বদদুয়া, অভিশাপ ও বদনজর থেকে মুক্তির ইসলামিক উপায় কি ? জানতে চাই
Family Life · Hanafi
Question
আমি গত ১০ বছর ধরে একটি খুব বড় বিপদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি - এর আগেও ছোট বড় বিপদ লেগেই থাকতো আমাদের পরিবারে/ বাসায় - তখন বয়স কম ছিল আর দ্বীন এর তেমন জ্ঞান ও ছিলনা - তাই তেমন কিছু করা হয়নি - মেনে নিয়েছি। ২০১৭ তে বিপদ শুরুর পর ২০১৯ এ একদিন ফজর পরে ঘুমানোর পর সপ্নে খুব কাছের আত্মীয়ের কাউকে দেখি এবং শুধু শুনি বা বুঝি আমার ক্ষতি করেছে , কিন্তু তারা আমার এতোটাই কাছের যে সেতা ভুল হিসেবে ধরে নিয়ে চলতে থাকি । এরপর ২০২৪ এ আমি খুব অসুস্থ হয়ে পরলে অই মানুষ গুলোকে কাছ থেকে দেখি এবং জানতে/ বুঝতে পারি তারা এমন টাই চায়। এরকম খুব কাছ থেকে বারবার ই বুঝছিলাম তাদের আসল রুপ। ঐ বিপদ তা এতো বছর পরে গতবছর কেটে যাওওার এক্তা সুজগ হয়, এবং তাদের খুশির খবর মনে করে বলে ফেলি - কিন্তু তারা জানার পর সেই সুযোগটা নষ্ট হয় - এবং অই ব্যাপারে খুব আশ্চর্যজনকভাবে আজ এক বছর তারা কি হল এটা কখনই কিছু জানতে চায়নি - অথচ বিপদ শুরুর পর এসে খুব কান্নাকাটি করত আর বলত আমার এই বিপদে তারাও ভাল নেই। গত দুইদিন ধরে আমি ঘুমানর আগে দুরুদ, ইস্তিগফার, আর আল্লাহর নাম পরে দুয়া করে ঘুমাই যেন আল্লাহ আমাকে একটু জানার বুঝার তাওাফিক দেয় - এবং দুইদিন ধরে তাদের কে দেখতে পাই। আমার আব্বু আমার বিপদ এর পর স্ট্রোক করে এখন খুব অসুস্থ - আমাদের ভাইবোন কে নিয়ে খুব চিন্তা করে - আম্মু কে জানাই যে আমি এমন তা সপ্নে দেখতেছি - কিন্তু দুইদিন ধরে আমার নিজের শরীর আবার খারাপ হয়ে যাচ্ছে - এর আগে গত মাসে ২০১৯ এ দেখা স্বপনের পরিবার এর একজন আমার কাছে কিছু খাবার নিয়ে আসে এবং বলে এতাতে দুয়া করে ফু দেয়া আমাকে খেতে বলে । এবং ২০২৩ এ তাদের একজন এসে আমাকে বলে আমার নাভি খুলে দেখতে কেউ যাদু করল কিনা। এবং আমরা দুই ভাইবোন যখন অনেক ছোট তখন আমাদের আত্মীয়দের সাথে আব্বুর টাকা পয়সা বা জমি নিয়ে কিছু এক্তা মনোমালিন্য হয় - আব্বু এম্নিতে অনেক বোকা (অনেকেই আব্বুকে অনেকসময় থকাইছে) কিন্তু আগে এক্তু রাগী ছিল - ত তারা আব্বুকে কিছু একটা বদ দুয়া করে। আর আমার কোন ভাল দেখলেই আত্মীয় কেউ আজ পর্যন্ত মানতে পারেনা আর এতা তাদের ছেলে মেয়ের কেন হয়না এমন বলে ফেলে, আবার খুব অদ্ভুত ভাবে তাকায় - অনেক সময় তাতে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। আমি আসলে কি করব, কোথায় যাব - কিছুই বুঝিনা - আমার উপর যেন তারা এক্তা নজরদারি চালু রেখেছে এমন্তা মনে হয়। এখন এমন বদ দুয়া, অভিশাপ, বদ নজর থেকে হওা ক্ষতি থেকে কিভাবে মুক্তি পাব। আল্লাহ র কাছে বলি যেন আল্লাহ যেন হারানো নিয়ামত গুলা সাথে ফিরায় দেন - কিন্তু ফিরায় দেয়ার পর গত বছর যা হল - কি করব কিভাবে নিজের নিয়ামত কে ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করব, না জানায় অ দেখেছি, পারা যায়না - খুব কাছের তাই একসময় জেনে যায় - জেনে যায় আর ক্ষতি হয়, এখন অনেক সময় ধৈর্য তেও আর কুলায় না। কিন্তু তারা বুঝাতে চায় আমি যেতা হারাইছি সেটা খারাপ (বা সেই মানুষগুলো খারাপ) কিন্তু তাদের আচরন তো স্বাভাবিক না , কেন তাদের কাছে অই মানুষগুলো মনে হল তারা কিছু জানে কিনা এমন ত তারা কখনো বলেনা (যে আমরা দেখেছি বা জেনেছি)- যারা আমার বিপদ হওার পর কান্নাকাটি করত - তাদের ত বিপদ কেটে যাওয়ার পর খুসি হওার কথা - কিন্তু শুনার পর মনে হছিলনা তারা খুসি, এবং আজ পর্যন্ত কখনই ঐ ব্যাপারে তারা কিছু জানতে চায়নি। এখন শুধু মনে হয়, আমি/ আমরা ই কি খুব খারাপ যে আমাদের কিছু ভাল হলে কেউ মেনে নিতে পারেনা আর ক্ষতি হয়, খারাপ না হলে ত আল্লাহ আমাদের ক্ষতি থেকে বা এই মানুশগুলর থেকে দূরে রাখতেন।
Answer
বদদুয়া, অভিশাপ ও বদনজর থেকে মুক্তির উপায়
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ কষ্টের বিবরণ পড়ে খুবই মর্মাহত হলাম। আপনার সমস্যাটি বুঝতে পেরেছি। আসলে এ ধরনের সমস্যা অনেক পরিবারেই হয়ে থাকে। আশা করি, আল্লাহর রহমতে এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করলে আপনি এই বিপদ থেকে মুক্তি পাবেন।
বদদুয়া, অভিশাপ ও বদনজরের বাস্তবতা
ইসলামে বদনজর (নজর-ই-বাদ) এবং বদদুয়ার প্রভাব স্বীকার করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নজর (বদনজর) সত্য, যদি কোনো জিনিস তাকদীরের আগে পৌঁছে যেত, তবে নজরই পৌঁছে যেত।" (সহীহ মুসলিম: ২১৮৮)
তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কোনো ক্ষতি করতে পারে না।" (সূরা আল-মুজাদালা: ১০)
মুক্তির উপায়সমূহ
১. তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর উপর ভরসা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। আল্লাহ বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
২. কুরআন ও সুন্নাহর আমলসমূহ
ক. সূরা ফালাক ও সূরা নাস: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে পড়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"হে ইবনে আব্বাস! আমি কি তোমাকে এমন কিছু শেখাব না যা তোমাকে সকল কষ্ট থেকে রক্ষা করবে? তুমি বলো: 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়াতা ওয়াল আফিয়াহ ফিদ্দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ' - হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষমা ও সুস্থতা প্রার্থনা করছি।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৭৪)
খ. আয়াতুল কুরসি: প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের পর এবং ঘুমানোর আগে পড়া।
গ. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: রাতে পড়লে সকাল পর্যন্ত সুরক্ষা থাকে।
ঘ. দরুদ শরীফ: বেশি বেশি দরুদ পড়া।
ঙ. ইস্তিগফার: বেশি বেশি ইস্তিগফার করা।
৩. রুকইয়াহ (দুয়া দ্বারা চিকিৎসা)
নিজের উপর রুকইয়াহ করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের উপর পড়তেন:
"বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা'ই ওয়া হুয়াস সামীউল আলীম" (আবু দাউদ: ৫০৮৮)
অর্থ: "আল্লাহর নামে শুরু করছি, যাঁর নামের সাথে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না পৃথিবীতে এবং আকাশে, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"
৪. বদনজর থেকে বাঁচার দুয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো কিছু দেখে ভয় পায়, সে যেন বলে: 'মা শাআল্লাহু লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' - আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই।" (তিরমিজি: ২০৬২)
৫. সাদকা করা
বিপদ থেকে বাঁচতে সাদকা করা খুবই কার্যকর। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সাদকা বিপদ দূর করে।" (তিরমিজি: ৬৬৪)
৬. ধৈর্য ও সালাত
আল্লাহ বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
আত্মীয়দের আচরণ সম্পর্কে
আপনার আত্মীয়দের আচরণ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। আল্লাহ বলেন:
"আর যারা কুফরি করে, তাদের কাজকর্ম তোমাকে যেন দুঃখ না দেয়।" (সূরা আলে ইমরান: ১৭৬)
তাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা না করে বরং তাদের জন্য দুয়া করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য গোপনে দুয়া করে, ফেরেশতা বলেন: 'আমিন, তোমার জন্যও একই হোক।'" (সহীহ মুসলিম: ২৭৩২)
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করুন। ২. সকাল-সন্ধ্যার যিকির গুলো নিয়মিত করুন। ৩. সূরা বাকারা নিয়মিত পড়ুন বা শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারা পড়া হয়।" (সহীহ মুসলিম: ৭৮০) ৪. অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করুন। ৫. আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন এবং হতাশ হবেন না। আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।" (সূরা আল-ইনশিরাহ: ৫-৬)
আপনার আব্বুর জন্য দুয়া
আপনার আব্বুর সুস্থতার জন্য নিয়মিত দুয়া করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহুম্মা রব্বান্নাসি, আযিহিল বা'সা, ইশফি আন্তাশ শাফী, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা" - "হে মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, আরোগ্য দিন, আপনিই আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দিন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখবে না।" (সহীহ বুখারি: ৫৭৪২)
উপসংহার
প্রিয় বোন, মনে রাখবেন:
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন - তিনিই একমাত্র ক্ষতি-উপকারের মালিক।
- নিয়মিত যিকির ও দুয়া চালিয়ে যান।
- আত্মীয়দের নিয়ে চিন্তা না করে নিজের ঈমান ও আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকুন।
- ধৈর্য ধরুন - আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
- সাদকা চালিয়ে যান।
- আলেম বা মুফতির কাছে গিয়ে রুকইয়াহ করান।
আল্লাহ বলেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহ আপনার সব কষ্ট দূর করুন, আপনার পরিবারকে হিফাজত করুন এবং আপনার আব্বুকে সুস্থতা দান করুন। আমিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।