হায়েজ অবস্থায় সিজদার আয়াত, নামাজে বা সাদাকার নিয়ত পরিবর্তন
Salah-Prayer · Hanafi
Question
১) হায়েজ অবস্থায় সিজদার আয়াত শুনলে করণীয় কি?
২) আমি ইশার সলাতে সময় ফরজ সলাতের পর (ইচ্ছাকৃত/অনিচ্ছাকৃতভাবে) সুন্নত না পড়েই বিতরের নিয়ত করে (ও মুখে বলে) বিতর পড়া শুরু করে দিলে প্রথম রাকাতেই আবার নিয়ত চেঞ্জ করে ২ রাকাত সুন্নত নিয়তে পড়ে শেষ দিই, পরে বিতর আবার পড়ি। আমার সলাত কি সহিহ হয়েছে? এরকমটা কি করা যায়?
৩) আমি যদি কোথাও সাদাকাহ করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য,,, পরে (কিছুক্ষণ কিংবা কিছুদিন পরে) নিয়ত করি আরো কিছু, তবে কি সে নিয়ত করা সহিহ হবে?
যেমন এক ব্যক্তিকে কিছু টাকা হাদিয়া দেওয়ার সময় এ নিয়ত করিনি তবে দেওয়ার ২/৩ দিন পর নিয়ত করলাম যাতে সে তা দিয়ে যা খেয়েছে তা যাকে তার জন্য হেদায়েতের কারণ হয় কিংবা তার যাতে বর্তমানে ( আগে নয়) করা ঋণ মুক্ত হয়।
একজায়গায় দেখেছিলাম বলা ছিলো যাকাত দেওয়ার জন্য হাতে টাকা থাকাকালীন নিয়ত করতে হবে দেওয়ার পরে করলে হবেনা,,,,এ জন্য এ প্রশ্ন করা,,,
এছাড়াও সাদাকাহ করার সময় মনে ছিলোনা, কিন্তু পরে আমি নিয়ত করলাম যাতে এই ভালো কাজের উসিলায় আল্লাহ আমার কোনো একটা পরিস্থিতি সহজ করেন,,,এরকম নিয়ত কি ঠিক হবে?
জাঝাকুমুল্লাহু খইর
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১) হায়েজ অবস্থায় সিজদার আয়াত শুনলে করণীয়:
হায়েজ অবস্থায় (মাসিক চলাকালীন) তিলাওয়াতের সিজদা (সিজদায়ে তিলাওয়াত) করা নারীদের জন্য বৈধ নয়। কারণ, সিজদায়ে তিলাওয়াতের জন্যও পবিত্রতা (ওযু/গোসল) শর্ত। হায়েজ অবস্থায় নামাজ, তিলাওয়াত, সিজদায়ে তিলাওয়াত—সবই নিষিদ্ধ। তাই হায়েজ অবস্থায় সিজদার আয়াত শুনলে বা পড়লে সিজদা করা যাবে না এবং পরবর্তীতেও এর কাযা করতে হবে না। এটি হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট বিধান।
দলিল:
- আল-হিদায়াহ (১/৮০): সিজদায়ে তিলাওয়াতের শর্তে পবিত্রতা উল্লেখ রয়েছে।
- রদ্দুল মুহতার (২/১৬৮): হায়েজ অবস্থায় সিজদায়ে তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ এবং এর কাযা নেই।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৩২): হায়েজ অবস্থায় সিজদায়ে তিলাওয়াত বৈধ নয়।
২) ইশার নামাজে সুন্নতের আগে বিতর পড়তে শুরু করে নিয়ত পরিবর্তন করা:
আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনি ইশার ফরজের পর সুন্নত না পড়ে বিতরের নিয়ত করে পড়া শুরু করেছেন, তারপর প্রথম রাকাতে নিয়ত পরিবর্তন করে ২ রাকাত সুন্নত পড়েছেন, পরে আবার বিতর পড়েছেন।
বিধান: নামাজের মধ্যে নিয়ত পরিবর্তন করা (এক নামাজ থেকে অন্য নামাজে) জায়েয নয় এবং এটি নামাজ বিনষ্টকারী কাজ। তবে আপনার ক্ষেত্রে যা হয়েছে:
- আপনি বিতরের নিয়তে তাকবিরে তাহরিমা বলেছেন (নামাজ শুরু করেছেন)।
- এরপর প্রথম রাকাতেই নিয়ত পরিবর্তন করে সুন্নতের নিয়ত করেছেন।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তাকবিরে তাহরিমার পর নিয়ত পরিবর্তন করলে প্রথম নামাজ (বিতর) বাতিল হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় নিয়ত (সুন্নত) সহীহ হয় না, কারণ নিয়ত পরিবর্তন করা নামাজ ভঙ্গের কারণ। তবে আপনি যদি প্রথম রাকাতেই (সিজদার আগে) নিয়ত পরিবর্তন করে থাকেন, তাহলে আপনার সুন্নত নামাজটি সহীহ হবে না এবং বিতরও আদায় হবে না। আপনাকে পুনরায় সুন্নত এবং বিতর উভয়ই আদায় করতে হবে।
