স্বামী গায়রে মাহরামের সাথে কথা বললে করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
আমার বিয়ে হয়েছে 3 বছর। আমার স্বামী মাহরাম,গায়রে মাহরাম মেনে চলে না, বিশেষ করে তার ভাবীর সাথে ।
এই ৩ বছর যাবৎ তাকে আমি না করেছি, বলেছি এটা হারাম... কিন্তু তিনি বুঝেতো না ই উল্টো আমাকে এটার জন্য অনেক খারাপ ভাবে, মনে করে আমি তাঁদের সাথে হিংসা করি,স্বামীকে অকারণে সন্দেহ করি, তার পরিবারের মানুষদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করি...।
এমনিতে তিনি বাকি সবদিকে ভালোই আছেন কিন্তু তিনি কাজে একটু ব্যাস্ত থাকেন আর এই অজুহাতে আমাকে একটু সময় কম দেন প্রতিদিন কথা বলেন কিন্তু আমি জানি তিনি আরো একটু বেশি সময় আমাকে দিতে পারতেন,তিনি প্রবাসী,তাই জদিও আমারও সবর করে থাকতে কষ্টহয় কিন্তু তাকে বলার পর ও বুঝেনা
তার এ গায়রে মাহরামদের সাথে কথা বলাও খারাপ উদ্দেশ্যে না তিনি এটাকে প্রয়োজন মনে নে করে বলেন । তিনি তাদের সাথে দেখা হলে কথা বলে, কল দিয়ে কথা বলে এবং মনে করে তারা তার পরিবারের মানুষ এটাই তার করা উচিত, আর তারাও তাকে অনেক কিছু করেছে তাই এটা তার দায়িত্ব।
আমার বড়জা আর আমার স্বামী সমবয়সী, অনেক ভালো সম্পর্ক ছিলো তাঁদের আগে এখন একটু কম কল দেয় কিন্তু তাও মাসখানেক পর সম্ভবৎ কথা বলেন ,খারাপ সম্পক না বড়ো ভাবি হিসেবেই মনে করেন আর তার ভাতিজিদের অনেক আদর করেন ওদের সাথেও কথা বলার জন্য কল দিয়ে ভাবি সহ ওদের সাথে বলেন জপিডিও ভাই বাসায় থাকে আমি হপলি ভাইকে কল দিয়ার ভাই ভাতিজিদের সাথে কথা বিফলতে কিন্তু তিনি এটা ন একরে ভাবিকে কল দেয় , কিন্তু আমার বড়োজা কে আমি খেয়াল করেছি তিনি আমার স্বামী কে বাকিদের থেকে একটু বেশিই ক্লোজ ভাবে,আমাকেও তিনি অনেক হিংসা করেন,
তো কিছুদিনের আগে আমার বড়োজা র আমার স্বামীকে নিয়ে ফেসবুকে আবেগী ২টা পোস্ট দেখি,আমি দেখে আমার স্বামীকে মন খারাপ করে বলেছি যে তিনি যদি তার সাথে আর কল দিয়ে কথা বলে তাহলে আল্লাহর কসম* আমিই আর তার সাথে কলে কথা বলবোনা,
কিন্তু একথা বলায় এখন তিনি আমাকে আর কল দেননা মেসেজ করে অল্প কথা বলে কেবল। যদিও আমি তাকে মাসআলা পাঠিয়েছি দেবর ভাবি সম্পর্কে আর আপনিই বলুন একটা নারী হয়ে স্বামী গায়রে মাহরাম মেয়েদের সাথে ফ্রিলি কথা বলবে এটা কিভাবে সহ্য করা সম্ভব আর তিনিতো এটাকে গুনাহ মনে করছেন ইনা উল্টো করণীয় মনে করেন , বিশেষ জরুরতে কথা বলা জায়েজ আছে এটা ধরে নিয়ে বলে যে প্রয়োজনেই কথা বলে অপ্রয়োজনে বলে না, তার হিসাব সে দিবে, আমি যেন এগুলা না বলি, আর এগুলা নিয়ে মাঝে মাঝেই তিনি আমার সাথে কথা বলা বন্ধ রাখেন । কিন্তু তিনি যদি কল দেন তখন আমি কি করবো কথা বলা জায়েজ হবে? তিনি আমার শর্ত মেনে নেন নি।
আমি কসম করেছি, আমি এগুলা আর মানতে পারছিনা দেখেই কসম করে বলেছি,
এখন আমার সত্যিই করনীয় কি?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তরটি সংক্ষেপে:
আপনার স্বামীর জন্য গায়রে মাহরাম (যেমন: ভাবি, দেবর-ভাবির সম্পর্ক) মহিলাদের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, কল করা, বা আবেগপূর্ণ সম্পর্ক রাখা হারাম। এটি ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে আপনার করণীয় হলো:
১. ধৈর্য ধারণ করা এবং উত্তম পদ্ধতিতে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করা।
