জন্মদাগ লেজার করে তোলা কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
উস্তাদ জন্মদাগের জন্য মুখে লেজার করিয়ে দাগ তুলে ফেললে কি গুনাহ হবে? এখানে নিয়ত স্বামীর কাছে যেন সুন্দর দেখায়,নিজে আত্নবিশ্বাসী হয়ে সুন্দরভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে পারি
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। জন্মদাগ (birthmark) তুলে ফেলার জন্য লেজার করানো জায়েয আছে কি না, তা নিয়ে ইসলামি বিধান জানানো হলো:
মূলনীতি: ইসলামি শরিয়তে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ যা প্রকৃত সৃষ্টিকে বিকৃত করে বা ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হয়। তবে চিকিৎসার প্রয়োজন অথবা এমন দাগ যা দেখতে অসুন্দর এবং মানসিক কষ্টের কারণ হয়, তা দূর করার জন্য চিকিৎসা করানো জায়েয আছে।
হানাফি ফিকহের আলোকে বিধান:
১. জন্মদাগ (birthmark) দূর করা: জন্মদাগ সাধারণত ত্বকের একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। যদি এটি এমন জায়গায় থাকে যা দেখতে খুবই অসুন্দর এবং এর কারণে ব্যক্তি মানসিকভাবে কষ্ট পায় বা বিবাহের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়, তাহলে তা দূর করার জন্য চিকিৎসা করানো জায়েয আছে। এটি "তাদাবীর" (চিকিৎসা) এর অন্তর্ভুক্ত, নিষিদ্ধ "তাগয়্যুরে খিলকাতিল্লাহ" (আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি) নয়।
২. নিয়তের গুরুত্ব: আপনার নিয়ত যদি হয় স্বামীর কাছে সুন্দর দেখানো এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া, তাহলে এটি বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।" (সহিহ মুসলিম: ৯১)
৩. নিষিদ্ধ কাজ থেকে পার্থক্য: শরিয়তে নিম্নলিখিত কাজগুলো নিষিদ্ধ:
- উল্কি (ট্যাটু) আঁকানো
- দাঁতের মাঝে ফাঁক করা (সৌন্দর্যের জন্য)
- ভ্রু বা চোখের পাপড়ির চুল উপড়ে ফেলা (সৌন্দর্যের জন্য)
- শরীরের কোনো অংশে স্থায়ী পরিবর্তন আনা যা ধোঁকা দেওয়ার শামিল
কিন্তু জন্মদাগ দূর করা এসব নিষিদ্ধ কাজের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটি একটি চিকিৎসা।
হানাফি কিতাবের দলিল:
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এতে বলা হয়েছে, "যদি কোনো দাগ বা তিল থাকে যা দেখতে অসুন্দর এবং তা দূর করা সম্ভব হয়, তবে তা দূর করা জায়েয, কারণ এটি চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত।" (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড, ৪১৫ পৃষ্ঠা)
২. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): এতে বলা হয়েছে, "শরীরের কোনো দাগ বা তিল যদি অসুন্দর হয় এবং তা দূর করা সম্ভব হয়, তবে তা দূর করাতে কোনো সমস্যা নেই।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫ম খণ্ড, ৩৫৮ পৃষ্ঠা)
৩. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): তিনি বলেছেন, "জন্মগত দাগ বা তিল যদি দেখতে অসুন্দর হয় এবং তা দূর করা সম্ভব হয়, তবে তা দূর করা জায়েয। তবে যদি এটি কোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হয় এবং দূর করার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে না করাই উত্তম।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন: "যে দাগ বা তিল মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করে এবং মানসিক কষ্টের কারণ হয়, তা দূর করার জন্য চিকিৎসা করানো জায়েয।"
বিশেষ নোট:
- লেজার করানোর সময় নিশ্চিত থাকুন যে এটি কোনো মাহরাম (গায়রে মাহরাম) পুরুষ ডাক্তারের সামনে না হয়। সম্ভব হলে মহিলা ডাক্তারের কাছে করান।
- লেজার করানোর পর কোনো স্থায়ী ক্ষতি বা বিকৃতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- আপনার নিয়ত যদি শুধু সৌন্দর্যবর্ধন হয় এবং দাগটি তেমন অসুন্দর না হয়, তাহলে না করাই উত্তম। কিন্তু যদি দাগটি সত্যিই অসুন্দর হয় এবং আপনার মানসিক কষ্টের কারণ হয়, তাহলে করানো জায়েয।
সারকথা: আপনার উস্তাদের মুখের জন্মদাগ যদি সত্যিই অসুন্দর হয় এবং এর কারণে তিনি মানসিক কষ্ট পান, তাহলে লেজার করে দাগ তোলা জায়েয এবং গুনাহের বিষয় নয়। তবে নিয়ত যেন শুধু সৌন্দর্যবর্ধন না হয়, বরং চিকিৎসা ও মানসিক প্রশান্তির উদ্দেশ্য থাকে।
والله أعلم بالصواب