বিবাহের বিষয়ে উপদেশ এবং কুরআন পড়ানো
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন ০১.
বাসায় আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে।
পাত্র আমার জন্য কল্যাণকর কিনা সেটা নিয়ে আমি কয়েকদিন ইস্তেখারা করেছি। কিন্তু ভালো মন্দ কিছু বুঝতে পারছি না। পাত্র আমার বড় ভাইয়ের পরিচিত, যতটুকু জানি উনি প্র্যাক্টিসিং। দ্বীন মানার ট্রাই করেন। উনার ফ্যামিলিও প্র্যাক্টিসিং আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু একটু প্রব্লেম আছে। উনারা চট্টগ্রামের স্থায়ী হওয়ার কারণে আমাদের সাথে উনাদের কুফু মিলছে না। উনার বড় ছেলের বিয়ের সময়েও পাত্রীর বাড়ি থেকে পাতিল মাজার জালি থেকে বদনা পর্যন্ত সবকিছু নাকি দিয়েছিল। এটা এক প্রকার যৌতুক! বড় ভাইয়াও বলছিল উনাদের এটা সেটা দিতে হবে। এগুলো তো জুলুম ছাড়া কিছু না! বাসায় বড়দের আকাঙ্ক্ষা উনাদের সাথেই যেন আত্মীয়তা করা যায়। আমার মতামতের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আমি ইস্তেখারা করে কোনোকিছুই আঁচ করতে পারছি না। একবার মনে হয় উনি তো ভালো, আবার মনে হয় উনার ফ্যামিলির তো সমস্যা। এক্ষেত্রে আমি আপনাদের শরণাপন্ন হচ্ছি। আশেপাশে বা পরিচিত কোনো মুফতি আলেম/আলেমা নেই, যার সাথে ডিসকাস করা যায়। আমাকে উপদেশ দিন মিন ফাদ্বলিক। আমার কি রাজি হয়ে যাওয়া উচিত?
প্রশ্ন ০২
কার সাথে কার নিকাহ হবে এটা তো তাকদ্বীরের বিষয়। এখন আমি দুআ করছি, আল্লাহ যেন আমাকে একজন চক্ষুশীতলকারী, উত্তম আখলাকসম্পন্ন জীবনসঙ্গী দান করেন। আমি যদি দেখি উনার ব্যাপারে দুই ফ্যামিলির কথাবার্তা এগোচ্ছে বা উভয় ফ্যামিলি রাজি, তখন কি আমি এভাবে দুআ করতে পারবো যে, আল্লাহ উনাকে এবং উনার ফ্যামিলিকে আমার জন্য কল্যাণকর এবং চক্ষুশীতলকারী করে দাও? নাকি আগের দুআই জারি রাখবো?
প্রশ্ন ০৩
আমি ক্লাস ওয়ানের একটা বাচ্চাকে কুরআন পড়াই আলহামদুলিল্লাহ। ও সব হরফ, হামস, ক্বলক্বলাহ এগুলো সুন্দর উচ্চারণ করতে পারে না। আবার অনেক সময় ডাক দিলেও ভুল পড়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে ও ভুল পড়লে কি আমার গুনাহ হবে? আমি শুদ্ধ করে দেয়ার ট্রাই করি। কিন্তু সবসময় পারি না। মেয়েটা একই ভুল বারবার করতেই থাকে।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর প্রদানে আমি নিম্নোক্তভাবে আলোকপাত করছি:
প্রশ্ন ০১: বিয়ের পাত্র ও যৌতুক সংক্রান্ত সমস্যা
উত্তর:
বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এবং এতে ধর্মীয় ও নৈতিক দিক বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। আপনার ক্ষেত্রে পাত্র ও তার পরিবার দ্বীনদার হওয়া একটি ইতিবাচক দিক। তবে যৌতুকের বিষয়টি সম্পূর্ণ ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী এবং এটি একটি জুলুম।
ইসলামী নির্দেশনা:
- যৌতুক (পাত্রপক্ষের কাছ থেকে চাওয়া বা পাত্রীপক্ষকে দিতে বাধ্য করা) সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি যৌতুক দাবি করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২৩৪৯৯)
- পাত্রীপক্ষকে যৌতুক দিতে বাধ্য করা বা চাওয়া জুলুম। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা তাদেরকে (স্ত্রীদেরকে) যা কিছু দিয়েছ তা ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তাদেরকে কষ্ট দিও না।" (সূরা বাকারা: ২২৯)
আপনার করণীয়:
১. পাত্রের দ্বীনদারি ও চরিত্র ভালো হলে তা বিবেচনার প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমাদের সন্তুষ্ট করে, তখন তাকে বিয়ে করাও।" (তিরমিজি, হাদীস নং ১০৮৪)
