ফলোয়ার বিক্রি ও মনিটাইজেশন থেকে আয় করা ইসলামী দৃষ্টিকোণে হারাম কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
শুরুতেই বলি আমার পিতার ইনকাম হারাম। আমিও অবিবাহিতা মেয়ে। রুম থেকে প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে খুব কমই বের হওয়া হয়।
তাই আমি চাচ্ছিলাম ঘরে বসেই কিছু টাকা ইনকাম করার জন্য। যেন আমার ব্যাসিক জিনিসগুলো নিজে কিনতে পারি। পড়াশোনার সুবাদে আমাকে মেসে থাকতে হয়। এজন্য নিজে রান্না করে খাই।
তাই ভাবতেছিলাম যতটুকু সম্ভব খাবারটা যেন হালাল খেতে পারি।
এজন্যই কিছু টাকা ইনকাম করতে চাচ্ছিলাম। অফলাইন সেটা সম্ভব নয়, টিউশনি করাতে পারবো না, অন্যের বাড়িতে যেতে হবে যেটা আমার পুরোপুরি পর্দা মেইনটেইন করে করা সম্ভব নয়, সেলাইয়ের কাজও তেমন জানি না।
মূলকথায় আসি এবার, আমার বান্ধবীর কাছে শুনেছি সে নাকি অনলাইনে একটা কাজ করে। তার ভাষ্যমতে কাজটা এমন যে, একটা পেইজে দু'জন মেয়ে থাকে যারা ফলোয়ার বিক্রি করে। সে বললো বেশি কাজ করতে হয় না। এতেই মাসে ৫০০০ হাজার টাকা বেতন পায়। কিন্তু সমস্যা হলো সেখানে কাজের কারণে ছেলেদের সাথেও মেসেজে কথা বলতে হয়। ছেলেরাও ফলোয়ার কেনার জন্য মেসেজ দেয়। তাই তাদের সাথেও মেসেজ আদান প্রদান করতে হয়।
আর আমার হঠাৎ মনে হলো, যারা ফলোয়ার কিনতে আসে তারা তো মূলত মনিটাইজেশন পায়। আর যার ফলোয়ার যত ইনকামও তত মেইবি। আমি সঠিক জানি না এসব সম্পর্কে। তবে শুনেছি মনিটাইজেশন নাকি হারাম।
এক্ষেত্রে আমি কি এই কাজটা করতে পারবো? এটা কি হারাম হবে? আমার উপার্জনটাও কি হারাম হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আপনি একজন অবিবাহিতা মেয়ে, যার পিতার ইনকাম হারাম, এবং আপনি নিজে হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে চান। এটি একটি প্রশংসনীয় ইচ্ছা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
মূল উত্তর
আপনি যে কাজটি করার কথা ভাবছেন—ফলোয়ার বিক্রি করা এবং মনিটাইজেশন থেকে আয় করা—তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম। এই কাজটি করার মাধ্যমে আপনার উপার্জনও হারাম হবে।
কারণসমূহ
১. মনিটাইজেশন ও ফলোয়ার বিক্রির বিধান
ফলোয়ার বিক্রি এবং মনিটাইজেশন থেকে আয় করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ নয়। কারণ:
-
প্রতারণা ও মিথ্যা: ফলোয়ার বিক্রি মূলত একটি প্রতারণামূলক ব্যবসা। ক্রেতারা মনে করে তারা প্রকৃত ফলোয়ার পাচ্ছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা কৃত্রিম বা বট ফলোয়ার পাচ্ছে। এটি ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের নয়।" (সহীহ মুসলিম)
-
মনিটাইজেশন: মনিটাইজেশন পেতে হলে পেজ বা চ্যানেলে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফলোয়ার ও ভিউ প্রয়োজন হয়। যখন কৃত্রিম উপায়ে ফলোয়ার বাড়িয়ে মনিটাইজেশন অর্জন করা হয়, তখন তা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ। ইসলামে প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হারাম।
২. ছেলেদের সাথে মেসেজ আদান-প্রদান
আপনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে এই কাজে ছেলেদের সাথে মেসেজে কথা বলতে হয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণে:
- অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, বিশেষত কাজের প্রয়োজনের বাইরে, পুরুষ ও মহিলার মধ্যে আদান-প্রদান শরীয়তসম্মত নয়।
