উমরাহর সময় মহিলাদের পর্দা
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। উমরাহ পালনের প্রস্তুতি একটি মহান ইবাদত। আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. তাওয়াফের সময় মহিলাদের পর্দা ও নিকাবের বিধান
আপনি সঠিক তথ্যই জেনেছেন যে, ইহরাম অবস্থায় (তাওয়াফসহ) মহিলাদের জন্য এমন নিকাব (পর্দা) পরা নিষিদ্ধ যা চেহারার সাথে লেগে থাকে এবং মুখমণ্ডলের হাড়ের ছাপ ফুটিয়ে তোলে। কারণ ইহরামের মূল উদ্দেশ্যই হলো ইখলাস ও বিনয়, আর চেহারা খোলা রাখা ইহরামের একটি শর্ত।
তবে পর্দা (হিজাব) রক্ষা করা ফরজ। তাই মহিলারা কীভাবে পর্দা রক্ষা করবেন? এর সমাধান হলো:
বিধান: ইহরাম অবস্থায় মহিলারা চেহারায় এমন কাপড় ব্যবহার করতে পারবেন যা মুখের সংস্পর্শে আসবে না। অর্থাৎ, মাথার উপর থেকে কাপড় ঝুলিয়ে দেবেন যাতে তা মুখের উপর পড়ে থাকে কিন্তু মুখের চামড়ার সাথে লেগে না থাকে। এতে পর্দাও রক্ষা হবে এবং ইহরামের বিধানও লঙ্ঘন হবে না।
হানাফি ফিকহের দলিল:
১. হাদিস: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “ইহরাম অবস্থায় আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ছিলাম। যখন আমাদের পাশ দিয়ে অশ্বারোহী পুরুষরা যেত, তখন আমরা আমাদের চাদর (উপরের কাপড়) মাথা থেকে মুখের উপর ঝুলিয়ে দিতাম (যাতে মুখ ঢাকা পড়ে)। যখন তারা চলে যেত, তখন আমরা তা সরিয়ে নিতাম।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৮৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৯৩৫)
এই হাদিসটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, পর্দার প্রয়োজনে মুখ ঢাকা যাবে, তবে তা এমনভাবে যেন চেহারার সাথে লেগে না থাকে।
২. ফতোয়ায়ে আলমগীরি (হানাফি): “মহিলার জন্য ইহরাম অবস্থায় চেহারা ঢাকা জায়েয নেই, তবে যদি বেগানা পুরুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার প্রয়োজন হয়, তাহলে সে চেহারার উপর কাপড় ঝুলিয়ে দিতে পারবে, তবে এমনভাবে যেন তা চেহারার সাথে লেগে না থাকে।” (ফতোয়ায়ে আলমগীরি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৩)
৩. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): “ইহরাম অবস্থায় মহিলার জন্য চেহারা খোলা রাখা সুন্নত, কিন্তু ফিতনার ভয় থাকলে বা বেগানা পুরুষের সামনে পড়লে চেহারা ঢেকে রাখা ওয়াজিব। তবে ঢাকার পদ্ধতি হবে এমন যেন কাপড় চেহারার সাথে লেগে না থাকে।” (রদ্দুল মুহতার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮১)
আধুনিক সমাধান: বাজারে বিশেষ ধরনের "ইহরাম নিকাব" পাওয়া যায় যা দেখতে অনেকটা ক্যাপের মতো, যা মাথার সাথে আটকানো থাকে এবং সামনের অংশে একটি কাপড় ঝুলে থাকে যা মুখের সাথে লেগে থাকে না। আপনি এটি ব্যবহার করতে পারেন। অথবা, সাধারণ ওড়না বা চাদর মাথার উপর থেকে এমনভাবে ঝুলিয়ে দিন যেন তা মুখের উপর পড়ে থাকে কিন্তু মুখের চামড়া স্পর্শ না করে।
২. জুতা ব্যাগে করে নিয়ে তাওয়াফ করা যাবে কি?
বিধান: জুতা ব্যাগে করে নিয়ে তাওয়াফ করা সম্পূর্ণ জায়েয এবং বৈধ। এতে কোনো সমস্যা নেই। বরং এটি একটি উত্তম পদ্ধতি, কারণ মসজিদে হারামের মেঝে পবিত্র ও মূল্যবান মার্বেল পাথরের। জুতা হাতে বা ব্যাগে রাখলে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা হয় এবং নামাজরত বা তাওয়াফরত অন্যদের কষ্ট না হয়।
হানাফি ফিকহের দলিল:
১. মসজিদে প্রবেশের নিয়ম: মসজিদে প্রবেশের সময় জুতা খুলে প্রবেশ করা সুন্নত এবং মসজিদের ভেতরে জুতা নিয়ে চলাফেরা করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। তবে প্রয়োজনে (যেমন: জুতা চুরির ভয়) জুতা হাতে বা ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়া জায়েয। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২২)
২. তাওয়াফের শর্ত: তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা (ওযু) শর্ত, কিন্তু জুতা পরা বা না পরা শর্ত নয়। তাই জুতা ব্যাগে রেখে তাওয়াফ করলে তাওয়াফ সহীহ হবে। (আল-হিদায়া, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪)
৩. ফতোয়ায়ে উসমানি: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দা. বা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, "তাওয়াফের সময় জুতা হাতে রাখা যাবে কি?" উত্তরে তিনি বলেন, "জুতা হাতে বা ব্যাগে রেখে তাওয়াফ করা জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন জুতা নাপাক না হয় এবং অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না হয়।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৫)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. নিকাব: ইহরাম অবস্থায় মহিলারা এমন নিকাব ব্যবহার করবেন যা মুখের সাথে লেগে থাকে না। মাথার উপর থেকে কাপড় ঝুলিয়ে দিলে বা বিশেষ ইহরাম নিকাব ব্যবহার করলে পর্দা রক্ষা হবে এবং ইহরামের বিধানও ভঙ্গ হবে না।
২. জুতা: জুতা ব্যাগে করে নিয়ে তাওয়াফ করা জায়েয এবং বৈধ। এতে তাওয়াফ সহীহ হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনার উমরাহ কবুল করুন এবং সহজ করুন। আমিন।