জীবন হুমকি এবং মিথ্যা সাক্ষ্য
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমাকে বিয়ের চার মাসের মাথায় মিথ্যা অপবাদ এবং মোহরানা আদায় না করে তালাক নামা পাঠায় আমার প্রাক্তন স্বামী।সে পরিবারে থাকাকালীন মানসিক অত্যাচার ও যৌতুকের জন্য চাপ পেয়ে এসেছি। আমি সহ্য করে ছিলাম এতদিন।কিন্তু আমার সাথে এহেন আচরণ করায় আমার সাথে করা সকল জুলুম আমার পরিবারকে জানাই।এই ক্ষোভে আমার মা বাবা তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।মোহরানা আদায় না করা,আমার সাথে জুলুম করা,মিথ্যা অপবাদ, যৌতুকের চাপ এসব বিষয়ে। কিন্তু মামলা জোরালো করার জন্য কিছু মিথ্যা কথা লেখা হয় থানায়।যার মাঝে;শারীরিক নির্যাতন,আমার স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ (যা আংশিক সত্য, আমার মোহরানার সামান্য অংশ বাবদ একটা আংটি দেয়া হয়, যেটা আমার প্রাক্তন শাশুড়ি নিয়ে আর ফেরত দেয়নি)।তারা নতুন বৌ(চার মাসের মধ্যে মাত্র একমাস ছিলাম সব মিলিয়ে)হিসাবে অনেক কাজের তাগাদা দিত আকার ইঙ্গিতে।যেগুলো নতুন পরিবেশে গিয়ে করতে গিয়ে আমার শরীরের উপর অত্যাচার করা হতো।এটা এক প্রকার নির্যাতন ছিল।প্রতিনিয়ত যৌতুকের কথা বলা হতো তার পরিবার থেকে।আমি অত্যন্ত ভেঙে পড়েছি এ অবস্থায়। পরিবারের সদস্যরা সেখানে বিয়ে দিতে চায়নি শুরুতে।কিন্তু দ্বীনদারিতা দেখে কুফু না মিলিয়ে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু তারা লেবাসধারী ছিল। এমতাবস্থায় আমার পরিবারও আমার উপর নারাজ।তবে তাদের আশ্রয়ে আমি আছি। তাদের সব আদেশ না মেনে চললে আরো মানসিক ভাবে মাজলুম হয়ে পড়ছি। মৃত্যু চিন্তা এসে পড়ছে।আমার পরিবারের করা মামলায় যেখানে সত্যের সাথে মিথ্যা মিশিয়ে লেখা হয়েছে তাতে আমার সাক্ষ্য দিতে হতে পারে।কিন্তু আমি আল্লাহর ভয়ে কখনো চাইনা মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে। থেকে থেকে প্রচন্ড ভেঙে পড়ছি। আমার পরিবারও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আমাকেও নানান কথা দিয়ে জুলুম করছেন। তাদের কথা যদি মেনে না নেই তাহলে আমার পারিবারিক সুরক্ষা এবং জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছি।
এমতাবস্থায় তাদের করা মামলায় আমি সাক্ষ্য দিতে ইচ্ছে না থাকলেও বাধ্য হচ্ছি।হিকমত অবলম্বন করতে চাইছিলাম যা সত্য তা বলে। কিন্তু তারা চায় মামলার কাগজে যা লেখা আছে তাতে সম্পুর্ণ মতামত দেই। এমতাবস্থায় আমি কি করতে পারি?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারিণীর নাম: Binte Abdur Rahman
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এবং সহানুভূতির দাবিদার। ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এমনকি মৃত্যুর ভয় বা পারিবারিক চাপেও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া জায়েয নয়। তবে আপনি হিকমতের সাথে সত্য কথা বলতে পারেন এবং মামলার কাগজে যা লেখা আছে তার সাথে সম্পূর্ণ একমত না হয়ে শুধুমাত্র সত্য অংশের সাক্ষ্য দিতে পারেন।
বিস্তারিত উত্তর
১. মিথ্যা সাক্ষ্যের শাস্তি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ قُلْنَا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَكَانَ مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَقَالَ: أَلَا وَقَوْلُ الزُّورِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ
"আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না? আমরা বললাম: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা। তিনি তখন হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন: সাবধান! মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।" (সহীহ বুখারী: ২৬৫৪, সহীহ মুসলিম: ৮৭)
২. মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে বিরত থাকা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার বা আত্মীয়-স্বজনের ক্ষতির কারণ হয়।" (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
৩. জীবন হুমকির মুখে মিথ্যা বলার বিধান
জীবন হুমকির মুখে প্রাণ বাঁচানোর জন্য মৌখিকভাবে মিথ্যা বলা জায়েয হতে পারে (তাকিয়্যার নিয়মে), কিন্তু আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া জায়েয নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জীবন রক্ষার জন্য মৌখিকভাবে কিছু বলা যেতে পারে, কিন্তু সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সত্য বলতেই হবে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"জীবন রক্ষার জন্য মিথ্যা বলা জায়েয, কিন্তু আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া জায়েয নয়, কারণ সাক্ষ্য অন্য মানুষের হক নষ্ট করে।"
৪. আপনার করণীয়
১. আপনি মামলার কাগজে যা লেখা আছে তার সাথে সম্পূর্ণ একমত হয়ে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য নন। আপনি শুধুমাত্র সত্য অংশের সাক্ষ্য দিতে পারেন।
২. আপনি যা জানেন না বা যা ঘটেনি, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ইসলামি আইনে সাক্ষীকে শুধুমাত্র যা দেখেছে বা জানে তা বলতে হয়।
৩. আপনি আদালতে স্পষ্টভাবে বলতে পারেন যে, "আমি শুধুমাত্র আমার জানা সত্য ঘটনা বলব, যা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি বা অভিজ্ঞতা করেছি।"
৪. মামলার কাগজে যা লেখা আছে তার সবকিছু যদি সত্য না হয়, তাহলে আপনি সেই অংশের সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।
৫. আপনার পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং এর শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। আপনি সত্য বলেই তাদের সাহায্য করতে পারেন।
৫. পারিবারিক চাপ ও হুমকি মোকাবিলা
- আপনি যদি জীবন হুমকির সম্মুখীন হন, তাহলে স্থানীয় উলামা বা ইসলামি স্কলারের সাথে পরামর্শ করুন।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
- মৃত্যু চিন্তা থেকে বিরত থাকুন। এটি শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
"তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
৬. মোহরানা ও স্বর্ণালংকারের বিষয়ে
- আপনার মোহরানা আদায় না করা এবং আংটি ফেরত না দেওয়া আপনার প্রাক্তন স্বামী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বৈধ দাবি। এই অংশের সাক্ষ্য দেওয়া জায়েয এবং উচিত।
- যৌতুকের চাপ ও মানসিক নির্যাতনের বিষয়েও আপনি সত্য সাক্ষ্য দিতে পারেন, যা আপনি নিজে অনুভব করেছেন।
৭. উপসংহার
আপনার কর্তব্য হলো:
- শুধুমাত্র সত্য সাক্ষ্য দেওয়া - যা আপনি নিজে দেখেছেন বা অনুভব করেছেন।
- মামলার কাগজে লেখা মিথ্যা অংশের সাক্ষ্য না দেওয়া।
- আদালতে স্পষ্টভাবে বলা যে আপনি শুধুমাত্র আপনার জানা সত্য ঘটনা বলবেন।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দান করুন এবং আপনার অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বের করে দিন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সহীহ বুখারী: ২৬৫৪
- সহীহ মুসলিম: ৮৭
- সূরা আন-নিসা: ১৩৫
- সূরা আত-তালাক: ২
- সূরা আন-নিসা: ২৯
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)