৩ ভরি স্বর্ণ এবং সাথে ১০ হাজার টাকা ১ বছর সময় ধরে নিজের কাছে থাকলে কি যাকাত দিতে হবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
অন্য আর কোন সম্পদ নেই।শুধুমাত্র বেতনের টাকা ৩০ হাজার করে প্রতিমাসে যা খরচ হয়ে যায় মাস শেষে।
Answer
যাকাতের উত্তর
প্রশ্ন:
নিজের কাছে ৩ ভরি স্বর্ণ ও ১০,০০০ টাকা এক বছর ধরে রয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। বেতন মাসে ৩০,০০০ টাকা আসে, কিন্তু তা মাস শেষে খরচ হয়ে যায়। তাহলে কি যাকাত দিতে হবে?
উত্তর
হ্যাঁ, আপনাকে যাকাত দিতে হবে।
কারণ আপনার মোট সম্পদের মূল্য (স্বর্ণের বাজারমূল্য + নগদ ১০,০০০ টাকা মিলে) রূপার নিসাব পরিমাণে পৌঁছেছে অর্থাৎ স্বর্ণের মূল্য এবং টাকা মিলে সম্মিলিত ভাবে ৫২.৫ ভড়ি রূপার সমপরিমাণ হয়েছে এবং তা এক বছর ধরে আপনার কাছে ছিল।তাই আপনার উপর যাকাত ফরয হবে।
নিসাব নির্ধারণ (হানাফী মতে)
হানাফী মতে যাকাতের নিসাব হলো রুপার নিসাব যা ৬১২.৩৬ গ্রাম (৫২.৫ তোলা) রুপার মূল্য। কারণ বর্তমান কাগুজে মুদ্রা ও স্বর্ণ-রুপার সমন্বয়ে নিসাব, হিসাব করতে রুপার নিসাবকেই অধিকাংশ ফিকাহবিদ গ্রহণ করেছেন। (দলিল: ফতোয়া উসমানী, বেহেশতী জেওর, রদ্দুল মুহতার)
আপনার সম্পদের হিসাব
-
১ ভরি = ১১.৬৬ গ্রাম (বাংলাদেশ ও ভারতীয় প্রথা অনুযায়ী)।
আপনার ৩ ভরি স্বর্ণ = ৩ × ১১.৬৬ = ৩৪.৯৮ গ্রাম।
(প্রায় ৩ তোলা) -
ধরা যাক, বর্তমানে স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রতি ভরি ১,৭২,০০০ টাকা (সর্বনিম্ন ক্যারেট বা সনাতন)।
তাহলে ৩ ভরি স্বর্ণের মূল্য = ৩ × ১,৭২,০০০ = ৫,১৬,০০০ টাকা। -
নগদ টাকা = ১০,০০০ টাকা।
মোট সম্পদের বর্তমান মূল্য = ৩,৬০,০০০ + ১০,০০০ = ৫,২৬,০০০ টাকা।
এখন রুপার নিসাব হিসাব করি:
- ধরুন, রুপার বাজারমূল্য প্রতি গ্রাম ২৯৫ টাকা।
তাহলে ৬১২.৩৬ গ্রাম রুপার মূল্য = ৬১২.৩৬ × ২৯৫ = ১৮০,৬৪৬ টাকা।
আপনার মোট সম্পদ (৫,২৬,০০০ টাকা) রুপার নিসাব (১৮০,৬৪৬ টাকা) থেকে অনেক বেশি। তাই যাকাত ফরজ হয়েছে।
সতর্কীকরণ: বাস্তবে স্বর্ণ ও রুপার দাম সময় ও স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। দয়া করে আপনার এলাকার বর্তমান বাজারদর দেখে নিন। তবে মনে রাখবেন, সাধারণত ৩ ভরি স্বর্ণ ও ১০,০০০ টাকা একসাথে হলে তা নিসাবের (রুপা ও স্বর্ণ উভয় নিসাবের) চেয়ে বেশি হয়।
যাকাতের পরিমাণ
- আপনার মোট সম্পদের ২.৫% (২.৫%) হারে যাকাত দিতে হবে।
যেমন: যদি মোট মূল্য ৫,২৬,০০০ টাকা হয়, তাহলে যাকাত = ৫,২৬,০০০ ÷ ৪০ = ১৩,১৫০ টাকা (প্রায়)।
গুরুত্বপূর্ণ দিক
১. স্বর্ণ ও নগদ টাকা একত্রে নিসাব পূর্ণ করবে – হানাফী মতে স্বর্ণ ও নগদ টাকা উভয়ই ‘নকদ’ (হাতের নগদ) হিসেবে গণ্য, তাই এদের মূল্য একসাথে যোগ করে নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত ফরজ হয়।
(সূত্র: আল-হিদায়া, ফতোয়া হিন্দিয়া, ফতোয়া উসমানী)
২. বেতনের টাকা মাস শেষে খরচ হয়ে যায় – যেহেতু এই টাকা জমা থাকে না, তাই তা যাকাতের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে না। শুধু আপনার জমা থাকা স্বর্ণ ও ১০,০০০ টাকা যাকাতযোগ্য।
৩. হাওল (এক বছর) পূর্ণ হওয়া – আপনার স্বর্ণ ও টাকা এক বছর ধরে আপনার মালিকানায় থাকায় হাওল শর্ত পূর্ণ হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
যাকাত দেয়া ফরজ। আপনি আপনার স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য ও নগদ টাকার সমষ্টির ২.৫% যাকাত আদায় করবেন।
উল্লেখ্য: যদি স্বর্ণের মূল্য কম হয় আর রুপার নিসাবও পৌঁছায় না তবুও স্বর্ণের নিজস্ব নিসাব (৮৭.৪৮ গ্রাম বা ৭.৫ তোলা) পৌঁছেনি এবং টাকা কম—এমন খুবই বিরল পরিস্থিতিতে যাকাত ফরজ হবে না। কিন্তু বাস্তবে ৩ ভরি স্বর্ণের মূল্য প্রায় সবসময়ই রুপার নিসাব ছাড়িয়ে যায়।
প্রাসঙ্গিক হানাফী কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): স্বর্ণ-নগদের একত্রীকরণ ও নিসাবের ক্ষেত্রে রুপার নিসাব গ্রহণযোগ্য।
- ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী): “যদি কারো কাছে নিসাবের কম স্বর্ণ ও কিছু নগদ টাকা থাকে এবং উভয়ের মূল্য মিলে রুপার নিসাব পূর্ণ হয়, তাহলে যাকাত ফরজ।”
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানবী): যাকাতের নিসাব রুপার ভিত্তিতে নির্ধারণ করার নির্দেশ।
- শরহু মা'আনিল আছার (ইমাম তাহাবী): সম্পদ মূল্যায়নে রুপার নিসাব গ্রহণের প্রমাণ।