২. যৌতুকের বিষয়টি পরিবারের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করুন। এটি ইসলামী দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, তাই এতে রাজি হওয়া উচিত নয়।
৩. ইস্তেখারা করার পরও যদি কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত না পান, তবে আপনি ভালো-মন্দ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ইস্তেখারা মানে এই নয় যে, স্বপ্ন বা বিশেষ ইঙ্গিত আসবেই; বরং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
সিদ্ধান্ত:
- পাত্র ও তার পরিবার দ্বীনদার হলে এবং যৌতুকের বিষয়টি পরিহার করা সম্ভব হলে আপনি রাজি হতে পারেন।
- যৌতুকের দাবি যদি অপরিহার্য হয়, তবে তা প্রত্যাখ্যান করুন। কারণ এটি হারাম কাজে অংশগ্রহণ করা হবে।
প্রশ্ন ০২: দুআ করার পদ্ধতি
উত্তর:
বিয়ে তাকদ্বীরের বিষয়, তবে দুআ করা এবং আল্লাহর কাছে ভালো জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি দেখেন যে, উভয় পরিবার রাজি এবং কথাবার্তা এগোচ্ছে, তখন আপনি এভাবে দুআ করতে পারেন:
আরবি দুআ:
اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا الْأَمْرُ خَيْرًا لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ
উচ্চারণ:
"আল্লাহুম্মা ইন কানা হাযাল আমরু খাইরান লি ফী দীনী ওয়া মাআশী ওয়া আ'কিবাতি আমরী, ফাকদুরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী, সুম্মা বারিক লী ফীহি।"
অর্থ:
"হে আল্লাহ! যদি এই কাজটি আমার জন্য আমার দ্বীন, জীবন ও পরিণামের দিক থেকে কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন, সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন।" (বুখারি, হাদীস নং ১১৬২)
আপনি আগের দুআটি জারি রাখতে পারেন এবং সাথে সাথে এই দুআটিও পড়তে পারেন। দুআতে কোনো বাধা নেই, বরং আল্লাহর কাছে ভালো চাওয়া উত্তম।
প্রশ্ন ০৩: কুরআন শেখানোর সময় শিশুর ভুল উচ্চারণ
উত্তর:
আপনি কুরআন শেখানোর চেষ্টা করছেন, এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। শিশুর ভুল উচ্চারণের জন্য আপনার গুনাহ হবে না, কারণ আপনি আপনার কর্তব্য পালন করছেন।
ইসলামী নির্দেশনা:
- শিক্ষক বা শিক্ষিকা যদি সঠিকভাবে শেখানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু শিক্ষার্থী ভুল করে, তবে শিক্ষকের কোনো গুনাহ নেই। বরং শিক্ষক সওয়াব পাবেন।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়, সে সর্বোত্তম ব্যক্তি।" (বুখারি, হাদীস নং ৫০২৭)
আপনার করণীয়:
১. শিশুটিকে ধৈর্য ধরে বারবার শুদ্ধ উচ্চারণ শেখানোর চেষ্টা করুন।
২. যদি সম্ভব হয়, তাহলে তাজবীদ শেখানোর জন্য কোনো অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাহায্য নিন।
৩. শিশুর বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী শেখানোর চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়।
সারসংক্ষেপ:
১. যৌতুকের বিষয়টি হারাম, তাই এতে রাজি হওয়া উচিত নয়। পাত্রের দ্বীনদারি ও চরিত্র ভালো হলে সেটি প্রধান বিবেচ্য।
২. দুআ করতে পারেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
৩. কুরআন শেখানোর চেষ্টা করলে আপনার গুনাহ হবে না, বরং সওয়াব পাবেন।
দলিল:
- সূরা বাকারা: ২২৯
- বুখারি, হাদীস নং ১১৬২, ৫০২৭
- তিরমিজি, হাদীস নং ১০৮৪
- মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২৩৪৯৯
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন।