সম্পদের মূল্যও হিসাব করতে হবে।
ধাপ ২: প্রাপ্য খরচ বাদ দেওয়া
- কাফন-দাফনের খরচ (যদি বাকি থাকে)
- ঋণ পরিশোধ (যদি বাকি থাকে)
- অসিয়ত পূরণ (১/৩ অংশ থেকে)
ধাপ ৩: ওয়ারিশ নির্ধারণ ও অংশ বণ্টন
ওয়ারিশগণ:
- স্ত্রী: ৮ অংশের ১ অংশ (সন্তান থাকায়)
- ২ পুত্র ও ৬ কন্যা: ৮ অংশের অবশিষ্ট৭ অংশ
কুরআনের নির্দেশ:
فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمْ "তোমাদের স্ত্রীদের জন্য রয়েছে এক-অষ্টমাংশ যা তোমরা রেখে যাও।" (সূরা আন-নিসা: ১২)
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: ছেলের অংশ দুই মেয়ের সমান।" (সূরা আন-নিসা: ১১)
বণ্টন পদ্ধতি:
- স্ত্রী পাবেন: ১/৮ অংশ
- অবশিষ্ট ৭/৮ অংশ ২ পুত্র ও ৬ কন্যার মধ্যে বণ্টন হবে
- প্রত্যেক পুত্র পাবে: ২ কন্যার সমান অংশ
- মোট অংশ: ২ পুত্র × ২ = ৪ + ৬ কন্যা × ১ = ৬, মোট ১০ অংশ
- প্রত্যেক পুত্র পাবে: ৭/৮ × ২/১০ = ১৪/৮০ = ৭/৪০ অংশ
- প্রত্যেক কন্যা পাবে: ৭/৮ × ১/১০ = ৭/৮০ অংশ
ধাপ ৪: পূর্ববর্তী খরচের হিসাব
- যারা মৃতের সম্পদ থেকে টাকা নিয়েছে, তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে কেটে নিতে হবে
- যদি কেউ বেশি নিয়ে থাকে, তাকে ফেরত দিতে হবে
- যদি কেউ কম পেয়ে থাকে, তাকে পূরণ করে দিতে হবে
ধাপ ৫: অসিয়তের বিষয়
মৃত ব্যক্তি এক মেয়েকে ৩ শতাংশ জমি দানের অসিয়ত করে গেছেন। যেহেতু অসিয়ত ১/৩ অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাই:
- যদি ৩ শতাংশ জমি মোট সম্পদের ১/৩ অংশের কম হয়, তবে তা পূরণ করা যাবে
- যদি ১/৩ অংশের বেশি হয়, তবে শুধু ১/৩ অংশ পর্যন্ত পূরণ হবে
- মনে রাখতে হবে: ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া ১/৩ অংশের বেশি অসিয়ত কার্যকর হবে না
আল-হিদায়া-তে উল্লেখ আছে:
"অসিয়ত সম্পদের ১/৩ অংশ থেকে কার্যকর হবে। এর বেশি ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হবে না।" (আল-হিদায়া, ৪:৫৪০)
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. সকল ওয়ারিশের সম্মতির গুরুত্ব: যেহেতু ১২ বছর ধরে বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে, তাই সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে একটি সমঝোতা করা উত্তম। যদি সবাই সম্মত হয় যে, "আমরা এই খরচগুলো মেনে নিচ্ছি এবং বর্তমান সম্পদ বণ্টন করব", তাহলে তা বৈধ হবে।
২. সুন্নাহর নির্দেশ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুসলিমদের মধ্যে সমঝোতা জায়েয, তবে যে সমঝোতা হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করে দেয় তা ছাড়া।" (আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৯৪)
৩. ঋণগ্রস্ত অবস্থায়: যদি মৃতের কোনো ঋণ অবশিষ্ট থাকে, তবে তা প্রথমে পরিশোধ করতে হবে। ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত সম্পদ বণ্টন করা যাবে না।
৪. আনুমানিক হিসাব: যেহেতু সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই, তাই আনুমানিক হিসাবের ভিত্তিতে সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে একটি হিসাব তৈরি করা যেতে পারে। তবে, কোনো ওয়ারিশ যদি আপত্তি করে, তবে তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।
সংক্ষিপ্ত সমাধান
১. বর্তমান সম্পদ ও ১২ বছরে বিক্রি হওয়া সম্পদের আনুমানিক হিসাব তৈরি করুন। ২. মৃতের ঋণ (যদি অবশিষ্ট থাকে) পরিশোধ করুন। ৩. অসিয়ত (৩ শতাংশ জমি) ১/৩ অংশের মধ্যে হলে পূরণ করুন। ৪. অবশিষ্ট সম্পদ কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী বণ্টন করুন:
- স্ত্রী: ১/৮
- ২ পুত্র ও ৬ কন্যা: ৭/৮ (পুত্র = ২ কন্যার সমান) ৫. পূর্ববর্তী খরচের হিসাব মিলিয়ে নিন - যারা বেশি নিয়েছে তাদের থেকে কেটে নিন, যারা কম পেয়েছে তাদের পূরণ করুন। ৬. সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে একটি চূড়ান্ত সমঝোতা করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।