পরীক্ষার জন্য সুন্নত নামায ছেড়ে দেওয়া যাবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার অনার্স ১ম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। আমার পরীক্ষার প্রস্তুতি একদম ভালো না।পাশ করার মতো অবস্থা আমার নাই।যদি পরীক্ষায় ফেল করি তাহলে পরিবার আমার সাথে ঝামেলা করতে পারে।তারা আবার আমার দ্বীন মেনে চলাকেও দোষারোপ করতে পারে খারাপ ফলাফল এর জন্য। দ্বীন মেনে চলতে আরো বাধাগ্ৰস্ত হতে পারি পরিবার থেকে।আবার বাধাগ্ৰস্ত নাও হতে পারি। এগুলো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার নাও হতে পারে।আল্লাহই ভালো জানেন। আমার পরিবারের দ্বীনের বুঝ নেই।
১)তো এক্ষেত্রে যদি আমি সুন্নত নামাযগুলো ছেড়ে দেই শুধু ফরজ ওয়াজিব পড়ি যাতে পড়াশোনা করার একটু বেশি সময় পাই।এমনটা করা যাবে কি? এক্ষেত্রে সুন্নত নামায ছেড়ে দিলে গোনাহ হবে?
২) সুন্নত নামায ছেড়ে দিলে সময়ের বরকত আরো কমে যাবে,আরো পড়াশোনা ভালোভাবে হবে না এমনটা হবে কি?নাকি সুন্নত নামায পড়লে সময়ের বরকত পাওয়া যাবে,আরো ভালোভাবে পড়াশোনা হবে?নফল নামাজ এখনো পড়ি না।ইংশাল্লহ পরীক্ষার পর থেকে নফল নামাজ পড়া শুরু করবো।
৩) যেহেতু রেজাল্ট ফেল হলে পরিবার ঝামেলা করতে পারে,দ্বীন মেনে চলতে আরো বাধাগ্ৰস্ত হতে পারি, রেজাল্ট ফেল হওয়ার পিছনে তারা দ্বীন মেনে চলাকে দোষারোপ করতে পারে।বলতে পারে যে,এতো নামাজ পড়ি,কুরআন পড়ি তাই পড়াশোনা করার সময় পাই না তাই রেজাল্ট খারাপ।এইসব কারণে আমি কি অন্যের খাতা দেখে লিখতে পারি যাতে আমার ফেল না হয়?
৪) পরীক্ষায় ভালো করার কোনো দোয়া আছে? পড়াশোনা করার চেষ্টা করছি। আমার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমি ফেল করবো।১ম পরীক্ষা টা খারাপ দিয়েছি ।পাশ করার অবস্থা নাই।৪টা বিষয়ে পাশ করতে না পারলে পুরো রেজাল্ট ফেল।১বছর নষ্ট।আমার ইন্টারে ইয়ার ড্রপ দেওয়ার কারণে ১বছর নষ্ট হয়ে গেছে।আমি এইসব নিয়ে চিন্তায় আছি। পরিবারের কথা ভেবে ভয় হচ্ছে পরবর্তীতে আমার কি হবে?আমি ভয়ে আছি। আমার কিছু ভালো লাগতেছে না।আমি কি করতে পারি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় সিস্টার, আপনার উদ্বেগ ও পারিবারিক চাপের বিষয়টি আমরা অনুভব করছি। পরীক্ষা, পড়াশোনার চাপ, আর পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা — এগুলো তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই কষ্টকর। তবে মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কষ্ট দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)। আপনাকে ভয় না পেয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের সমাধান কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হলো।
১) সুন্নত নামায ছেড়ে শুধু ফরজ-ওয়াজিব পড়া যাবে কি? গুনাহ হবে কি?
