ছেলেদের নামে জমি দলীল করা থাকলে ছেলেরা কি মালিকানা দাবী করতে পারবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
অবশ্য পরবর্তীতে ঐ ব্যক্তির আরেকটি ছেলে জন্মগ্রহন করেছে এবং পরের ছেলে ২০/২২ বছর থাকাকালীণ ঐ ব্যক্তি এবং তাঁর স্ত্রী পরামর্শ করে পরের ছেলের নামে অন্য অংশ থেকে ৬ শতাংশ জায়গা দলিল করিয়ে দেন এই চিন্তা করে যে, বড় ছেলের নামে ১১ শতাংশ দলীল আছে, ছোট ছেলের নামেও কিছু জায়গা দলীল থাক। উক্ত ব্যক্তি এখন আর বেঁচে নেই, তবে তার স্ত্রী বেঁচে আছেন।
এখন প্রশ্ন হলোঃ
(এক) বড় ছেলে কি তার নামে দলীল্কৃত ১১ শতাংশ এবং ছোট ছেলে কি তার নামে দলীলকৃত ৬ শতাংশ জমির মালিকানা দাবী ও ভোগ করতে পারবে?
(দুই) নাকি ছেলেরা বাবার মীরাছ হিসেবে অন্য ওয়ারিশ গনকে এই জমিগুলো থেকেও ভাগ দিতে হবে?
(তিন) যেহেতু মা বেঁচে আছেন, মা জমি দুটি দাবী করলে ছেলেরা মাকে জমি দুটি দিয়ে দিতে কি বাধ্য?
Answer
ছেলেদের নামে দলিলকৃত জমির মালিকানা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
ভূমিকা
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামী আইনে দলিল বা রেজিস্ট্রি করা জমির মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি রয়েছে। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
১. পিতা তার ৪/৫ বছরের ছেলের নামে ১১ শতাংশ জমি ক্রয় করে দলিল করেন। ২. পরে আরেক ছেলের নামে ৬ শতাংশ জমি দলিল করেন। ৩. পিতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জমি ফিরিয়ে নেননি বা ছেলেকে দান করার কথাও স্পষ্টভাবে বলেননি। ৪. এখন প্রশ্ন: ছেলেরা কি এই জমির মালিকানা দাবি করতে পারবে? নাকি এটি মীরাছ হিসেবে বণ্টন হবে?
(এক) ছেলেরা কি দলিলকৃত জমির মালিকানা দাবি করতে পারবে?
হানাফী ফিকহের মূলনীতি
উত্তর: জ্বী, ছেলেরা তাদের নামে দলিলকৃত জমির মালিকানা দাবি করতে পারবে এবং ভোগ করতে পারবে। তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে।
দলিল:
১. দলিল করাই দান/হেবার প্রমাণ: ইসলামী ফিকহে যখন কোনো ব্যক্তি তার সন্তানের নামে জমি ক্রয় করে দলিল করেন, তখন তা সাধারণত হেবা (দান) হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, দলিল দলিলকারীর পক্ষ থেকে দান করার ইঙ্গিত বহন করে।
২. কব্জা (দখল) এর শর্ত: হানাফী ফিকহে হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য কব্জা (দখল) অপরিহার্য। কিন্তু নাবালেগ সন্তানের ক্ষেত্রে পিতার পক্ষ থেকে দলিল করাই কব্জা হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, পিতা তার নাবালেগ সন্তানকে দান করলে কব্জা শর্ত নয়, কারণ পিতাই সন্তানের অভিভাবক।
قال الإمام السرخسي: "إذا وهب الأب لولده الصغير شيئاً جاز، ولا يشترط القبض؛ لأن يد الأب كيد الولد"
সারাখসী (রহ.) বলেন: "পিতা তার নাবালেগ সন্তানকে কিছু দান করলে তা বৈধ, এবং কব্জা শর্ত নয়; কারণ পিতার হাত সন্তানের হাতের মতোই।" (المبسوط, ১২/৪৮)
৩. দীর্ঘ সময় ধরে দখলে থাকা: ছেলেরা দীর্ঘ ২৫/৩০ বছর ধরে জমির দখলে ছিল (বা পিতার মাধ্যমে তাদের পক্ষে দখল ছিল)। পিতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জমি ফিরিয়ে নেননি। এটি দান সম্পূর্ণ হওয়ার আরেকটি প্রমাণ।
৪. ফাতাওয়া উসমানী তে উল্লেখ আছে:
"اگر باپ نے بیٹے کے نام زمین خرید کر اس کا قبضہ بھی دے دیا یا بیٹا نابالغ تھا تو باپ کا قبضہ ہی بیٹے کا قبضہ سمجھا جائے گا، اور یہ ہبہ مکمل ہو جائے گا۔"
"যদি পিতা ছেলের নামে জমি ক্রয় করে তার দখলও দিয়ে দেন, অথবা ছেলে নাবালেগ ছিল (তাহলে পিতার দখলই ছেলের দখল গণ্য হবে), এবং এতে হেবা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।"
তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
ক. পিতার নিয়ত: যদি প্রমাণিত হয় যে, পিতা শুধুমাত্র ভাইয়ের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষার জন্য ছেলের নামে দলিল করেছিলেন (অর্থাৎ প্রকৃত দান করার নিয়ত ছিল না), তাহলে এটি "হেবা বিল ইওয়াজ" বা প্রকৃত দান হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু যেহেতু পিতা দীর্ঘ সময় ধরে জমি ফিরিয়ে নেননি এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেলেকে জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করেননি, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি দান হিসেবেই গণ্য হবে।
খ. ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, পিতা যদি নাবালেগ সন্তানকে দান করেন এবং কব্জা না দেন, তাহলে দান সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু এখানে যেহেতু ছেলেরা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় জমির দখলে ছিল (বা পিতার মাধ্যমেই তাদের পক্ষে দখল ছিল), তাই ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত অনুযায়ীও দান সম্পূর্ণ হয়েছে।
রদ্দুল মুহতার এর উদ্ধৃতি:
"ولو وهب الأب لابنه الصغير شيئاً صح عند أبي حنيفة وأبي يوسف، وعند محمد لا يصح حتى يقبض، لكن إذا بلغ الابن وسكت الأب عن الرجوع صحت الهبة عند الكل"
"পিতা তার নাবালেগ ছেলেকে কিছু দান করলে তা আবু হানীফা (রহ.) এবং আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে সহীহ হয়। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে কব্জা না হওয়া পর্যন্ত সহীহ হয় না। কিন্তু ছেলে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পরও পিতা ফিরিয়ে না নিলে সবার মতে হেবা সহীহ হয়ে যায়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫১৩)
(দুই) মীরাছ হিসেবে অন্য ওয়ারিশদের ভাগ দিতে হবে কি?
উত্তর: না, দলিলকৃত জমি মীরাছের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কারণ দলিলের মাধ্যমে জমিটি ছেলেদের মালিকানায় চলে গেছে। মীরাছ শুধুমাত্র মৃত ব্যক্তির মালিকানায় থাকা সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
قال تعالى: "لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ" (النساء: ৭)
"পুরুষদের জন্য অংশ রয়েছে যা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।"
এই আয়াতে "مَا تَرَكَ" (যা রেখে গেছে) দ্বারা বোঝানো হয়েছে মৃত ব্যক্তির মালিকানায় থাকা সম্পত্তি। যেহেতু দলিলকৃত জমি ছেলেদের মালিকানায় চলে গেছে, তাই এটি মীরাছের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
ফাতাওয়া আলমগীরী তে আছে:
"إذا كان الأب قد ملك الابن داراً أو أرضاً بالشراء أو الهبة، فلا تدخل في تركة الأب بعد وفاته"
"যদি পিতা ছেলেকে ঘর বা জমি ক্রয় বা দানের মাধ্যমে মালিক করে দেন, তাহলে তা পিতার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির (তরিকা) অন্তর্ভুক্ত হবে না।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৪/১৮৫)
ইমদাদুল ফাতাওয়া তে আছে:
"باپ نے اپنی زندگی میں بیٹے کے نام زمین لکھ دی، تو یہ زمین بیٹے کی ملکیت ہے، باپ کے مرنے کے بعد یہ ورثہ میں نہیں آئے گی۔"
"পিতা জীবদ্দশায় ছেলের নামে জমি লিখে দিলে তা ছেলের মালিকানা হবে, পিতার মৃত্যুর পর তা মীরাছের অন্তর্ভুক্ত হবে না।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩০৫)
(তিন) মা জমি দাবি করলে ছেলেরা কি মাকে জমি দিতে বাধ্য?
