তাহাজ্জুদ নামাজ লম্বা কিভাবে করবো
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একই সূরা বার বার পড়া অথবা ১ম রাকাতে এবং ২য় রাকাতে মুখস্থ যে সূরা গুলা আছে এগুলো বার বার পড়া এবং রুকু থেকে দাড়িয়ে রাব্বানা লাকাল হামদ, দুই সিজদার মাঝখানে রাব্বিগফির লি বার বার পড়া।।
এইগুলোও কি মুস্তাহাব হবে?
Answer
তাহাজ্জুদ নামাজ লম্বা করার বিধান ও মুস্তাহাব আমল
প্রশ্ন: তাহাজ্জুদ নামাজ লম্বা করে পড়ার জন্য একই সূরা বারবার পড়া, ১ম ও ২য় রাকাতে মুখস্থ সূরা বারবার পড়া, রুকু থেকে দাঁড়িয়ে "রাব্বানা লাকাল হামদ" এবং দুই সিজদার মাঝখানে "রাব্বিগফির লি" বারবার পড়া—এইগুলো কি মুস্তাহাব হবে?
উত্তর
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল কারিম, আম্মা বাদ।
আপনার প্রশ্নের উত্তরের মূল বিষয় হলো—তাহাজ্জুদসহ নফল নামাজ দীর্ঘ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে তাহাজ্জুদের নামাজ অনেক দীর্ঘ করতেন। তবে কোন কোন কাজ কীভাবে করবেন, তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
১. একই সূরা বারবার পড়া
একই সূরা এক রাকাতে বা একাধিক রাকাতে বারবার পড়া জায়েজ রয়েছে। এমনকি তা দ্বারা নামাজ দীর্ঘ করা যেতে পারে। তবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরা পড়া বেশি উত্তম এবং এতে বৈচিত্র্যও আসে। কিন্তু যদি কারও মুখস্থ কম থাকে, তাহলে একই সূরা বারবার পড়াতে কোনো সমস্যা নেই।
হানাফি ফিকহের দলিল:
রদ্দুল মুহতার (৫/৫০) ও ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (১/৬৮) উল্লেখ আছে—নামাজে একই সূরা বারবার পড়া জায়েজ। ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কেরাতে তারতিব (ধারাবাহিকতা) ওয়াজিব নয়, তাই যেকোনো সূরা যেকোনো রাকাতে পড়া যাবে।
তবে উত্তম হলো কুরআন মাজিদের যেসব সূরা মুখস্থ আছে, সেগুলো থেকে পড়া এবং বিভিন্ন রাকাতে বিভিন্ন সূরা পড়া। অপরদিকে, একই সূরা বারবার পড়াকে কেউ মুস্তাহাব বলেছেন, যদিও তা বিদআত নয়। হাদিসে এসেছে—রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাতুল হাজতে অর্থাৎ তাহাজ্জুদে কখনো কখনো একটি সূরাই বারবার পড়েছেন (আবু দাউদ, হাদিস: ১৩২২)।
২. প্রথম রাকাতে এবং দ্বিতীয় রাকাতে মুখস্থ সূরা বারবার পড়া
নামাজ দীর্ঘ করার উদ্দেশ্যে যেকোনো রাকাতে যেকোনো মুখস্থ সূরা পড়া বৈধ এবং তা দিয়ে লম্বা করা যায়। তবে প্রথম রাকাতে যে সূরা পড়েছেন দ্বিতীয় রাকাতে সেটি না পড়াই বেশি ভালো, কেননা হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অভ্যাস ছিল প্রতি রাকাতে ভিন্ন ভিন্ন সূরা পড়া। কিন্তু যদি কেউ একই সূরা বারবার পড়ে, তবুও নামাজ সহিহ হবে এবং এটি মুস্তাহাব বলেও কোনো মত রয়েছে তবে সতর্কতা হলো—বিভিন্ন সূরা পড়া উত্তম।
দলিল:
সুনানে আবু দাউদ (৮২৪) ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ফজরের নামাজে কখনো কখনো একই সূরা দুই রাকাতে পড়তেন। সুতরাং এতে কোনো গুনাহ নেই।
৩. রুকু থেকে দাঁড়িয়ে "রাব্বানা লাকাল হামদ" বারবার পড়া
রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর "রাব্বানা লাকাল হামদ" বলা ওয়াজিব/সুন্নত। হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, ইমামের জন্য "সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ" এবং মুক্তাদি তথা একাকী নামাজির জন্য "রাব্বানা লাকাল হামদ" বলা ওয়াজিব (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১০৮)। তবে কেউ এই জিকির দীর্ঘ করতে চাইলে অতিরিক্ত পাঠ করতে পারে যেমন—"রাব্বানা লাকাল হামদ, হামদান কাসিরান তাইয়্যিবান মুবারাকান ফিহি"। শুধু "রাব্বানা লাকাল হামদ" বারবার পড়া জায়েজ আছে, কিন্তু এটি মুস্তাহাব নয়, বরং মুস্তাহাব হলো নতুন করে দোয়া ও জিকির করা, যেমন হাদিসে বর্ণিত:
رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ يَقُولُ فِي صَلَاتِهِ حِينَ يَرْفَعُ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ: رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর বলতেন: রাব্বানা লাকাল হামদ, মিলআস সামাওয়াতি ওয়া মিলআল আরদি ওয়া মিলআ মা শি'তা মিন শাইয়িন বাদ।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭৮)
উত্তম পদ্ধতি: রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়া:
رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ، حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ
"রাব্বানা লাকাল হামদ, হামদান কাসিরান তাইয়্যিবান মুবারাকান ফিহি।"
এটি মাসনুন ও মুস্তাহাব।
৪. দুই সিজদার মাঝখানে "রাব্বিগফির লি" বারবার পড়া
দুই সিজদার মাঝখানে বসে "রাব্বিগফির লি" (হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন) পড়া সুন্নত। এটি একবার পড়া সুন্নত, তবে বারবার পড়া এবং এই দোয়া দীর্ঘ করা জায়েজ ও মুস্তাহাব (মুস্তাহাব অর্থাৎ পছন্দনীয়)। কেননা হাদিসে এসেছে:
عَنْ حُذَيْفَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَقُولُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ: رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
"হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ দুই সিজদার মাঝখানে বলতেন: রাব্বিগফির লি, রাব্বিগফির লি।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৭৪; সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১১৪৫)
এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, দুই সিজদার মাঝখানে "রাব্বিগফির লি" বারবার পড়া মুস্তাহাব এবং এতে দীর্ঘ করাও উত্তম। এছাড়া এ সময় অন্য দোয়াও পড়া যায়, যেমন "আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি ওয়াহদিনি ওয়াজবুরনি" ইত্যাদি।
জরুরি নোট (সতর্কতা)
১. ফরজ নামাজে ইমাম যদি মুক্তাদিদের কষ্টের কারণ হয়, তাহলে ছোট করা মুস্তাহাব। কিন্তু নফল/তাহাজ্জুদ নামাজে নিজে একাকী নামাজ আদায়ের সময় দীর্ঘ করা আরও মুস্তাহাব।
২. নামাজ দীর্ঘ করার ক্ষেত্রে সুন্নত পদ্ধতি হলো কেরাতে বিভিন্ন সূরা পড়া, রুকুর তাসবিহ "সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম" তিনবারের বেশি পড়া, সিজদায় "সুবহানা রাব্বিয়াল আলা" তিনবারের বেশি পড়া, বৈঠকে দোয়া ও জিকির দীর্ঘ করা। এগুলো সবই মুস্তাহাব।
৩. বিদআত এড়িয়ে চলা জরুরি—নামাজে এমন কিছু করা বিদআত হবে যা শরিয়ত অনুমোদন করেনি। তবে আপনি যে কাজগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো বিদআত নয়, বরং জায়েজ এবং কিছু কিছু মুস্তাহাব। কঠোরভাবে বলতে গেলে, "রাব্বিগফির লি" বারবার পড়া মুস্তাহাব; একই সূরা বারবার পড়া জায়েজ, তবে মুস্তাহাব তার চেয়ে কম—এতে বৈচিত্র্য আনা উত্তম; "রাব্বানা লাকাল হামদ" বারবার পড়ার চেয়ে বিভিন্ন দোয়া পড়া মুস্তাহাব।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি
| বিষয় | গ্রন্থ | সারমর্ম | |-------|--------|---------| | একই সূরা বারবার পড়া জায়েজ | রদ্দুল মুহতার ১/৪৬৯ | "একই সূরা দুই রাকাতে পড়া জায়েজ" | | তাসবিহ সংখ্যা বৃদ্ধি মুস্তাহাব | ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১০৮ | "রুকু-সিজদায় তাসবিহ তিনবারের বেশি পড়া মুস্তাহাব" | | দুই সিজদার মাঝে দোয়া | আল-হিদায়া ১/৫৬ | "রাব্বিগফিরলি বলা সুন্নত, দীর্ঘ করা মুস্তাহাব" | | নবী ﷺ-এর দীর্ঘ নামাজ | সহিহ মুসলিম ৭৩৮ | "তাহাজ্জুদে নবী ﷺ দীর্ঘ কেরাত পড়তেন" | | মুখস্থ সূরা বারবার পড়া | উসুল শাশী, ফাতাওয়া উসমানি ১/৪০৩ | "তাহাজ্জুদে একই সূরা পড়া জায়েজ, তবে বিভিন্ন সূরা উত্তম" |
সংক্ষিপ্ত উত্তর
মোটকথা: আপনার বর্ণিত কাজগুলো—একই সূরা বারবার পড়া, দুই রাকাতে মুখস্থ সূরা পড়া, রুকু থেকে দাঁড়িয়ে রাব্বানা লাকাল হামদ দীর্ঘ করা, দুই সিজদার মাঝে রাব্বিগফির লি বারবার পড়া—সবগুলো জায়েজ এবং কোনো কোনোটি মুস্তাহাব। তাহাজ্জুদ নামাজ দীর্ঘ করা স্বয়ং মুস্তাহাব। তবে উত্তম হলো—
- একই সূরা বারবার না পড়ে বিভিন্ন সূরা পড়া।
- "রাব্বানা লাকাল হামদ" বারবার না পড়ে বরং পূর্ণাঙ্গ দোয়া পড়া, যেমন: রাব্বানা লাকাল হামদ, হামদান কাসিরান তাইয়্যিবান মুবারাকান ফিহি।
- "রাব্বিগফির লি" বারবার পড়া এবং সাথে অন্যান্য দোয়া যেমন "আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি" পড়া—এটি হাদিসসম্মত ও মুস্তাহাব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নত অনুযায়ী ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
উৎস: কুরআন ও সুন্নাহ, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরী, আল-হিদায়া, ফাতাওয়া উসমানি, ফাতাওয়া ইমদাদিয়া।