উত্তর: হানাফি ফিকহের পরিভাষায় সুন্নত নামায প্রধানত দুই প্রকার:
- সুন্নতে মুআক্কাদা: ফজরের ২ রাকাত, যোহরের ৪ রাকাত, মাগরিবের ২ রাকাত এবং এশার ২ রাকাত। এগুলো কোনো ওজর ছাড়া ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ (মাকরূহে তাহরিমি)।
- সুন্নতে গাইরে মুআক্কাদা: যোহরের আগের ৪ রাকাত (আরও কিছু বর্ণনায় ২), আসরের আগে ৪ রাকাত, মাগরিবের পর ২ রাকাত, এশার আগে ২ রাকাত ইত্যাদি। এগুলো ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে না, তবে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে হুকুম: রদ্দুল মুহতার (খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৮) এ ইবনে আবিদীন (রহ.) আল-হিদায়া থেকে উল্লেখ করেছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত সুন্নতে মুআক্কাদাহ ত্যাগ করা মাকরূহে তাহরিমি এবং এতে অবিরত থাকা গুনাহ।"
পড়াশোনাকে কোনো শরিয়তসম্মত ওজর হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ, সারাদিনে এই ১২ রাকাত নামাযের জন্য মাত্র ২০-২৫ মিনিট প্রয়োজন। পড়াশোনার ব্যর্থতা সাধারণত সময়ের অভাবে নয়, বরং পরিকল্পনা ও মনোযোগের অভাবে হয়ে থাকে। তাই সুন্নতে মুআক্কাদা নামায পরীক্ষার অজুহাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তবে সুন্নতে গাইরে মুআক্কাদা (যেমন আসরের আগে ৪ রাকাত ইত্যাদি) পরীক্ষার সময় পড়া না-ও করতে পারেন; এতে কোনো গুনাহ নেই, ইনশাআল্লাহ।
রেফারেন্স - ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি দা. বা.): কিতাবুস সলাত অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, বিদ্যার্থী বা ব্যবসায়ীর জন্য সুন্নতে মুআক্কাদা ত্যাগের অনুমতি নেই; বরং তাদের সময় ব্যবস্থাপনা শিখতে হবে।
২) সুন্নত নামায ছেড়ে দিলে সময়ের বরকত কমে যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, দ্বীনের আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমেই জীবনে বরকত আসে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)। এই আয়াতে "রিজিক" শুধু অর্থ নয়, জ্ঞান, সময় ও সুযোগও অন্তর্ভুক্ত।
বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.) এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবাদতের মাধ্যমে অন্তরের নূর বৃদ্ধি পায় এবং স্মরণশক্তি প্রখর হয়। আপনি যখন সুন্নত নামায পড়বেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবেন, ফলে আপনার অধ্যয়নেও বরকত হবে। বরকতের অর্থ হলো, অল্প সময়ে যা পড়বেন তা আটকে যাবে। সুন্নত নামায পাঠ করলে সময় নষ্ট হবে না, বরং তার বিনিময়ে আল্লাহ তাতে বরকত দেবেন — ইনশাআল্লাহ। তাই সুন্নত নামায হালাকাভাবে ত্যাগ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে আপনি এখন নফল (যেমন তাহাজ্জুদ, ইশরাক) পড়েন না বলে কোনো দোষ নেই, কিন্তু ফরজ ও ওয়াজিবের পাশাপাশি সুন্নতে মুআক্কাদা অবশ্যই সংরক্ষণ করুন। পরীক্ষার পরে নফলের নিয়ত করাই উত্তম যা আপনি করছেন।
৩) "অন্যের খাতা দেখে" (নকল) করা যাবে কি?
উত্তর: কখনোই যাবে না। এটি সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ) এবং একটি বড় গুনাহ।
দলিল: সহীহ মুসলিম (হাদিস: ১৬৪)-এ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা (ধোঁকা) করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।"
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং সকল হানাফি ফকীহগণ (ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ) একমত যে, পরীক্ষায় নকল করা গাদর (বিশ্বাসঘাতকতা) এবং কিতাবত (জালিয়াতি) এর অন্তর্ভুক্ত। এটি আপনার নিজের জ্ঞানের মিথ্যা পরিচয় দেওয়া। ফাতাওয়া আলমগীরি তে উল্লেখ আছে, যে কাজে জনগণের প্রতারণা হয় এবং সমাজের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তা হারাম।
আপনার যুক্তি প্রসঙ্গে: পরিবারের লোকেরা দ্বীন মেনে চলাকে দোষারোপ করতে পারে — এটা তর্কের জন্য ভুল ফতোয়া নেওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে না। দ্বীন মানার কারণে যদি তারা দোষারোপ করে, সেটা তাদের পাপ। আপনার কর্তব্য আল্লাহর বিধান মানা, আর মানুষের কথায় নিজের আখিরাত নষ্ট করা নয়। যদি আপনি নকল করে পাশও করেন, তাহলে সেই ডিগ্রি বৈধ হবে না। ভবিষ্যতে চাকরি বা জীবনে সেই জ্ঞানের দায়িত্ব আল্লাহর কাছে আপনাকে বহন করতে হবে। তাছাড়া, নকল করা অবস্থায় ধরা পড়লে তা মানহানিকর হবে এবং দ্বীনের জন্য আরও খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করবে। তাই এই সংকটময় সময়ে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং পরিশ্রম করা — নকল নয়।
৪) পরীক্ষায় ভালো করার দোয়া ও আপনার করণীয় কী?
