স্ত্রী কি স্বামীকে না জানিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবে?
Family Life · Hanafi
Question
এক সন্তান হওয়ার পর পরবর্তী সন্তান নেওয়ার মাঝে গ্যাপ রাখার জন্য ২-৩ বছরের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করা কি জায়েজ হবে? মা প্রেগনেন্সির সময় প্রচুর অসুস্থ ছিল তাই পরবর্তী সন্তান আরো দেরিতে নিলে ভালো হয়। তার স্বামী আলেম হওয়ায় জন্মনিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে। এক্ষেত্রে স্ত্রী কি স্বামীকে না জানিয়ে এই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে বলব, ইসলামে সন্তান লাভ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও আল্লাহর নেয়ামত। তবে কিছু বৈধ কারণে (যেমন: মায়ের শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা, বা সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালনের সক্ষমতা না থাকা) অস্থায়ীভাবে (২-৩ বছরের জন্য) জন্মনিয়ন্ত্রণ করা জায়েজ আছে, তবে শর্ত হলো এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (permanent sterilization) না হয় এবং সম্পূর্ণ হারাম পদ্ধতি (যেমন: গর্ভপাত) গ্রহণ না করা হয়।
হানাফী ফিকহের উসূল ও মাসায়েল:
১. জন্মনিয়ন্ত্রণের বৈধতা: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তার অনুসারী ফুকাহায়ে কেরামের মতে, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (যেমন: 'আজল' বা কন্ডোম, পিল ইত্যাদি ব্যবহার করা) জায়েজ, যদি কোনো বৈধ অপকার না থাকে। বিশেষ করে যদি মা গর্ভধারণের কারণে অসুস্থ হয় বা তার জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে এটি শুধু জায়েজ নয়, বরং প্রয়োজনীয় (দরূরি) হতে পারে। কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫)।
২. স্বামীর অনুমতি: যেহেতু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করলে স্বামীর সন্তান লাভের অধিকার আংশিকভাবে ক্ষুণ্ন হয়, তাই স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ব্যতীত জন্মনিয়ন্ত্রণ করা জায়েজ নয়। হাদীসে এসেছে, নবী (সা.) বলেছেন: "স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া (গর্ভনিরোধের জন্য) 'আজল' করবে না।" (বুখারী, মুসলিম)। ইবনে আবেদীন (রহ.) 'রদ্দুল মুহতার'-এ উল্লেখ করেছেন, স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হারাম, কারণ এটি স্বামীর হক (সন্তান লাভের অধিকার) নষ্ট করে।
৩. স্বামী আলেম হওয়ার প্রেক্ষাপট: আপনার স্বামী আলেম হওয়ায় তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে। এ ক্ষেত্রে তার মতামতের কারণ খোঁজা উচিত। যদি তার আপত্তি শুধু সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হয় (যেমন: বেশি সন্তান নেওয়া সুন্নত মনে করা), তাহলে আপনি তাকে মায়ের শারীরিক অবস্থা ও প্রেগনেন্সির সময়ের কষ্টের কথা বুঝিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ ও ইসলামী দলীল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন। তবে যদি তার আপত্তি দলীলভিত্তিক হয় এবং তিনি একান্তই নাও মানেন, তাহলে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ করা জায়েজ হবে না। কেননা স্বামীর আনুগত্য ফরজ, যতক্ষণ তা হারাম কাজে না হয়। আর এখানে স্বামী হারাম বলছেন না, বরং মাকরূহ বা অপছন্দ করছেন।
উপসংহার ও পরামর্শ:
- শারীরিক কারণে ২-৩ বছরের ব্যবধানের জন্য অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ (যেমন: পিল, কন্ডোম, ইনজেকশন ইত্যাদি) গ্রহণ করা জায়েজ, তবে শর্ত হলো এটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এবং কোনো স্থায়ী ক্ষতি না করে।
- স্বামীকে না জানিয়ে স্ত্রীর জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করা জায়েজ নয়। আপনাকে অবশ্যই স্বামীর সাথে আলোচনা করতে হবে। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনার অসুস্থতা ও পরবর্তী গর্ভধারণের ঝুঁকির কারণে অস্থায়ী ব্যবধান রাখা জরুরি। আপনি চাইলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা ইসলামী স্কলারের মাধ্যমে তাকে বোঝাতে পারেন।
- যদি স্বামী একান্তই রাজি না হন, তাহলে আপনি সালিশ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার ও আপনার পরিবারের কল্যাণ দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- বাহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া)