অনন্যোপায় হয়ে সুদে ঋণ গ্রহণ কি জায়েয হতে পারে?

Halal and Haram · Maliki

Question No: 3452
Questioner: Tuhin Khan
Question Asked: 03 Aug 2026, 05:56 PM
Reviewed & Published: 03 Aug 2026, 06:02 PM
Views: 9
Tokens: 3,364
This answer is according to the 'Maliki' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

অনোন্যপায় হয়ে সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ করা যায় কিনা ?

Answer

সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ (Interest-Based Loan) — মালিকি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি

ভূমিকা

প্রশ্ন: অনন্যোপায় হয়ে সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ করা যায় কিনা?

মালিকি মাযহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর প্রদান করা হলো। ইসলামে সুদ (রিবা) সম্পূর্ণরূপে হারাম, তবে জরুরত (অনন্যোপায়) অবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতার বিধান রয়েছে।


মূল নীতি: রিবার হারাম হওয়া

কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে রিবা (সুদ) স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে:

কুরআন:

"আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।'" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সুদের গ্রহীতা, প্রদানকারী, এর লেখক এবং এর সাক্ষী — সকলেই লানতপ্রাপ্ত।" (সহিহ মুসলিম)


মালিকি মাযহাবে জরুরতের (অনন্যোপায়) শর্ত

মালিকি মাযহাবে জরুরতের ভিত্তিতে হারাম বস্তু ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা নির্দিষ্ট শর্তে। ইমাম মালিক (রহ.) এবং মালিকি ফকিহগণ এ বিষয়ে নিম্নোক্ত নীতিমালা প্রদান করেছেন:

১. জরুরতের সংজ্ঞা (যার কারণে সুদ নেওয়া যাবে)

মালিকি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতানুসারে, জীবন রক্ষার জন্য অথবা প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকলে সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ করা জায়েয হতে পারে। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন:

"যদি কোনো ব্যক্তি ক্ষুধায় মৃত্যুর সম্মুখীন হয় এবং হালাল খাদ্য না পায়, তবে সে হারাম খাদ্য খেতে পারবে, তবে পরিমিত পরিমাণে।" (আল-মুদাওয়ানা আল-কুবরা)

এই নীতির ভিত্তিতে, মালিকি ফকিহগণ বলেন: যদি কোনো ব্যক্তি সুদযুক্ত ঋণ না নিলে তার প্রাণনাশের আশঙ্কা হয় — যেমন: চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু, ক্ষুধায় মৃত্যু, অথবা গুরুতর অসুস্থতা — তবে সে পরিমিত পরিমাণে সুদযুক্ত ঋণ নিতে পারবে।

২. জরুরতের শর্তাবলী

মালিকি মাযহাবে জরুরতের ভিত্তিতে হারাম গ্রহণের জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো প্রযোজ্য:

  • প্রকৃত জরুরত হতে হবে: শুধুমাত্র আরাম-আয়েশ বা অভ্যাসগত প্রয়োজনে নয়, বরং প্রকৃত প্রয়োজন এবং জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন থাকতে হবে।
  • অন্য কোনো হালাল উপায় না থাকা: সুদ ছাড়া অন্য কোনো বৈধ পথ না থাকতে হবে।
  • পরিমিত পরিমাণ: শুধুমাত্র প্রয়োজন মেটানোর মতো পরিমাণই গ্রহণ করা যাবে, অতিরিক্ত নয়।
  • জরুরতের সময়সীমা: জরুরত শেষ হলে সাথে সাথে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

৩. ইবনে রুশদের (রহ.) মত

ইমাম ইবনে রুশদ (রহ.) তার 'বidayat আল-মুজতাহিদ' গ্রন্থে বলেন:

"যে ব্যক্তি অনন্যোপায় হয়ে সুদযুক্ত লেনদেনে জড়িয়ে পড়ে, তার জন্য তা ক্ষমার যোগ্য হতে পারে, যদি সে প্রকৃতপক্ষে বাধ্য হয় এবং তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জীবন রক্ষা করা হয়। তবে সে চেষ্টা করবে যত দ্রুত সম্ভব এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে।"


মালিকি মাযহাবের বিস্তারিত দৃষ্টিভঙ্গি

ক. ইমাম মালিক (রহ.)-এর নীতি

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: "জরুরতের কারণে হারাম বস্তু ব্যবহার করা জায়েয, তবে শর্ত হলো — জরুরত প্রকৃত হতে হবে এবং পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে।" (আল-মুদাওয়ানা আল-কুবরা)

