বিয়ে কি নির্ধারিত কার সাথে এবং কোন সময়ে হবে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমাদের বিয়ে হবে কি না? কার সাথে হবে? কবে কোন সময়ে হবে, এই বিষয় গুলো পূর্ব নির্ধারিত? যদি নির্ধারিত থাকে, তাহলে যে অনেকের বিয়ে বন্ধ করে রাখে যার কারণে অনেক পরে বিয়ে হয়।
আমার বিয়ের জন্য প্রায় ৪.৫ বছর ধরে ট্রাই করা হচ্ছে। যখন বিয়ের কথা হয় মনে হয় এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু কোনো না কোনো কারণে পিছিয়ে যায়। এমন হয় এক জায়গা থেকেই ৩/৪ বার দেখতে আসে, পরে আবার পিছিয়ে যায়।
আমাদের আশেপাশে যে হুজুররা বিয়ের জন্য আমাল বা তাদের ভাষ্যমতে ইসলামিক চিকিৎসা করে, তারা বেশিরভাগই তাবিজ দেয়, এবং মায়ের নামের সাহায্যে কাজ করে। তাদের কাছে যাওয়া কি ঠিক হবে। এক হুজুর নাকি সুতা দিয়ে মেপে চিকিৎসা করে, এখন আমাকে অনেক ফোর্স করা হচ্ছে যেন হুজুরের কাছ থেকে চিকিৎসা নেই। এখন আমি কি করতে পারি।
আলহামদুলিল্লাহ আমি দীর্ঘদিন ধরে বিয়ের জন্য দুরুদ শরীফ, সূরা ফুরকানের ৭৪ নং আয়াত,সূরা কাসাস এর ২৪ নং আয়াত, সূরা তাওবার আয়াতের আমল করে আসছি। বদ নজরের রুকইয়াহ, গোসল ও করেছি। রুকইয়াহ সেশন ও নিয়েছি কোনো সমস্যা মনে হয়নি।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় বোন/ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগ ও দীর্ঘদিনের অপেক্ষা বোধগম্য। আসুন, আমরা কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি।
১. বিয়ে কি পূর্ব নির্ধারিত? কবে, কার সাথে হবে?
হ্যাঁ, ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের জীবনের সকল বিষয়—জন্ম, মৃত্যু, রিযিক (জীবিকা), এবং বিয়ে—সবকিছু আল্লাহ তাআলার পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর (ভাগ্য) অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ "আর আসমানে রয়েছে তোমাদের রিযিক এবং যা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।" (সূরা আয-যারিয়াত: ২২)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমরা বসে থাকব এবং কিছু করব না। বরং তাকদীরের উপর ঈমান আনার সাথে সাথে আমাদের কর্তব্য হলো উপায় অবলম্বন করা (আসবাব) এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা (তাওয়াক্কুল)। বিয়ে একটি ইবাদত ও সুন্নত। তাই এর জন্য চেষ্টা করা, পাত্র/পাত্রী খোঁজা, এবং দোয়া করা আমাদের দায়িত্ব। বিয়েতে বিলম্ব হওয়া বা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় বিয়ে না হওয়া আপনার তাকদীরের অংশ হতে পারে, অথবা এটি আপনার জন্য একটি পরীক্ষা হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "তোমাদের জন্য ভালো হতে পারে এমন একটি বিষয়কে তোমরা অপছন্দ করতে পারো, এবং তোমাদের জন্য খারাপ হতে পারে এমন একটি বিষয়কে তোমরা পছন্দ করতে পারো। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৬)
সুতরাং, বিয়ে কবে, কার সাথে হবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের কাজ হলো উত্তম পাত্র/পাত্রী খোঁজা, ইস্তিখারা করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা। বিয়েতে দেরি হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনার বিয়ে হবে না; বরং এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা হতে পারে।
২. "হুজুরদের" কাছে তাবিজ বা ইসলামিক চিকিৎসা নেওয়া কি ঠিক?
