২ সন্তানের বেশি সন্তান না নিলে কি গুনাহ হবে ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তরঃ
আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী আজল (গর্ভধারণ রোধের জন্য বীর্যপাতের পূর্বে স্ত্রী থেকে পৃথক হওয়া) পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং মাত্র দুটি সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে কিছু শর্ত ও আদব রয়েছে, যা পালন করা জরুরি। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. আজল পদ্ধতি সম্পর্কে হানাফী ফিকহের বিধান
-
আজলের বৈধতা :
হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহিমাহুমুল্লাহ) সকলেই আজলকে জায়েজ বলেছেন, তবে শর্ত হলো স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া। কারণ স্ত্রীর সন্তান লাভের অধিকার রয়েছে।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/১৬৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪) -
বিনা কারণে আজল করা :
যদি কোনো প্রয়োজন না থাকে (যেমন স্বাস্থ্যগত কারণ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, সন্তান লালন-পালনের অক্ষমতা ইত্যাদি) তাহলে তা মাকরুহ তানজিহী (অনভিপ্রেত) হতে পারে। কিন্তু আপনাদের ক্ষেত্রে ধৈর্যের অভাব (অর্থাৎ সন্তান লালন-পালনের মানসিক চাপ সহ্য করতে না পারা) একটি প্রয়োজন হিসেবে গণ্য হতে পারে। সুতরাং এই উদ্দেশ্যে আজল করা জায়েজ হবে, ইনশাআল্লাহ।
(সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৫২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২১) -
স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক :
স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে আজল করা শর্ত। যেহেতু আপনারা উভয়েই এই সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন, তাই এখানে কোনো সমস্যা নেই।
২. সন্তান সংখ্যা নির্ধারণ ও আল্লাহর উপর ভরসা
-
ইসলাম সন্তান জন্মদানকে উৎসাহিত করে, তবে তা অবশ্যই ওয়াজিব নয়। একজন মুসলিম দম্পতি তাদের সামর্থ্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী সন্তান পরিকল্পনা করতে পারেন।
(সূত্র: তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ২/৪২৬; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, ৪/২৫৩) -
আপনারা দুটি সন্তানের জন্য দোয়া করছেন যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে বরকত দান করুন। এটি একটি উত্তম মানসিকতা। তবে মনে রাখতে হবে, সন্তান আল্লাহর দান এবং তিনি যাকে ইচ্ছা অধিক বা কম দেন। তাই নিজের পরিকল্পনা করার পাশাপাশি আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করাও জরুরি।
(কুরআন: আশ শুরা, ৪২:৪৯-৫০)
৩. গুনাহের প্রশ্ন
-
আজল ব্যবহার করা ও দুই সন্তানের পরিকল্পনা করা গুনাহ নয়, যদি তা উভয়ের সম্মতিতে হয় এবং কোনো স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (টিউবেকটমি, ভ্যাসেকটমি) না করা হয়। স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ হারাম, কারণ তা আল্লাহর দেয়া সন্তান ধারণের ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে শেষ করে দেয়।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/১৬৯) -
তবে ধৈর্যের অভাবে সন্তান লালন-পালন না করার মানসিকতা ঠিক নয়। বরং সর্বদা ধৈর্য ধারণের জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত।
(কুরআন: আল বাকারা, ২:১৫৩)
৪. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- আপাতত আজল পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। তবে ভবিষ্যতে যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়, তাহলে আরও সন্তান নেওয়ার জন্য উন্মুক্ত থাকুন।
- কনডম বা নন-হরমোনাল পিলের মতো অস্থায়ী পদ্ধতিও ব্যবহার করা জায়েজ। কিন্তু স্থায়ী পদ্ধতি থেকে বিরত থাকুন।
- সর্বদা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখুন এবং দোয়া করুন যেন তিনি আপনাদের সন্তানদের মধ্যে বরকত দান করেন।
সারসংক্ষেপ :
আপনাদের পরিকল্পনা শরীয়তসম্মত এবং এর জন্য গুনাহ হবে না। তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেননা। মনে রাখবেন, সন্তান আল্লাহর আমানত এবং তিনি যেভাবে চান সেভাবেই তা পরিচালিত হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনার সিদ্ধান্তে বরকত দিন এবং আপনাদের ধৈর্য দান করুন। আমীন।
📚 প্রাসঙ্গিক কিতাবের উল্লেখ
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৩/১৬৯
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) – ৫/৩৫৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ২/৩৫২
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) – ২/৪২১
- তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী) – ২/৪২৬
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী) – বিবাহ অধ্যায়