কারও বিয়ের ভিডিও সম্পর্কে রিপোর্ট করা

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3434
Questioner: Mahzabin Mimmi
Question Asked: 03 Aug 2026, 05:21 AM
Reviewed & Published: 03 Aug 2026, 05:30 AM
Views: 15
Tokens: 9,776
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মুহতারাম মুফতি সাহেব, আসসালামু আলাইকুম।
আমি একটি পারিবারিক ও শরয়ী বিষয়ে আপনার কাছে ফতোয়া বা সঠিক দিকনির্দেশনা আশা করছি। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
আমার এক খালাতো ভাইয়ের পরিবারের সাথে আমাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন রয়েছে। তাদের দিক থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা থাকলেও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার তাগিদে আমরা সবসময়ই ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছি। তারা কিছুটা দ্বীন পালন করলেও তাদের মধ্যে শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ বুঝ নেই।
সম্প্রতি আমার সেই খালাতো ভাই তার বিয়ের কয়েকটি ভিডিওসহ অন্যান্য কিছু ভিডিও ইউটিউবে 'পাবলিক' করে দেয়। ভিডিওটিতে গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ফ্রি-মিক্সিং) এবং নারীদের বেপর্দা দৃশ্য ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আমি বর্তমানে কঠোরভাবে পর্দা পালন করি (এমনকি গাইরে মাহরামের সামনে কণ্ঠের পর্দাও রক্ষা করি)। কিন্তু ওই ভিডিওটিতে আমার আগের কিছু বেপর্দা, সাজগোজ করা,ফ্রিমিক্সিং এবং নাচানাচির দৃশ্য ছিল।
ভিডিওটি পাবলিক হওয়ার পর আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। আমি অনুরোধ করি যেন আমার পর্দার স্বার্থে ভিডিওটি ডিলিট করে দেওয়া হয় অথবা অন্তত প্রাইভেট করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা আমার কথায় কোনো কর্ণপাত করেনি এবং কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি।
এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর আমি মানসিকভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়ি। নিরুপায় হয়ে আমি আল্লাহর কাছে দরূদ, দোয়া ও ইস্তিগফার করি এবং ইউটিউবে শুধুমাত্র আমার উপস্থিতির সময়গুলো উল্লেখ করে রিপোর্ট করি। আমি মূলত আমার দৃশ্যগুলো সরানোর জন্যই রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তাদের চ্যানেল থেকে পুরো ভিডিওটিই ডিলিট করে দেয়। কাকতালীয়ভাবে তাদের কাছে ওই ভিডিওটির কোনো ব্যাকআপও ছিল না।
এই ঘটনার পর তারা বিষয়টি জানতে পেরে আমার ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারা আমাকে নানাভাবে বাজে কথা বলছে, অপবাদ দিচ্ছে এবং এর ফলে আমার মা-ও কান্নাকাটি করছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো আচরণ করছে।
এমতাবস্থায় আমার জানার বিষয় হলো:
১. নিজের পর্দার সুরক্ষার জন্য আমি যে রিপোর্ট করেছি এবং এর ফলে তাদের পুরো ভিডিওটি ডিলিট হয়ে গেছে— এতে কি আমার কোনো গুনাহ হয়েছে বা আমি কি কারো হক নষ্ট করেছি?
২. এই ঘটনার জের ধরে তারা যদি আমার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে বা খারাপ আচরণ করে, তবে ইসলামি শরীয়তে এর দায়ভার কার ওপর বর্তাবে? এক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ থাকব।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে এর উত্তর প্রদান করা হলো:

১. রিপোর্ট করার কারণে আপনার গুনাহ হয়েছে কি?

উত্তর: আপনার কাজটি শরীয়তসম্মত এবং প্রশংসনীয়। আপনার কোনো গুনাহ হয়নি, বরং আপনি একটি ওয়াজিব (আবশ্যক) কাজ করেছেন।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

ক) পর্দা রক্ষা করা ফরজ: আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

খ) গুনাহের প্রচার নিষিদ্ধ: আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ "যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।" (সূরা আন-নূর: ১৯)

গ) অন্যায় কাজ প্রতিরোধ করা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজ দেখে, সে যেন তা নিজ হাতে প্রতিরোধ করে।" (সহীহ মুসলিম: ৪৯)

ঘ) ফতোয়ায়ে উসমানী তে উল্লেখ আছে যে, যদি কেউ কারো গোপনীয়তা বা পর্দা লঙ্ঘন করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে এবং তা গুনাহের কাজ নয়।

মূলনীতি: ইসলামি ফিকহের একটি মূলনীতি হলো:

الضَّرَرُ يُزَالُ "ক্ষতি দূর করতে হবে।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)

আপনি নিজের পর্দা রক্ষার জন্য বৈধ উপায় অবলম্বন করেছেন। প্রথমে আপনি তাদের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলেছেন, অনুরোধ করেছেন। তারা কর্ণপাত না করায় আপনি নিরুপায় হয়ে রিপোর্ট করেছেন। এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রশংসনীয় কাজ।

২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে দায়ভার কার উপর?

উত্তর: যদি তারা আপনার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে বা খারাপ আচরণ করে, তবে এর দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে, আপনার উপর নয়। কারণ আপনি তো সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করেছেন এবং শরীয়তসম্মত উপায়ে নিজের পর্দা রক্ষা করেছেন।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

ক) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৪, সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)

খ) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ "আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর।" (সূরা আন-নিসা: ১)

গ) ফতোয়ায়ে শামী তে উল্লেখ আছে:

مَنْ تَأَذَّى مِنْ الْحَقِّ فَتَأَذِّيهِ لَا يُعْتَدُّ بِهِ "যে ব্যক্তি সত্যের কারণে কষ্ট পায়, তার এই কষ্ট গণ্য করা হবে না।"

আপনার করণীয়:

১. ধৈর্য ধারণ করুন: আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর।" (সূরা আলে ইমরান: ২০০)

২. তাদের সাথে ভালো ব্যবহার চালিয়ে যান: আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ "ভালো ও মন্দ সমান নয়। মন্দের প্রতিকার করুন উত্তম পন্থায়। ফলে আপনার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)

৩. তাদের জন্য দোয়া করুন: তাদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করুন।

৪. আপনার মাকে সান্ত্বনা দিন: তাকে বুঝান যে আপনি সঠিক কাজ করেছেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করুন: তারা ছিন্ন করলেও আপনি সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ وَلَكِنَّ الْوَاصِلَ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا "সে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে প্রতিদান দেয়, বরং সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী যে সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্ত্বেও তা জোড়ে।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৯১)

উপসংহার:

আপনার কাজটি সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত এবং সঠিক ছিল। আপনি নিজের পর্দা রক্ষার জন্য বৈধ উপায় অবলম্বন করেছেন। তাদের ক্ষোভ ও আত্মীয়তা ছিন্ন করার হুমকি আপনার জন্য গুনাহের কারণ নয়, বরং তাদের জন্যই গুনাহ হবে যদি তারা প্রকৃতপক্ষে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার চালিয়ে যান এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.