প্রসব ব্যথা উঠলে নামাজ পড়ার বিধান
Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রসব ব্যথা শুরু হলে বা পানি ভেঙে গেলে বা হালকা রক্তপাত হলে—এ অবস্থায় নামাজ পড়া ওয়াজিব, যতক্ষণ না নারী সম্পূর্ণ অজ্ঞান বা অক্ষম হন। নিফাস (প্রসবোত্তর রক্ত) শুরু হয় সন্তান প্রসবের পর। তাই ব্যথা শুরু হওয়া বা পানি ভেঙে যাওয়াকে প্রসবের পূর্ববর্তী অবস্থা গণ্য করা হয়, এবং এ অবস্থায় নামাজ ছাড়ার কোনো সুযোগ নেই।
১. প্রসব ব্যথার সময় নামাজের বিধান
প্রসব ব্যথা তীব্র হলেও নারী যতক্ষণ জ্ঞান থাকবেন এবং কোনোভাবে নামাজ আদায় করতে সক্ষম হবেন, ততক্ষণ সময়মতো নামাজ পড়া ফরজ। ব্যথার কারণে নামাজ কাযা করা জায়েজ নয়।
প্রমাণ:
- রাসুলুল্লাহ (সা.) ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ)-কে বলেছেন:
«صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ»
“দাঁড়িয়ে নামাজ পড়। যদি না পারো, তবে বসে। যদি তা-ও না পারো, তবে (ডান) কাত হয়ে পড়।”
(বুখারি, হাদিস: ১১১৭; নাসায়ি, হাদিস: ১৬৬০)
প্রসব ব্যথায় নারী দাঁড়াতে না পারলে বসে, শুয়ে অথবা ইশারায় নামাজ পড়বেন। সময়ের শেষ দিকে নামাজ আদায় করা সম্ভব, কিন্তু পুরো সময় পার করে দেওয়া জায়েজ নয়।
শাইখ ইবনু বায (রহ.) বলেন:
“প্রসব ব্যথায় আক্রান্ত নারী নামাজ পড়বেন যেমনভাবে সম্ভব—দাঁড়িয়ে, বসে, কাত হয়ে বা ইশারায়। ব্যথার কারণে নামাজ ত্যাগ করা বা কাযা করা জায়েজ নয়, যতক্ষণ তার জ্ঞান থাকবে এবং কোনোভাবে নামাজ আদায় করতে পারবেন।”
(মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু বায, ১০/২৭৩)
শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“প্রসব ব্যথা কোনো ওজর নয় যে কারণে নামাজ ছেড়ে দেওয়া যাবে। বরং সে যেভাবে পারে নামাজ পড়বে। যদি তায়াম্মুম করা সম্ভব হয় এবং অজু করা কষ্টকর হয়, তবে তায়াম্মুম করবে।”
(লিকা অব বাব আল-মাফতুহ, ১/২৩৪)
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:
“যদি প্রসব ব্যথা শুরু হয় কিন্তু সন্তান ভূমিষ্ঠ না হয়, তবে সে নিফাস অবস্থায় নয়। তাই নামাজ ও রোজা তার ওপর ফরজ। ব্যথার কারণে নামাজ কাযা করা জায়েজ নয়। কেবলমাত্র যদি সে সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে যায় বা এমন অবস্থায় পৌঁছে যে কোনোভাবেই নামাজ আদায় করতে পারে না, তখন নামাজ তার থেকে পড়ে যাবে না, বরং পরে কাযা করবে।”
(আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান, ৩/২৫৬)
২. পানি ভেঙে গেলে বা হালকা রক্তপাত হলে নামাজের হুকুম
ক. পানি ভেঙে যাওয়া (অ্যামনিওটিক ফ্লুইড) :
এটি নিফাস বা হায়জ নয়, বরং একটি পবিত্র তরল। তবে নাপাক (নাজিস) হওয়ার কারণে তা শরীর ও কাপড় থেকে ধুয়ে ফেলতে হবে। নামাজ পড়ার জন্য অজু করতে হবে এবং সময়মতো নামাজ আদায় করতে হবে। যদি পানি ক্রমাগত আসতে থাকে তবে তা ইস্তিহাজার মতো গণ্য হবে এবং প্রত্যেক নামাজের জন্য নতুন অজু করতে হবে।
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ইস্তিহাজার বিধান প্রযোজ্য: প্রত্যেক ফরজ নামাজের জন্য অজু এবং রক্তের স্থান ধুয়ে ফেলা।
শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“প্রসবের পূর্ববর্তী রক্ত, যদি তা প্রসবের পূর্বে এবং সন্তান ভূমিষ্ঠের আগে দেখা দেয়, তবে তা হায়জ নয়, বরং ইস্তিহাজা, যদি না তা হায়জের অভ্যাসের সাথে মিলে যায়। তাই নারী তার নামাজ ও রোজা চালিয়ে যাবে।”
(ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ-দারব, ৪/২৪)
শাইখ ইবনু বায (রহ.) আরও বলেন:
“যে নারীর প্রসব ব্যথা শুরু হয়েছে কিন্তু সন্তান প্রসব হয়নি, তিনি নিফাস অবস্থায় নন। তাই তাঁর নামাজ পড়তে হবে এবং রোজা রাখতে হবে (যদি রমজান হয়)। পানির সাথে বা হালকা রক্তপাতের সাথে নামাজ ত্যাগ করা জায়েজ নয়।”
(মাজমু‘ ফাতাওয়া, ১০/২৭৮)
৩. দীর্ঘ সময় (১২-৭২ ঘণ্টা) ব্যথা থাকলে করণীয়
এত দীর্ঘ সময় ব্যথা থাকার অর্থ এই নয় যে নামাজ ছেড়ে দেওয়া যাবে। একজন নারী নিম্নোক্তভাবে নামাজ আদায় করবেন:
- দাঁড়িয়ে সম্ভব হলে।
- বসে (চেয়ারে বা মাটিতে) সম্ভব না হলে।
- কাত হয়ে বা ইশারায় পড়বেন।
- অজু করতে না পারলে তায়াম্মুম করবেন।
- যদি রক্ত বা পানি ক্রমাগত আসে, তবে প্রত্যেক ফরজ নামাজের জন্য নতুন অজু করবেন (ইস্তিহাজার হুকুমে)।
- ব্যথা এত বেশি হলে যে নামাজের যে কোনো রুকন (যেমন সিজদা, রুকু) আদায় করতে অক্ষম, তবে ইশারা দিয়ে নামাজ পড়বেন।
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি কোনো অজুহাতে নামাজ ছেড়ে দেয়, সে কুফরি করে (সাবধানবাণী)। ব্যথা বা অসুস্থতা নামাজ ছেড়ে দেওয়ার বৈধ কারণ নয়; বরং তা যেভাবে সম্ভব আদায় করতে হবে।”
(সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর, ২৭৬ নং লেকচার)
একমাত্র ব্যতিক্রম:
যদি নারী সম্পূর্ণ অজ্ঞান হন বা এত কষ্ট পান যে কোনো অবস্থায় নামাজ পড়তে সক্ষম নন (যেমন: প্রসবের শেষ পর্যায়ে চরম কষ্ট), তাহলে ওই নামাজ পরে কাযা করবেন। তবে সাধারণ প্রসব ব্যথা (যা কয়েক ঘণ্টা বা ২-৩ দিন থাকে) তাকে নামাজ ত্যাগের অনুমতি দেয় না।
সারসংক্ষেপ
১. প্রসব ব্যথা শুরু হওয়া, পানি ভেঙে যাওয়া বা হালকা রক্তপাত—এগুলো নিফাস শুরুর কারণ নয়।
২. যতক্ষণ সন্তান ভূমিষ্ঠ না হয়, নারীর ওপর নামাজ ফরজ।
৩. নামাজ হয় দাঁড়িয়ে, সম্ভব না হলে বসে, না পারলে শুয়ে বা ইশারায় আদায় করতে হবে।
৪. ব্যথার কারণে নামাজ কাযা করার অনুমতি নেই (তবে অজ্ঞান বা সম্পূর্ণ অক্ষম হলে ভিন্ন কথা)।
৫. হালকা রক্তপাত ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে, প্রত্যেক ফরজের জন্য অজু করে ও পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ আদায় করতে হবে।
প্রাসঙ্গিক ফতোয়ার উৎস:
- শাইখ ইবনু বায: মাজমু‘ ফাতাওয়া (১০/২৭৩-২৭৮)
- শাইখ ইবনু উসাইমীন: লিকা অব বাব আল-মাফতুহ (১/২৩৪), ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ-দারব
- শাইখ সালেহ আল-ফাওযান: আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া (৩/২৫৬)
- শাইখ আল-আলবানী: সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর
আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তাওফিক দাতা।