গগর্ভাবস্থায় আমল প্রসঙ্গে।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
টাংাইল থাকেন। তার আগের থেকেই ওসওয়াসার সমস্যা, বদনজরের সমস্যা৷ একবার ঘুম থেকে উঠে তার চুলও এক স্থানে কাটা পেয়েছিলো।
৩ দিন আগে ডাক্তার দেখায়, বাসায় আসতে রাত হয়, ঘরে ঢুকতে গিয়ে হঠাত অনেক ভয় পায়। এর পর বেবির নরাচড়া কমে গেছে।
ডাক্তার চিন্তা করতে মানা করেছে। কিন্তু তার চিন্তা অনেক টেনশিন্নহচ্ছে।
তার মায়ের সাথেও সে সামান্য কারনে রাগারাগি ও বাজে ব্যবহার ও করতেছেন
তার জন্যে হিফাজতের আমল সকাল সন্ধ্যা করতে বলেছিলাম।
সকালে সূরা বাকারাহ জোরে ছেড়ে রাখতে বলেছি।
পাশাপাশি কোনো রুকইয়ার দুয়া বা আমল কি আছে যা রোগী নিজে করতে পারবে এই মুহুর্তে?
তাকে রাকি দেখাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বেবির রিস্কি অবস্থা থাকায় দেখাচ্ছিনা, যদি জিন শরীরে চলে আসে ও বেবির কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাই
তাদের বিয়ের ১০ বছর পর এই প্রথম সন্তাম আসতে যাচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহে
Answer
গর্ভাবস্থায় সওয়াসা (ওয়াসওয়াসা) ও হিফাজতের আমল
উত্তর:
আপনার খালার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করছি। গর্ভাবস্থায় ওয়াসওয়াসা ও ভয়-ভীতি একটি কঠিন পরিস্থিতি। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান ও হিফাজতের আমল নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. ওয়াসওয়াসার প্রকৃতি ও করণীয়
ওয়াসওয়াসা (وسوسہ) শয়তানের পক্ষ থেকে আসা খারাপ চিন্তা ও ভয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা। যখন তোমাদের কারো মনে ওয়াসওয়াসা আসে, তখন সে যেন 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম' পড়ে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।" (সহীহ বুখারী: ৩২৯১)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায় হলো:
- ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া
- আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা
- শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা
২. হিফাজতের আমলসমূহ
ক. সকাল-সন্ধ্যার আমল:
১. আয়াতুল কুরসী (সূরা বাকারাহ ২:২৫৫)
- সকালে ও সন্ধ্যায় পড়লে শয়তান থেকে হিফাজত থাকে
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসী পড়বে, সে আল্লাহর হিফাজতে থাকবে।" (তিরমিযী: ২৮৭৯)
২. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (৩ বার করে)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এই তিন সূরা ৩ বার করে পড়তেন এবং বলেছেন: "এগুলো তোমার জন্য সব কিছু থেকে যথেষ্ট হবে।" (আবু দাউদ: ৫০৮২)
৩. সূরা বাকারাহ
- আপনি যেমন বলেছেন, সূরা বাকারাহ জোরে পড়া বা শোনানো খুবই উপকারী
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারাহ পড়া হয়।" (সহীহ মুসলিম: ৭৮০)
খ. রোগী নিজে করতে পারবে এমন রুকইয়ার আমল:
১. চার কুল (সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক, নাস)
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে পড়া
২. দরূদ শরীফ
- বেশি বেশি দরূদ পড়া (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
৩. ইস্তিগফার
- বেশি বেশি "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়া
৪. এই দোয়া পড়া:
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
"বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মাআসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা-ই ওয়া হুওয়াস সামীউল আলীম" (যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়া ৩ বার পড়বে, তাকে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না) - তিরমিযী: ৩৩৮৮
৫. সূরা ইউনুসের ৮১ নং আয়াত:
إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ
"ইন্নাল্লাহা সাইউবতিলুহু, ইন্নাল্লাহা লা ইউস্লিহু আমালাল মুফসিদীন"
৩. গর্ভাবস্থায় বিশেষ আমল
১. সূরা মারইয়াম পড়া - গর্ভাবস্থায় পড়া খুবই ফজিলতপূর্ণ
২. সূরা ইউসুফ পড়া - সন্তান সুন্দর ও ধৈর্যশীল হওয়ার জন্য
৩. এই দোয়া পড়া:
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
"রাব্বি হাবলী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাহ, ইন্নাকা সামীউদ দু'আ" (হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন, নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী) - সূরা আলে ইমরান: ৩৮
৪. রাকি দেখানোর বিষয়ে
আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গর্ভাবস্থায় রাকি দেখানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তবে:
- শরীয়তসম্মত রুকইয়া (কুরআন ও সহীহ দোয়া দ্বারা) করানো যেতে পারে
- অভিজ্ঞ ও আলেম রাকি নির্বাচন করা জরুরি
- গর্ভবতী মহিলার উপর সরাসরি হাত রেখে রুকইয়া না করাই উত্তম
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন: "রুকইয়া করা জায়েয যদি তা কুরআন, আল্লাহর নাম বা সহীহ হাদীসের দোয়া দ্বারা হয়।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/১২৫)
৫. মানসিক অবস্থা সম্পর্কে
১. চিন্তা কমানোর উপায়:
- ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা
- পরিবারের সদস্যদের সহানুভূতিশীল আচরণ
- বেশি বেশি আল্লাহর যিকির
২. মায়ের সাথে আচরণ:
- ওয়াসওয়াসার কারণে রাগারাগি হচ্ছে - এটি রোগের অংশ
- терпение ও ধৈর্য ধরতে হবে
- পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে বুঝিয়ে সহযোগিতা করা
৩. এই দোয়া পড়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ
"আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান" (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই)
৬. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
১. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়াই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেছেন: "ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা।"
২. মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন: "ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির জন্য নিয়মিত নামাজ, যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতের কোনো বিকল্প নেই।"
৩. গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক শান্তি অত্যন্ত জরুরি।
৪. পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে বেশি বেশি ভালোবাসা ও সহযোগিতা দেখানো।
৫. ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চেকআপ করানো জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আপনার খালাকে সুস্থতা দান করুন এবং তার সন্তানকে সুস্থভাবে দুনিয়ায় আনার তাওফিক দিন। আমীন।
দ্রষ্টব্য: গর্ভাবস্থায় যেকোনো আমল করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ইসলামী আমলগুলো মানসিক শান্তির জন্য, তবে চিকিৎসার বিকল্প নয়।