বদনজর কী, কীভাবে লাগে? ফেসবুকে সুখের মুহূর্ত শেয়ার করলে বদনজর লাগার সম্ভাবনা আছে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3479
Questioner: Al Amin Ahmed Mobin
Question Asked: 04 Aug 2026, 12:23 PM
Reviewed & Published: 04 Aug 2026, 12:50 PM
Views: 9
Tokens: 3,148
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আচ্ছা কেউ ফেসবুকে নিজের স্বামী ছেলে নিয়ে ভালো মুহুর্ত শেয়ার দিলো।তার কোনো বন্ধু সেটা দেখে আপসোসের সাথে হায় ইস কতো কিছু আছে কিছু হয়ও না এইভাবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লে বা সেইভাবে তাকিয়ে থাকলে তা কি বদনজর হয়ে যায়?
বদনজর কিভাবে লাগে?
বিস্তারিত বুঝালে উপকৃত হই

Answer

উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নের জবাবে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—বদনজর (নজর-ই-বাদ) একটি বাস্তব বিষয়, যা কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে এটি কখন, কীভাবে লাগে এবং এর প্রভাব কতটুকু হয়—তা নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নিচে হানাফি মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।


১. বদনজর কী এবং এটি কি সত্য?

বদনজর হলো কারো প্রতি হিংসা বা ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি, যা দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছায় অন্যের ক্ষতি হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"বদনজর সত্য (বাস্তব)।"
(সহিহ বুখারি: ৫৭৪০; সহিহ মুসলিম: ২১৮৭)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, বদনজর এমন এক প্রকার ক্ষতি যা আল্লাহর কুদরতে ঘটে এবং তা থেকে বাঁচতে দোয়া ও তাবিজ-আজিমা করা জায়েয।
(রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৩)


২. বদনজর কীভাবে লাগে?

বদনজর সাধারণত হিংসা, ঈর্ষা বা প্রশংসার সাথে মিশ্রিত দৃষ্টি থেকে লাগে। তবে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলা বা আফসোস করা বদনজর নয়, বরং মনের মধ্যে হিংসা বা ঈর্ষা থাকা এবং সেই অবস্থায় তাকানোই মূল কারণ।

কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"আর যারা ঈর্ষা করে, তাদের অনিষ্ট থেকে।"
(সূরা আল-ফালাক: ৫)

তাফসিরে মা'রিফুল কুরআনে (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.) উল্লেখ আছে যে, বদনজর মূলত ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি থেকে হয়। যদি কেউ শুধু আফসোস করে বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কিন্তু মনে হিংসা না থাকে, তবে তা বদনজর হিসেবে গণ্য হবে না। তবে যদি মনে হিংসা থাকে এবং সেই অবস্থায় তাকায়, তাহলে তা বদনজর হতে পারে।


৩. প্রশ্নের বর্ণিত ঘটনার বিধান:

আপনি যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন—কেউ ফেসবুকে নিজের সুখের মুহূর্ত শেয়ার করলে, তার বন্ধু আফসোস করে বলে, "হায়, কতো কিছু আছে, কিছু হয়ও না" এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে—এতে বদনজর লাগার সম্ভাবনা আছে, তবে শর্ত হলো:

  • যদি বন্ধুর মনে হিংসা বা ঈর্ষা থাকে, তাহলে তা বদনজর হতে পারে।
  • যদি শুধু আফসোস বা দুঃখ প্রকাশ করে, কিন্তু মনে হিংসা না থাকে, তাহলে তা বদনজর নয়।

তবে ইসলামি নির্দেশনা হলো, সুখের বিষয় প্রকাশ্যে শেয়ার না করাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমাদের নেয়ামতগুলোকে (আল্লাহর দেওয়া) গোপন রাখো, কারণ প্রতিটি নেয়ামতের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ লোক রয়েছে।"
(মুসনাদে বাযযার, হাদিস: ৬৪৩৯; তাবরানি)


৪. বদনজর থেকে বাঁচার উপায়:

১. সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়া।
২. দোয়া: "আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক" (আল্লাহর পূর্ণ কালামের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই)।
৩. নিজের পরিবার ও সম্পদের জন্য বরকতের দোয়া করা।
৪. সুখের বিষয় প্রকাশ্যে না করা, বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে।


৫. বদনজর লাগলে করণীয়:

যদি কারো বদনজর লাগে, তাহলে:

  • গোসল করানো: হাদিসে আছে, বদনজরকারীকে গোসল করতে বলা হয় এবং সেই পানি দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তিকে গোসল করানো হয়।
    (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৮০; সহিহ মুসলিম: ২১৮৮)

  • দোয়া ও তাবিজ: হানাফি মাযহাবে কুরআন ও সহিহ দোয়া দিয়ে তাবিজ লেখা জায়েয।
    (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪)


৬. গুরুত্বপূর্ণ নোট:

বদনজর নিয়ে অতিরিক্ত ভয় বা আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং সহিহ দোয়া পড়া যথেষ্ট। মনে রাখবেন, বদনজর আল্লাহর ইচ্ছায়ই প্রভাব ফেলে, তাই প্রকৃত আশ্রয়দাতা একমাত্র আল্লাহ।


আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩৪)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.