একটি বিষয় মনে রাখুন, আপনার ফলাফল ভালো হোক বা খারাপ হোক, এটি আল্লাহর ফয়সালা। আপনি চেষ্টা করবেন, আর বাকি আল্লাহর উপর ভরসা করবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সাথে আচরণ করি।" (বুখারী ও মুসলিম)। তাই নিজেকে দুর্বল ভাববেন না, আল্লাহর রহমতে ভরসা রাখুন।
কয়েকটি দোয়া যা পরীক্ষার আগে, সময় ও পরে পড়তে পারেন:
১. যে কোনো কঠিন কাজে বা পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে:
"رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي"
(উচ্চারণ: রাব্বিশরাহ লি সাদরী, ওয়া ইয়াসসির লি আমরী, ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী, ইয়াফকাহু কাওলী।)
(অর্থ: হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করুন, আমার কাজ সহজ করুন এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করুন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। - সূরা ত্বহা: ২৫-২৮)
২. জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য:
"رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا"
(উচ্চারণ: রাব্বি যিদনী ইলমা। অর্থ: হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। - সূরা ত্বহা: ১১৪)
৩. ফলাফলে ভালো করার জন্য এবং মন থেকে ভয় দূর করার জন্য:
"اللَّهُمَّ لا سَهْلَ إِلا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلاً وَأَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ إِذَا شِئْتَ سَهْلاً"
(উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা জা'আলতাহু সাহলান, ওয়া আনতা তাজ'আলুল হাযনা ইযা শি'তা সাহলান।)
(অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি যা সহজ করেছেন তা ছাড়া কিছুই সহজ নয়। আপনি চাইলে কঠিনকেও সহজ করে দেন। - সহীহ ইবনে হিব্বান)
মানসিক প্রস্তুতি:
- আপনার ১ম পরীক্ষা খারাপ হয়েছে, বাকিগুলো এখনো বাকি। হতাশ না হয়ে ৪টি বিষয়ে মনোযোগ দিন।
- পড়াশোনার পাশাপাশি তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করুন (যদিও নফল, কিন্তু এটিই সঙ্কটকালীন সবচেয়ে বড় অস্ত্র)।
- পরিবারের সাথে কথা বলার সময় নম্র ও সহনশীল থাকুন। তাদের কোনো নেতিবাচক মন্তব্যে নিজের ঈমান দুর্বল হতে দেবেন না। মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.) এর প্রথম খণ্ডে উল্লেখ রয়েছে যে, পরীক্ষা বা দুনিয়াবি মুসিবতে আল্লাহর সাহায্য একান্তই ধৈর্য এবং নামাযের মাধ্যমে পাওয়া যায় (সূরা বাকারা: ১৫৩)।
সিদ্ধান্ত/পরামর্শ:
- সুন্নতে মুআক্কাদা নামায ছাড়বেন না; এতে গুনাহ হবে। সুন্নতে গাইরে মুআক্কাদা ও নফল পড়া কমাতে পারেন।
- নকল সম্পূর্ণ হারাম, কখনো করবেন না।
- বাধাগ্রস্ত হওয়ার ভয়কে কখনো আপনার দ্বীন চর্চার বাধা হতে দেবেন না। আল্লাহই শেষ রক্ষাকর্তা। পরিবার যদি রাগও করে, তবে ধৈর্য ধরুন, আল্লাহ আপনার সাথে আছেন।
- বর্তমান যা আছে তাই নিয়ে পড়ুন, বাকিটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন। আপনার চেয়ে বড় আর কোনো শক্তি নেই আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরীক্ষাকে সহজ করুন, আপনার পড়ায় বরকত দিন এবং আপনার অন্তর থেকে ভয় ও উদ্বেগ দূর করে দেন। আমিন।