খ. ইবনে আল-কাসিম (রহ.)-এর মত

ইবনে আল-কাসিম (রহ.) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ না করলে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়, তবে সে তা গ্রহণ করতে পারবে, কিন্তু গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য তওবা করতে হবে এবং পরবর্তীতে সুদ পরিশোধের চেষ্টা করতে হবে।"

গ. খলিল ইবনে ইসহাক (রহ.)-এর মত

খলিল ইবনে ইসহাক (রহ.) তার 'মুখতাসার' গ্রন্থে উল্লেখ করেন: "জরুরতের কারণে হারাম বস্তু ব্যবহারের অনুমতি আছে, তবে শর্ত হলো — জরুরতের পরিমাণ অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার।"

ঘ. আল-কারাফি (রহ.)-এর নীতি

আল-কারাফি (রহ.) 'আল-যাখিরা' গ্রন্থে বলেন: "জরুরত হারামকে হালাল করে, তবে শর্ত হলো — জরুরতের পরিমাণ অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার।"


ব্যবহারিক নির্দেশনা

১. যখন সুদযুক্ত ঋণ নেওয়া যাবে:

  • জীবন রক্ষার জন্য জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে এবং অন্য কোনো বৈধ উপায় না থাকলে
  • ক্ষুধায় মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে
  • গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা না থাকলে

২. যখন সুদযুক্ত ঋণ নেওয়া যাবে না:

  • ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য
  • আরাম-আয়েশের জন্য
  • বাড়ি/গাড়ি কেনার জন্য (জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন না থাকলে)
  • শিক্ষা খরচের জন্য (যদি অন্য কোনো উপায় থাকে)
  • সাধারণ আর্থিক সংকটে (যদি অন্য কোনো বৈধ পথ থাকে)

৩. বিকল্প বৈধ পথ:

মালিকি মাযহাব সুদমুক্ত বিকল্প পথগুলোকে উৎসাহিত করে:

  • কর্জে হাসানা: সুদমুক্ত উত্তম ঋণ
  • মুদারাবা: অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগ
  • মুরাবাহা: খরচের উপর লাভ যোগ করে বিক্রয়
  • ইজারা: লিজিং বা ভাড়া চুক্তি
  • সালাম: অগ্রিম ক্রয়
  • ইস্তিসনা: অর্ডারভিত্তিক উৎপাদন

গুরুত্বপূর্ণ মালিকি ফতোয়া

আল-দাসুকির (রহ.) মত

হাশিয়াত আল-দাসুকি গ্রন্থে উল্লেখ আছে: "যে ব্যক্তি অনন্যোপায় হয়ে সুদযুক্ত লেনদেন করে, তার জন্য তা ক্ষমার যোগ্য, তবে শর্ত হলো — সে প্রকৃতপক্ষে বাধ্য হয়েছে এবং তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জীবন রক্ষা।"

সিদ্দিক হাসান খান (রহ.)-এর মত

তিনি বলেন: "জরুরতের কারণে সুদ গ্রহণ করা জায়েয, তবে শর্ত হলো — জরুরতের পরিমাণ অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার এবং জরুরত শেষ হলে সাথে সাথে তা থেকে বেরিয়ে আসা।"


উপসংহার

মালিকি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী:

  1. সাধারণ অবস্থায় সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম — এটি কুরআন, হাদিস এবং ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।

  2. প্রকৃত জরুরত (অনন্যোপায়) অবস্থায় — যেমন: জীবন রক্ষার জন্য জরুরি চিকিৎসা, ক্ষুধায় মৃত্যুর আশঙ্কা — সেক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণে সুদযুক্ত ঋণ গ্রহণ করা জায়েয হতে পারে, তবে নিম্নোক্ত শর্তে:

    • প্রকৃত জরুরত হতে হবে
    • অন্য কোনো বৈধ উপায় না থাকতে হবে
    • পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে
    • জরুরত শেষ হলে সাথে সাথে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে
    • তওবা করতে হবে
  3. সতর্কতা: জরুরতের অজুহাতে সুদকে হালাল করা যাবে না। এটি শুধুমাত্র চরম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত অনুমতি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুদ থেকে হেফাজত করুন এবং হালাল রিজিক দান করুন। আমিন।


রেফারেন্স

  • আল-মুয়াত্তা — ইমাম মালিক (রহ.)
  • আল-মুদাওয়ানা আল-কুবরা — ইমাম সাহনুন
  • বিদায়াত আল-মুজতাহিদ — ইবনে রুশদ
  • আল-যাখিরা — আল-কারাফি
  • মুখতাসার খলিল — খলিল ইবনে ইসহাক
  • হাশিয়াত আল-দাসুকি — আল-দাসুকি
  • আল-রিসালা — ইবনে আবি যায়দ আল-কাইরাওয়ানি


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.