উত্তর: না, ছেলেরা মাকে দলিলকৃত জমি দিতে বাধ্য নয়। কারণ এটি ছেলেদের নিজস্ব সম্পত্তি, মায়ের মীরাছের অংশ নয়। তবে মা যদি অভাবগ্রস্ত হন এবং ছেলেদের সামর্থ্য থাকে, তাহলে ইসলামী নৈতিকতা অনুযায়ী ছেলেদের উচিত মায়ের ভরণপোষণ করা। কিন্তু আইনত দলিলকৃত জমি থেকে মাকে অংশ দিতে বাধ্য নয়।
তবে, পিতার মৃত্যুর পর পিতার অন্যান্য সম্পত্তি (যা দলিল করা হয়নি) থাকলে, তা থেকে মা তার মীরাছের অংশ (১/৮) পাবেন।
قال تعالى: "وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِنْ لَمْ يَكُنْ لَكُمْ وَلَدٌ فَإِنْ كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمْ" (النساء: ১২)
"আর স্ত্রীদের জন্য রয়েছে তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ, যদি তোমাদের সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তাহলে তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ।"
অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. পিতার অন্যান্য সম্পত্তি: পিতার যে সম্পত্তি দলিল করা হয়নি, তা মীরাছ হিসেবে বণ্টন হবে। সেখানে ৫ মেয়ে, ২ ছেলে এবং স্ত্রী অংশ পাবেন।
২. মীরাছের হিসাব: পিতার দলিলবিহীন সম্পত্তি থেকে স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ। বাকি ৭/৮ অংশ সন্তানদের মধ্যে বণ্টন হবে। ইসলামী আইনে ছেলেরা মেয়েদের দ্বিগুণ পাবে (ছেলে : মেয়ে = ২ : ১)।
৩. দলিলের বৈধতা: দলিলটি যদি সঠিকভাবে রেজিস্ট্রার্ড হয়ে থাকে এবং কোনো জালিয়াতি প্রমাণিত না হয়, তাহলে তা বৈধ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. বড় ছেলে ১১ শতাংশ এবং ছোট ছেলে ৬ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি ও ভোগ করতে পারবে। কারণ দলিলের মাধ্যমে জমি তাদের মালিকানায় চলে গেছে এবং পিতা দীর্ঘ সময় ধরে তা ফিরিয়ে নেননি।
২. দলিলকৃত জমি মীরাছের অন্তর্ভুক্ত হবে না। এটি ছেলেদের নিজস্ব সম্পত্তি। তবে পিতার অন্যান্য সম্পত্তি থাকলে তা মীরাছ হিসেবে বণ্টন হবে।
৩. মা দলিলকৃত জমি দাবি করলে ছেলেরা দিতে বাধ্য নয়। তবে পিতার অন্যান্য সম্পত্তি থেকে মা তার মীরাছের অংশ (১/৮) পাবেন।
উল্লেখ্য: যদি কোনো পক্ষ আদালতে গিয়ে প্রমাণ করতে পারে যে, দলিলটি প্রকৃত দানের উদ্দেশ্যে নয়, বরং ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষার জন্য ছিল, তাহলে বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে বাহ্যিক দলিলই প্রমাণ হিসেবে গণ্য।
والله أعلم بالصواب