আপনি যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন—যারা "মায়ের নামের সাহায্যে" কাজ করে, "সুতা দিয়ে মেপে" চিকিৎসা করে—এগুলো সম্পূর্ণ অইসলামিক ও কুসংস্কার। ইসলামে এ ধরনের পদ্ধতির কোনো ভিত্তি নেই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ "যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে যায় এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করলো।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নং: ৯৫৩০)
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:
- তাবিজ (Ta'wiz): হানাফি মাযহাবে, যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত বা সহীহ দোয়া লেখা থাকে এবং তা পবিত্র অবস্থায় ব্যবহার করা হয়, তবে কিছু উলামা (যেমন: ইমাম আহমদ রহ.) একে অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এবং অন্যান্য অনেক উলামায়ে কেরাম তাবিজকে মাকরূহ (অপছন্দনীয়) বলেছেন, বিশেষ করে যখন তা শিরকের সাথে মিশে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড, ৩৬২ পৃষ্ঠা)
- মায়ের নামের সাহায্যে কাজ করা: এটি সম্পূর্ণ শিরকী কাজ। কারণ, আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারো নামে বা অন্য কিছুর মাধ্যমে কাজ করা শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا "যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে তো বহু দূরে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল।" (সূরা আন-নিসা: ১১৬)
- সুতা দিয়ে মেপে চিকিৎসা: এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার। ইসলামে এ ধরনের কোনো পদ্ধতি নেই। এটি জ্যোতিষশাস্ত্র বা গণকের কাজের অন্তর্ভুক্ত, যা হারাম।
আপনার করণীয়: আপনাকে যারা এসব কাজে ফোর্স করছে, তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলুন যে, ইসলামে এ ধরনের পদ্ধতি বৈধ নয়। আপনি কুরআন-সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও আমলই করবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সহীহ দোয়া ও রুকইয়াহ (কুরআন দিয়ে ঝাড়ফুঁক) করাই উত্তম। আপনি ইতিমধ্যে যে আমলগুলো করছেন (দুরুদ, সূরা ফুরকান, সূরা কাসাস, সূরা তাওবা) সেগুলো খুবই উত্তম। এগুলো চালিয়ে যান এবং সাথে সাথে সালাতুল হাজত (প্রয়োজন পূরণের নামাজ) ও ইস্তিখারা (নিয়তের সঠিকতা জানার জন্য দোয়া) করুন।
৩. বিয়েতে বিলম্বের কারণ ও করণীয়
বিয়েতে বিলম্বের অনেক কারণ থাকতে পারে—পাত্র/পাত্রীর পছন্দ-অপছন্দ, পারিবারিক সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সমস্যা, অথবা এটি আপনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا "নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।" (সূরা আশ-শারহ: ৫)
আপনার জন্য কিছু পরামর্শ:
- ধৈর্য ধারণ করুন: বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
- ইস্তিখারা করুন: কোনো পাত্র/পাত্রী দেখলে বা প্রস্তাব এলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তিখারার দোয়া পড়ুন। আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দোয়া করুন।
- দোয়া চালিয়ে যান: আপনার উল্লেখিত আমলগুলো (দুরুদ, সূরা ফুরকান ৭৪, সূরা কাসাস ২৪, সূরা তাওবা) খুবই উত্তম। সাথে সাথে এই দোয়াটিও পড়ুন:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ "হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।" (সূরা আল-কাসাস: ২৪)
- পাত্র/পাত্রী নির্বাচনে মানদণ্ড: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ "নারীর সাথে বিয়ে করা হয় চারটি বিষয়ের জন্য: তার সম্পদের কারণে, তার বংশের কারণে, তার সৌন্দর্যের কারণে এবং তার দ্বীনদারীর কারণে। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলোমাখা হোক।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০) সুতরাং, দ্বীনদার পাত্র/পাত্রী খোঁজার চেষ্টা করুন।
- অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করুন: আপনার পরিবারের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। তারা যেন আপনার বিয়ের ব্যাপারে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে।
৪. "বদ নজর" ও রুকইয়াহ সম্পর্কে
আপনি বদ নজরের রুকইয়াহ ও গোসল করেছেন, এটা ভালো। ইসলামে বদ নজর (নজর লাগা) সত্য। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
الْعَيْنُ حَقٌّ "নজর লাগা সত্য।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৪০)
তবে, রুকইয়াহ (কুরআন দিয়ে ঝাড়ফুঁক) করার নিয়ম হলো—সহীহ দোয়া ও আয়াত দিয়ে করা। আপনি যে রুকইয়াহ সেশন নিয়েছেন, তাতে কোনো সমস্যা মনে না হলে ইনশাআল্লাহ তা ঠিক আছে। তবে মনে রাখবেন, রুকইয়াহ করলে বা তাবিজ ব্যবহার করলে বিয়ে হবে—এমন ধারণা রাখা ঠিক নয়। বিয়ে হবে আল্লাহর ইচ্ছায়, আর আমাদের কর্তব্য হলো দোয়া ও চেষ্টা করা।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
- বিয়ে পূর্ব নির্ধারিত: হ্যাঁ, তাকদীরের অংশ হিসেবে বিয়ে নির্ধারিত। তবে এর জন্য চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব।
- তাবিজ/মায়ের নামে কাজ: যারা মায়ের নামে বা সুতা দিয়ে মেপে কাজ করে, তাদের কাছে যাওয়া হারাম ও শিরক। তাদের থেকে দূরে থাকুন।
- আপনার করণীয়: কুরআন-সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও আমল চালিয়ে যান। ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ইস্তিখারা করুন। দ্বীনদার পাত্র/পাত্রী খোঁজার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দিন এবং আপনার জন্য উত্তম পাত্র/পাত্রী নির্ধারণ করুন। আমিন।
রেফারেন্স সমূহ:
- কুরআনুল কারিম (সূরা আয-যারিয়াত: ২২, সূরা আল-বাকারা: ২১৬, সূরা আন-নিসা: ১১৬, সূরা আশ-শারহ: ৫, সূরা আল-কাসাস: ২৪)
- সহীহ বুখারী (হাদিস নং: ৫০৯০, ৫৭৪০)
- মুসনাদ আহমাদ (হাদিস নং: ৯৫৩০)
- রদ্দুল মুহতার (৬তম খণ্ড, ৩৬২ পৃষ্ঠা) - তাবিজের বিধান প্রসঙ্গে।
আপনার জন্য দোয়া রইল। আল্লাহ তাআলা আপনার বিয়ের বিষয়টি সহজ করে দিন এবং উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।