তবে যদি আপনি প্রথম রাকাতের সিজদার পরে নিয়ত পরিবর্তন করেন, তাহলে সেটি আরও গুরুতর। কারণ, এক রাকাত পূর্ণ হওয়ার পর নিয়ত পরিবর্তন করলে নামাজ সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়।
সঠিক পদ্ধতি: নামাজের মধ্যে নিয়ত পরিবর্তন করা যাবে না। আপনি যদি ভুলবশত বিতর শুরু করে দেন, তাহলে সেই নামাজ বিতর হিসেবেই সম্পন্ন করুন। সুন্নত পরে আলাদাভাবে পড়ে নিন। অথবা নামাজ ভেঙে আবার সঠিকভাবে শুরু করুন।
দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (১/৪৩৮): নামাজের মধ্যে নিয়ত পরিবর্তন করা নামাজ বিনষ্টকারী।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৮৫): এক নামাজ থেকে অন্য নামাজে নিয়ত পরিবর্তন করলে নামাজ ফাসিদ হয়ে যায়।
- আল-হিদায়াহ (১/১১০): নিয়ত পরিবর্তন নামাজ ভঙ্গের কারণ।
৩) সাদাকাহর নিয়ত পরবর্তীতে করা:
ক) সাদাকাহ দেওয়ার সময় নিয়ত না থাকলে: ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, সাদাকাহ বা দান-খয়রাতের সওয়াব পেতে হলে দেওয়ার সময় নিয়ত থাকা শর্ত। দেওয়ার সময় যদি নিয়ত না থাকে, তবে পরে নিয়ত করলে সেটি সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে না এবং সওয়াবও পাওয়া যাবে না। তবে যদি দেওয়ার সময় অন্তত "আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য" দেওয়ার সাধারণ ইচ্ছা থাকে, তাহলে সেটি সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে।
খ) যাকাতের ক্ষেত্রে: যাকাতের জন্য নিয়ত অপরিহার্য এবং তা অবশ্যই যাকাত প্রদানের সময় (টাকা হাতে থাকা অবস্থায় বা দেওয়ার সময়) করতে হবে। দেওয়ার পর নিয়ত করলে যাকাত আদায় হবে না। এটি হানাফি মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
গ) আপনার প্রশ্নের উত্তর:
- আপনি যদি কাউকে টাকা হাদিয়া (উপহার) দেওয়ার সময় সাদাকাহর নিয়ত না করে থাকেন, তবে পরে (২/৩ দিন পর) নিয়ত করলে সেটি সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ, নিয়তের সময় কাজটি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে।
- তবে আপনি যদি দেওয়ার সময় "আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য" দেওয়ার মানসিকতা রাখেন, তাহলে সেটি সাদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে।
- "ভালো কাজের উসিলায় আল্লাহ আমার কোনো পরিস্থিতি সহজ করুন"—এই নিয়তে সাদাকাহ করা জায়েয এবং এতে সওয়াবও হবে। তবে এই নিয়তটি সাদাকাহ দেওয়ার সময় করতে হবে, পরে করলে সওয়াব পাওয়া যাবে না।
দলিল:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৮৯): যাকাতের নিয়ত প্রদানের সময় শর্ত।
- রদ্দুল মুহতার (২/২৬৭): নিয়ত ব্যতীত সাদাকাহ সহীহ নয়।
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৩৪৫): দান-সদকায় নিয়তের সময় দেওয়ার সময় হওয়া শর্ত।
সারসংক্ষেপ: ১) হায়েজ অবস্থায় সিজদার আয়াত শুনলে সিজদা করা যাবে না এবং কাযাও নেই। ২) নামাজের মধ্যে নিয়ত পরিবর্তন করা জায়েয নয়; আপনার নামাজটি পুনরায় পড়তে হবে। ৩) সাদাকাহ বা যাকাতের নিয়ত অবশ্যই দেওয়ার সময় করতে হবে; পরে করলে সহীহ হবে না।
والله أعلم بالصواب