বাদামী স্রাব আসলে নামাজ পড়া যাবে?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 3476
Questioner: Sonali Islam 0084
Question Asked: 04 Aug 2026, 10:44 AM
Reviewed & Published: 04 Aug 2026, 10:58 AM
Views: 9
Tokens: 4,276
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমার হায়েজ হওয়ার সময় চলছে; তবে হয়নিএখনো।হায়েজ হওয়ার আগে আমার হ কোমর ব্যথা অনুভব হয় সেটাকিছুটা হচ্ছে।
কিন্তু ফজরের সালাতের আগে স্রাব এর কিছু অংশ(কম অংশ) বাদামী দেখেছি।সালাত আদায় করেছি আর ফোন দিয়ে কুরআন পড়েছি।এখন ও স্রাব বাদামী সালাত আদায় করা কী ঠিক হয়েছিল?
পরবর্তী সালাত কী আদায় করব্?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ইসলামি ফিকহের (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) নিয়ম অনুযায়ী, হায়েজ (মাসিক) শুরু হওয়ার পূর্বে বা শেষ হওয়ার পর যে বাদামী বা হলুদ স্রাব দেখা যায়, তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হয় না, যতক্ষণ না তা নির্ধারিত সময়ের (সর্বনিম্ন ৩ দিন) জন্য একটানা থাকে। তবে, যদি স্রাবটি হায়েজের নির্ধারিত সময়ের (৩ দিন) মধ্যে দেখা যায়, তবে তা হায়েজেরই অংশ

আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত:

১. ফজরের সালাতের আগে বাদামী স্রাব দেখা দেওয়া এবং সেই অবস্থায় সালাত আদায় করা ও কুরআন তিলাওয়াত করা কি ঠিক হয়েছে? ২. পরবর্তী সালাত কীভাবে আদায় করবেন?


১. ফজরের সালাতের আগে বাদামী স্রাব দেখা দেওয়া এবং সালাত আদায় করা

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার হায়েজ হওয়ার সময় চলছে, তবে এখনও হয়নি। হায়েজ হওয়ার আগে কোমর ব্যথা অনুভব হচ্ছে এবং ফজরের আগে অল্প পরিমাণ বাদামী স্রাব দেখেছেন।

হানাফি ফিকহের নিয়ম:

  • যদি কোনো নারীর হায়েজের নির্ধারিত সময় (যেমন: প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখ) চলে আসে এবং তিনি কোমর ব্যথা বা অন্যান্য লক্ষণ অনুভব করেন, কিন্তু এখনও রক্ত বা স্রাব না দেখেন, তাহলে তিনি পবিত্রই থাকবেন।

  • বাদামী বা হলুদ স্রাব যদি হায়েজের সময়ের মধ্যে (অর্থাৎ, যে সময়ে তার হায়েজ হওয়ার কথা) দেখা যায়, তবে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি তা হায়েজের সময়ের বাইরে দেখা যায়, তবে তা হায়েজ নয়, বরং ইস্তিহাযা (অবস্থা) হিসেবে গণ্য হবে।

  • আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি বলেছেন "হায়েজ হওয়ার সময় চলছে" এবং "বাদামী স্রাব দেখেছেন", এটি সম্ভবত আপনার হায়েজ শুরুর ইঙ্গিত। তবে, যেহেতু আপনি ফজরের সালাতের আগে অল্প পরিমাণ বাদামী স্রাব দেখেছেন এবং তারপর সালাত আদায় করেছেন, এখানে মূল বিষয় হলো: স্রাবটি কি সালাত আদায়ের সময়ও অব্যাহত ছিল, নাকি শুধু একবার দেখে পরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল?

