বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রাইস কুকার নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে কি?
Food and Drink · Hanafi
Question
আমি একজন ছাত্রী এবং একটি সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে (হলে) থাকতে চাই। হলের নিয়ম অনুযায়ী রাইস কুকার বা এ ধরনের রান্নার বৈদ্যুতিক যন্ত্র রাখা নিষেধ। তবে বাস্তবে অনেক ছাত্রী রাইস কুকার রাখেন ও ব্যবহার করেন এবং বিষয়টি অনেকটা “ওপেন সিক্রেট” হিসেবে চলে।
আমার কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে খাবারের ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে আমার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয় এবং সকালে সাধারণত ভাত খেলে আমার জন্য সুবিধা হয়। কিন্তু হলে সকালে ভাত দেওয়া হয় না; সাধারণত খিচুড়ি, পরোটা ইত্যাদি খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া তেলযুক্ত খাবারও আমার জন্য সবসময় সহনীয় হয় না। তাই নিজের জন্য অল্প পরিমাণ ভাত বা সহজ খাবার রান্না করতে পারলে আমার অনেক সুবিধা হবে।
অন্যদিকে, হলের বাইরে একা থাকার ক্ষেত্রে আমার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থিত হলে থাকা আমার জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক মনে হয়।
এ অবস্থায় আমার প্রশ্ন হলো:
১. হল কর্তৃপক্ষের নিয়মে রাইস কুকার রাখা নিষেধ থাকা সত্ত্বেও, নিজের খাবারের প্রয়োজন ও শারীরিক সমস্যার কারণে গোপনে রাইস কুকার রেখে ব্যবহার করা কি হারাম হবে?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি মূলনীতি স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন। ইসলামী দৃষ্টিকোণে, কোনো বৈধ (হালাল) বস্তু ব্যবহার করা নিজে হারাম নয়; হারাম হয় তখনই যখন তা কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে হারাম হয়। রাইস কুকার একটি বৈধ বৈদ্যুতিক যন্ত্র। এটি ব্যবহার করা নিজে হারাম নয়। তবে প্রশ্ন হলো, হল কর্তৃপক্ষের নিয়ম ভঙ্গ করে তা ব্যবহার করা কি গুনাহের কাজ হবে?
১. হল কর্তৃপক্ষের নিয়ম ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলামে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বা চুক্তি মেনে চলা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ১)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪; সুনানে তিরমিজি: ১৩৫২)।
যখন আপনি হলে থাকার জন্য আবেদন করেন, তখন হলের নিয়মাবলী মেনে চলার একটি চুক্তি বা অঙ্গীকার আপনার পক্ষ থেকে হয়ে যায়। তাই হল কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গোপনে রাইস কুকার ব্যবহার করা চুক্তি ভঙ্গের শামিল এবং এটি নৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুনাহের কাজ হবে। এটি হারাম তো বটেই, সাথে সাথে এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতাও বটে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)।
২. শারীরিক প্রয়োজনের যুক্তি: আপনার শারীরিক সমস্যা এবং খাদ্যাভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনি হলের নিয়ম ভঙ্গ করে গোপনে কাজটি করবেন। ইসলামে প্রয়োজনের সময় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নিয়ম ভঙ্গের নয়। আপনি চাইলে:
- হল কর্তৃপক্ষের কাছে আপনার শারীরিক সমস্যার কথা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমতি চাইতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকের সার্টিফিকেট দেখলে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকেন।
- অথবা, হলে সকালে ভাত না থাকলে আপনি বিকল্প খাবার (যেমন: ওটস, দুধ-ভাত, বা অন্যান্য সহজপাচ্য খাবার) ব্যবস্থা করতে পারেন।
- অথবা, হলে থাকার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি নিরাপদ আবাসিক হোস্টেল বা মহিলা ডরমিটরিতে থাকার ব্যবস্থা করতে পারেন, যেখানে রান্নার সুবিধা থাকবে।
৩. গোপনে ব্যবহারের বিধান: গোপনে ব্যবহার করা সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ:
- এটি কর্তৃপক্ষের সাথে প্রতারণা।
- এটি অন্যান্য ছাত্রীদের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
- এটি আপনার জন্য মানসিক চাপ ও অপরাধবোধ তৈরি করবে।
ফতোয়া ও আলেমদের মতামত: হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে, কোনো বৈধ জিনিস ব্যবহার করা জায়েয, তবে যদি তা কোনো বৈধ চুক্তি বা নিয়মের পরিপন্থী হয়, তবে তা ব্যবহার করা জায়েয নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৯:৫৫০; ফতোয়া হিন্দিয়া, ২:৩১৬)। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "চুক্তি বা শর্ত ভঙ্গ করা হারাম, যদি শর্তটি বৈধ হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪:৩৩৭)।
সারসংক্ষেপ উত্তর:
- রাইস কুকার ব্যবহার করা নিজে হারাম নয়, তবে হলের নিয়ম ভঙ্গ করে গোপনে ব্যবহার করা হারাম ও গুনাহের কাজ হবে।
- আপনার শারীরিক প্রয়োজনের কথা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- অনুমতি না পেলে বিকল্প খাদ্যাভ্যাস বা নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করুন।
- গোপনে নিয়ম ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকুন; এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিক থেকেই ক্ষতির কারণ।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিন এবং আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।