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা এমনভাবে কথা বলো না যাতে অন্তরে রোগ আছে এমন ব্যক্তিরা কুমন্ত্রণা পায়।" (সূরা আল-আহযাব: ৩২)
- যদিও কাজের প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে কথা বলা জায়েয হতে পারে, তবে এই কাজে ছেলেদের সাথে মেসেজ আদান-প্রদান মূলত ব্যবসায়িক প্রয়োজনে হলেও, এতে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. পর্দার বিধান
আপনি নিজেই বলেছেন যে আপনি পর্দা মেইনটেইন করতে চান। এই কাজটি করার মাধ্যমে আপনাকে ছেলেদের সাথে মেসেজে কথা বলতে হবে, যা পর্দার পরিপন্থী। ইসলামে পর্দা শুধু শারীরিক পর্দাই নয়, বরং কথাবার্তা ও আচরণেও পর্দা বজায় রাখা জরুরি।
আপনার জন্য বিকল্প উপায়
আপনি ঘরে বসে হালাল উপার্জনের জন্য নিম্নলিখিত কাজগুলো বিবেচনা করতে পারেন:
১. অনলাইন কনটেন্ট রাইটিং
আপনি যদি বাংলা বা ইংরেজিতে ভালো লিখতে পারেন, তাহলে অনলাইনে কনটেন্ট রাইটিং বা ফ্রিল্যান্সিং করতে পারেন। এটি একটি সম্মানজনক ও হালাল পেশা।
২. গ্রাফিক ডিজাইন
যদি আপনি কম্পিউটারে আগ্রহী হন, তাহলে গ্রাফিক ডিজাইন শিখতে পারেন। অনলাইনে অনেক ফ্রি টিউটোরিয়াল আছে। এটি ঘরে বসেই করা যায়।
৩. ডেটা এন্ট্রি
অনেক কোম্পানি ঘরে বসে ডেটা এন্ট্রির কাজ দেয়। এটি তুলনামূলকভাবে সহজ এবং পর্দা বজায় রাখা সম্ভব।
৪. অনলাইন টিউশনি
আপনি অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে পারেন। এটি ঘরে বসেই করা সম্ভব এবং পর্দা বজায় রাখা যায়। তবে খেয়াল রাখবেন, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সীমিত ও প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলবেন।
৫. হস্তশিল্প ও কারুশিল্প
যদি আপনি সেলাই না জানেন, তাহলে অন্যান্য হস্তশিল্প যেমন: গয়না তৈরি, পেইন্টিং, ক্যান্ডেল তৈরি ইত্যাদি শিখতে পারেন। এগুলো ঘরে বসে তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. আপনার পিতার ইনকাম হারাম হওয়ার কারণে আপনি নিজে হালাল উপার্জন করতে চান—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
২. তবে হারাম উপার্জন থেকে বাঁচতে গিয়ে অন্য হারাম উপার্জনে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
৩. আপনি যদি সত্যিই হালাল উপার্জন করতে চান, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ অবশ্যই হালাল উপার্জনের পথ খুলে দেবেন।
দলিলসমূহ
কুরআন থেকে:
- "আর তোমরা পরস্পরকে প্রতারণা করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
- "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
- "আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
হাদিস থেকে:
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের মধ্যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১)
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট।" (সহীহ বুখারী: ৫২, সহীহ মুসলিম: ১৫৯৯)
ফিকহের কিতাব থেকে:
- আল-হিদায়া (১/২৮৬): "প্রতারণা ও মিথ্যার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করা হারাম।"
- রদ্দুল মুহতার (৫/২৬৮): "যে ব্যবসায় প্রতারণা আছে, তা জায়েয নয়।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৩৮৫): "কৃত্রিম ফলোয়ার ও লাইক বিক্রি করা হারাম, কারণ এটি প্রতারণা।"
উপসংহার
আপনি যে কাজটি করার কথা ভাবছেন—ফলোয়ার বিক্রি ও মনিটাইজেশন থেকে আয়—তা হারাম। এই কাজটি করা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ অবশ্যই আপনার জন্য হালাল রিজিকের পথ খুলে দেবেন।
والله أعلم بالصواب