২. কসম ভঙ্গের কাফফারা দেওয়া, কারণ আপনি যে শর্তে কসম করেছেন তা মানা আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এটি শরীয়তসম্মতও নয়।
৩. স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার বজায় রাখা এবং তাকে দ্বীনের সঠিক পথে আনার চেষ্টা করা।
৪. প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের বা আলেমের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানো।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলার বিধান:
কুরআন ও হাদিসের আলোকে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, কথা বলা, বা সম্পর্ক রাখা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাৎ না করে। কারণ, তৃতীয় জন তখন শয়তান।" (সহিহ বুখারী: ৩০০৬)
তাই আপনার স্বামীর জন্য ভাবির সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, কল করা, বা আবেগপূর্ণ সম্পর্ক রাখা হারাম। এটি কোনোভাবেই "প্রয়োজন" বা "পারিবারিক দায়িত্ব" হিসেবে গণ্য হবে না। প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও শরীয়তের নির্ধারিত সীমা মেনে চলতে হবে (যেমন: প্রয়োজনীয় কথা বলা, কিন্তু আবেগ বা ফ্রি মেলামেশা নয়)।
২. আপনার কসমের বিধান:
আপনি কসম করেছেন যে, স্বামী যদি ভাবির সাথে কথা বলে, তবে আপনি তার সাথে কথা বলবেন না। কিন্তু এই শর্তটি শরীয়তসম্মত নয়, কারণ:
- স্বামীর সাথে কথা না বলা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং এটি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি এমন বিষয়ে কসম করে যা আল্লাহর আনুগত্যের বিপরীত, তার জন্য আল্লাহর আনুগত্য করা জরুরি এবং কসম ভঙ্গ করা জায়েয।" (সহিহ মুসলিম: ১৬৫০)
তাই আপনার কসম ভঙ্গ করা জায়েয এবং এর জন্য কাফফারা (দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো বা তাদের পোশাক দেওয়া, অথবা একটি দাস মুক্ত করা; যদি সামর্থ্য না থাকে তবে তিন দিন রোজা রাখা) দেওয়া আবশ্যক।
৩. স্বামীর সাথে আচরণের নিয়ম:
- ধৈর্য ও হিকমত অবলম্বন করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"নারীদের সাথে সদ্ব্যবহারের ওসিয়ত করো।" (সহিহ বুখারী: ৩৩৩১)
-
স্বামীকে ভালোবাসা ও নরম ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করুন। তাকে বলুন যে, এটি আল্লাহর বিধান এবং এর কারণে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানে ক্ষতি হবে।
-
প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের বা স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে তাকে বোঝান।
৪. স্বামীর করণীয়:
- স্বামীর জন্য গায়রে মাহরাম মহিলাদের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, কল করা, বা সম্পর্ক রাখা হারাম।
- তাকে উচিত তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- প্রয়োজনের ক্ষেত্রে (যেমন: পারিবারিক জরুরি বিষয়) তিনি সংক্ষিপ্ত ও সীমিতভাবে কথা বলতে পারেন, তবে আবেগ বা ফ্রি মেলামেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৫. আপনার করণীয়:
- কসম ভঙ্গের কাফফারা দিন।
- স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার বজায় রাখুন এবং তাকে দ্বীনের পথে আনার চেষ্টা করুন।
- ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।
- প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের বা আলেমের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।
আমিন।