কোনো ব্যক্তিকে সামনে না বলে পেছনে তার নাম ধরে লানত করা বা "অমুকের ছেলে অমুকের ওপর লানত" বলার বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আচ্ছা আগেরবারের উত্তরে বলছিলেন লানত আসমানে উঠে যায় হাদিসে আছে।সেক্ষেত্রে একটা মানুষ যদি দিনের পর দিন লানত দেয় সেক্ষেত্রে লানত কতোটা মারাত্মক হয়?
আর কেউ দেখা গেলো সামনে বললো না কিন্তু পিছনে ওই ব্যক্তির নামে লানত দিলো বিনতে বলে পিতার নামসহ তাতেও কি লানত হবে?
জানতে পারলে শরীয়তের আলোকে পুরোপুরি নিশ্চিত হতাম...ধন্যবাদ
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। নিচে আপনার প্রশ্ন দুটির জবাব শরীয়তের আলোকে প্রদান করা হলো।
১. দিনের পর দিন লানত দেওয়া কতটা মারাত্মক?
লানত অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকা। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে লানত করে, সে নিজেই গুনাহগার হয়। হাদিসে এসেছে:
«لَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ»
"মুমিনকে লানত করা তাকে হত্যা করার মতো।" (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৬১০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩০)
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ، فَتُغْلَقُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ دُونَهَا، ثُمَّ تَهْبِطُ إِلَى الْأَرْضِ، فَتُغْلَقُ أَبْوَابُهَا دُونَهَا، ثُمَّ تَأْخُذُ يَمِينًا وَشِمَالًا، فَإِنْ لَمْ تَجِدْ مَسَاغًا رَجَعَتْ إِلَى الَّذِي لَعَنَ، فَإِنْ كَانَ أَهْلًا لِذَلِكَ، وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَى قَائِلِهَا»
"বান্দা যখন কোনো কিছুকে লানত করে, তখন সেই লানত আকাশে উঠে যায়। আকাশের দরজাগুলো তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর তা জমিনে নেমে আসে, জমিনের দরজাগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অতঃপর তা ডানে-বামে ফিরে, যদি কোথাও যাওয়ার জায়গা না পায়, তাহলে তা ফিরে আসে সেই ব্যক্তির ওপর, যে লানত করেছে। যদি সে (লানতকৃত) লানতের উপযুক্ত হয়, তবে তা তার ওপর বর্তায়; অন্যথায় তা উক্ত কারীর ওপরই ফিরে আসে।" (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯০৫; সুনান তিরমিযি, হাদিস: ১৯৭৮)
সুতরাং, যে ব্যক্তি দিনের পর দিন অন্যায়ভাবে কোনো মুসলিমকে লানত দেয়, সে প্রতিদিন একই গুরুতর গুনাহের পুনরাবৃত্তি করছে। অধিকন্তু, যদি লানতকৃত ব্যক্তি লানতের উপযুক্ত না হয় (যেমন সে মুসলিম ও ন্যায়পরায়ণ), তাহলে প্রতিটি লানতই লানতকারীর ওপর ফিরে আসে এবং তা তার নিজের ধ্বংসের কারণ হয়। এটি অত্যন্ত মারাত্মক। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
"لعن المؤمن بغير حق من الكبائر"
"মুমিনকে অন্যায়ভাবে লানত করা কবিরা গুনাহ।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৩)
২. পেছনে নাম ধরে লানত দেওয়া, পিতার নামসহ
কোনো ব্যক্তিকে সামনে না বলে পেছনে তার নাম ধরে লানত করা বা "অমুকের ছেলে অমুকের ওপর লানত" বলা—এটাও স্পষ্ট লানত এবং শরীয়তে হারাম। কারণ লানতের সংজ্ঞায় ব্যক্তি নির্দিষ্ট করা বা না করার কোনো শর্ত নেই। বরং যে কোনোভাবে কোনো মুসলিমকে লক্ষ্য করে লানত করা নিষিদ্ধ। পিতার নাম উল্লেখ করলে সেটি আরও স্পষ্টভাবে সেই ব্যক্তিকেই লক্ষ্য করে। সুতরাং এটিও একই গুনাহ।
হাদিসে এসেছে:
«لَا تَلَاعَنُوا بِلَعْنَةِ اللَّهِ وَلَا بِغَضَبِهِ وَلَا بِالنَّارِ»
"তোমরা আল্লাহর লানত, তাঁর গজব ও জাহান্নাম দিয়ে একে অপরকে লানত করো না।" (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯০৮; সহিহ আত-তিরমিযি)
এছাড়া পেছনে কারো নামে লানত করা গীবতের (পরনিন্দা) সাথেও জড়িত, যা আরও গুরুতর। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا
"তোমাদের কেউ যেন কারও গীবত না করে।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
সুতরাং, সামনে-পেছনে, নাম উল্লেখ করে বা না করে—যেকোনোভাবে কোনো মুসলিমকে লানত করা হারাম। হানাফি ফিকহের কিতাবে বলা হয়েছে:
"لعن المسلم حرام سواء صرح باسمه أو لم يصرح"
"মুসলিমকে লানত করা হারাম, নাম উল্লেখ করুক বা না করুক।" (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/১৫৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১২৩)
উপসংহার
১. দিনের পর দিন লানত করা অত্যন্ত মারাত্মক গুনাহ। প্রতিটি লানতই সম্ভাব্যভাবে লানতকারীর ওপর ফিরে আসে এবং তার জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।
২. পেছনে নাম ধরে বা পিতার নামসহ লানত দেওয়াও একই গুনাহ। এটি গীবত ও লানতের সম্মিলিত পাপ।
৩. মুমিনের উচিত জিহ্বাকে সব ধরনের লানত, গালি, অভিশাপ থেকে রক্ষা করা। প্রয়োজনে দোয়া করা যে, আল্লাহ অন্যায়কারীকে হিদায়াত দিন বা তার থেকে বাঁচান।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারী: কিতাবুল আদাব
- সহিহ মুসলিম: কিতাবুল ঈমান
- সুনান আবু দাউদ: কিতাবুল আদাব
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৬/৪১৩
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ৩/১৫৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলি থানভি): ৪/১২৩