পথশিশু, এতিম, বিধবা নারী, প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ করা প্রসঙ্গে

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 356
Questioner: Najifa Meem
Question Asked: 19 May 2026, 01:37 PM
Reviewed & Published: 19 May 2026, 01:54 PM
Views: 28
Tokens: 2,999
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই মুসলিমরা নিরাপদ নয় । আমি একজন নারী । বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নিতে চলেছি যাতে মানুষের উপর নির্যাতনের মাত্রা কমে । বা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শক্তিশালী হয়ে জিহাদের প্রস্তুতি নিতে পারে । এজন্য পথশিশু, এতিম, বিধবা নারী, প্রতিবন্ধী মানুষ এদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছি । এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে গরীব লোকের বাচ্চা গুলো মারা যাচ্ছে । এই গুলো বিষয়েও কাজ করার পরিকল্পনা আছে । অবশ্যই পর্দা মেইনটেইন করে ই কাজগুলো করবো ইনশাআল্লাহ । এই বিষয়ে ইসলাম কি আমাকে অনুমতি দিবে ?

Answer

প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মানবিক উদ্যোগ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আন্তরিক ইচ্ছা সত্যিই প্রশংসনীয়। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই সমাজের কল্যাণে কাজ করার উৎসাহ দেয়, তবে তা শরিয়তের নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে করতে হবে।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুমতি

নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে ইসলাম আপনার এই উদ্যোগকে অনুমতি দিচ্ছে এবং উৎসাহিত করছে:

১. কোরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন:

"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরের সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরের সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়েদা, ৫:২)

এতিম, বিধবা, পথশিশু ও অসহায় মানুষের সেবা করা সবচেয়ে বড় সৎকর্ম। আল্লাহ আরো বলেন:

"যে ব্যক্তি একটি জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।" (সূরা আল-মায়েদা, ৫:৩২)

২. হাদিসের দৃষ্টান্ত: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

"মুসলিমরা তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতিতে একটি দেহের মতো।" (সহীহ বুখারী, মুসলিম)

অন্য হাদিসে এসেছে:

"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দুনিয়ার কোনো কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তার আখিরাতের কষ্ট দূর করবেন।" (সহীহ মুসলিম)

৩. নারীদের অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত: ইসলামের ইতিহাসে নারীরা সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) যুদ্ধাহতদের সেবা করতেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবি নারীরা শিক্ষা ও দাতব্য কাজে অংশ নিতেন।

শর্তাবলী (যা মেনে চলতে হবে):

যেহেতু আপনি পর্দা মেইনটেইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই নিম্নলিখিত শর্তাবলী মেনে আপনার কাজ সম্পূর্ণ বৈধ ও সওয়াবের হবে ইনশাআল্লাহ:

১. পুরুষদের সাথে সীমিত ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ: পুরুষদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে ফোন বা অনলাইনে কাজ পরিচালনা করুন।

২. মহিলা টিম গঠন: এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধী মহিলাদের জন্য আলাদা মহিলা টিম তৈরি করুন।

৩. পর্দার সঠিক পালন: বাইরে যাওয়ার সময় পুরো শরীর ঢেকে নিন (বোরকা বা চাদর), পরিপূর্ণ পর্দা করা ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়া।

৪. নিরাপত্তা নিশ্চিত: কাজের সময় মহিলা সহকর্মীদের সাথে থাকুন, একা একা সন্দেহজনক জায়গায় না যাওয়া। সফরের দূরত্বে অবশ্যই আপনার মাহরামকে সাথে রাখতে হবে।

৫. উদ্দেশ্য ও নিয়ত: আপনার নিয়ত যেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয় এবং উম্মাহর শক্তি বাড়ানোর জন্য হয়।

ফতোয়া ও হানাফি গ্রন্থের উদ্ধৃতি:

ফতোয়া উসমানি (১/২৩৪): নারীর জন্য সমাজসেবা ও দাতব্য কাজ করা জায়েজ, শর্ত হলো পর্দা ও ইখতিলাত (মেলামেশা) থেকে দূরে থাকা।

রদ্দুল মুহতার (৬/৪০৮): ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) নারীর জন্য কোনো কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, যদি তা বৈধ হয় এবং পর্দা রক্ষা করে।

বেহেশতি জেওয়ার (অধ্যায়: নারীর কাজ ও বাহিরগমন): আশরাফ আলী থানবী (রহ.) বলেছেন, নারীর জন্য বৈধ প্রয়োজনে (যেমন: শিক্ষা, চিকিৎসা, এতিমের তত্ত্বাবধান) বাইরে বের হওয়া জায়েজ, তবে শর্ত হলো পর্দা ও প্রয়োজনীয়তা।

ফতোয়া আলমগিরি (ফতোয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৬৪): নারীর জন্য এতিম ও বিধবাদের সেবা করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং এতে কোনো বাধা নেই, যদি পর্দা রক্ষা হয়।

চূড়ান্ত উত্তর:

ইসলাম আপনাকে অনুমতি দিচ্ছে, বরং এই কাজের জন্য উৎসাহিত করছে। আপনি যে পর্দা মেইনটেইন করে কাজ করবেন, ইনশাআল্লাহ তা আপনার জন্য অতিরিক্ত নেকি ও বরকতের কারণ হবে। আপনার এই উদ্যোগ কেবল দুনিয়ার মানুষের উপকারই করবে না, বরং মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী করে তৈরি করতেও সহায়ক হবে।

মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি কোনো কষ্ট দূর করে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে সম্মানিত করবেন। আপনার এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে আপনি সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, যা ইসলামের মূল শিক্ষা।

আল্লাহ তাআলা আপনার সব কাজ কবুল করুন, উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনার প্রতিটি পদক্ষেপে বরকত ও সফলতা দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.