  • যদি স্রাবটি সালাত আদায়ের সময়ও অব্যাহত ছিল (অর্থাৎ, সালাতের পুরো সময় জুড়ে বা অধিকাংশ সময় স্রাব আসছিল), তাহলে সেই অবস্থায় সালাত আদায় করা শুদ্ধ হয়নি। কারণ, হায়েজ অবস্থায় সালাত আদায় করা হারাম এবং তা আদায় হলে পুনরায় আদায় করতে হবে (কাজা)।

  • যদি স্রাবটি শুধু একবার দেখেছেন এবং সালাত আদায়ের সময় তা বন্ধ ছিল (অর্থাৎ, সালাতের সময় পবিত্র ছিলেন), তাহলে সালাত আদায় করা শুদ্ধ হয়েছে। তবে, যদি পরে আবার স্রাব আসে এবং তা ৩ দিন বা তার বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, হায়েজ শুরু হয়েছিল সেই সময় থেকে, এবং সেই অবস্থায় আদায়কৃত সালাতগুলো (যদি স্রাব অব্যাহত থাকা অবস্থায় আদায় করা হয়ে থাকে) পুনরায় আদায় করতে হবে।

কুরআন তিলাওয়াত প্রসঙ্গে:

  • হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা (মুসলহাফ স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা) হারাম। তবে, ফোন বা মোবাইলে কুরআন তিলাওয়াত করা বা দেখে পড়া সম্পর্কে হানাফি ফিকহে মতভেদ আছে।
    • প্রচলিত ও বিশুদ্ধ মত: ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসে কুরআনের আয়াত দেখে পড়া বা তিলাওয়াত করা জায়েয আছে, কারণ এতে মুসলহাফ (কাগজের কুরআন) স্পর্শ করা হয় না। তবে, হায়েজ অবস্থায় ফোনে কুরআন তিলাওয়াত করা সম্পর্কে অনেক আলেম মাকরূহ (অপছন্দনীয়) বলেছেন, কারণ এটি কুরআন তিলাওয়াতের সম্মান হানি করতে পারে।
    • আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি নিশ্চিত ছিলেন না যে এটি হায়েজ কিনা, তাই ফোনে কুরআন পড়া হয়তো জায়েয ছিল। তবে, এখন যদি নিশ্চিত হন যে হায়েজ শুরু হয়েছে, তাহলে হায়েজ অবস্থায় ফোনে কুরআন তিলাওয়াত করা থেকে বিরত থাকুন। দরুদ, যিকর, দুআ, ইস্তিগফার করা যাবে।

২. পরবর্তী সালাত কীভাবে আদায় করবেন?

আপনার করণীয়:

১. যদি বাদামী স্রাবটি এখনও অব্যাহত থাকে এবং আপনি নিশ্চিত হন যে এটি হায়েজ (অর্থাৎ, ৩ দিন বা তার বেশি স্থায়ী হবে), তাহলে:

  • সালাত আদায় করা বন্ধ রাখুন (যতক্ষণ না হায়েজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয় এবং গোসল করেন)।
  • রোজা রাখবেন না (যদি রমজান হয়)।
  • কুরআন তিলাওয়াত (মুসলহাফ স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা) থেকে বিরত থাকুন। তবে, ফোনে কুরআন পড়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
  • হায়েজ শেষে গোসল করে বাকি সালাতগুলো আদায় করবেন।

২. যদি স্রাবটি বন্ধ হয়ে যায় এবং আপনি নিশ্চিত হন যে এটি হায়েজ ছিল না (অর্থাৎ, মাত্র কিছুক্ষণের জন্য ছিল), তাহলে:

  • আপনার সালাত শুদ্ধ হয়েছে।
  • পরবর্তী সালাত যথারীতি আদায় করবেন।

৩. ফজরের সালাতের কাজা:

  • যদি আপনি নিশ্চিত হন যে, ফজরের সালাত আদায়ের সময় স্রাব অব্যাহত ছিল (অর্থাৎ, হায়েজ অবস্থায় সালাত আদায় করেছেন), তাহলে সেই ফজরের সালাতটি পুনরায় (কাজা) আদায় করতে হবে হায়েজ শেষে গোসলের পর।
  • যদি স্রাবটি সালাতের সময় বন্ধ ছিল, তাহলে কাজা করতে হবে না।

গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম (হানাফি ফিকহ):

  • হায়েজের সর্বনিম্ন সময়: ৩ দিন (৭২ ঘণ্টা)।
  • হায়েজের সর্বোচ্চ সময়: ১০ দিন।
  • বাদামী বা হলুদ স্রাব: হায়েজের সময়ের মধ্যে (অর্থাৎ, যে সময়ে হায়েজ হওয়ার কথা) দেখা গেলে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। হায়েজের সময়ের বাইরে দেখা গেলে তা হায়েজ নয়।
  • ইস্তিহাযা: হায়েজের নির্ধারিত সময়ের বাইরে রক্ত বা স্রাব দেখা গেলে তা ইস্তিহাযা। ইস্তিহাযা অবস্থায় সালাত, রোজা সবকিছু করা যাবে, তবে প্রত্যেক সালাতের জন্য অজু করতে হবে।

আপনার জন্য পরামর্শ:

১. আপনার হায়েজের অভ্যাস (আদত) মনে রাখুন। যদি আপনার হায়েজ সাধারণত ৫ বা ৬ দিন হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী হিসাব করবেন। ২. বাদামী স্রাব দেখার পর থেকে যদি ৩ দিন বা তার বেশি সময় ধরে স্রাব অব্যাহত থাকে, তাহলে বুঝবেন হায়েজ শুরু হয়েছে। সেই সময়ের মধ্যে আদায়কৃত সালাতগুলো (যদি স্রাব অব্যাহত অবস্থায় আদায় করা হয়) কাজা করতে হবে। ৩. হায়েজ চলাকালীন সালাত, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত (মুসলহাফ স্পর্শ করা) থেকে বিরত থাকুন। তবে, যিকর, দরুদ, দুআ, ইস্তিগফার করতে পারবেন। ৪. হায়েজ শেষে গোসল করে সালাত শুরু করবেন।


দলিল (হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে):

১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):

  • "বাদামী ও হলুদ স্রাব হায়েজের সময়ের মধ্যে দেখা গেলে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৩)
  • "হায়েজ অবস্থায় সালাত আদায় করা হারাম এবং তা আদায় করলে কাজা ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৭)

২. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি):

  • "যদি কোনো নারী হায়েজের সময়ের মধ্যে বাদামী বা হলুদ স্রাব দেখে, তবে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৬)

৩. বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী):

  • "হায়েজের সময়ের মধ্যে বাদামী স্রাব দেখা গেলে তা হায়েজ। আর হায়েজের সময়ের বাইরে দেখা গেলে তা হায়েজ নয়, বরং ইস্তিহাযা।" (বাহিশতী জেওর, ১/৮৫)

৪. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):

  • "হায়েজ অবস্থায় ফোনে কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েয আছে, তবে তা মাকরূহ। কারণ, এতে মুসলহাফ স্পর্শ করা হয় না। তবে, হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকাই উত্তম।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫)

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

  • ফজরের সালাত আদায় করা ঠিক হয়েছিল কি না:

    • যদি স্রাবটি সালাতের সময় অব্যাহত ছিল, তাহলে সালাত শুদ্ধ হয়নি এবং কাজা করতে হবে।
    • যদি স্রাবটি সালাতের সময় বন্ধ ছিল, তাহলে সালাত শুদ্ধ হয়েছে।
  • পরবর্তী সালাত:

    • যদি স্রাব অব্যাহত থাকে এবং ৩ দিন বা তার বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে হায়েজ ধরা হবে। তখন সালাত বন্ধ রাখুন এবং হায়েজ শেষে গোসল করে কাজা আদায় করুন।
    • যদি স্রাব বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে যথারীতি সালাত আদায় করুন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আপনার জন্য দুআ করি, আল্লাহ আপনাকে সহজতা দান করুন এবং আপনার ইবাদতগুলো কবুল করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.