কাউকে ট্রিটমেন্ট করলে তার ইবাদতের সওয়াব পাব কিনা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি মেডিকেলে পড়ছি উম্মাহর কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার নিয়তে, মেয়েদের যেন পর্দার সহিত ট্রিটমেন্ট করতে পারি, কাউকে যেন ট্রিটমেন্ট এর জন্য পর্দা নিয়ে , শরীয়াহর বাইরে ট্রিটমেন্ট এর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হতে না হয়।
১। আমার প্রশ্ন আমি যদি ট্রিটমেন্ট করি তাহলে ওই মানুষ যতদিন ইবাদত করবে আমি কি তার সওয়াবের অংশীদার হব? যেহুতু সে অসুস্থতায় ভালোভাবে ইবাদত করতে পারত না , আল্লাহর রহমতে সে সুস্থ হয়েছে আল্লাহ আমাকে এটার একটা উসিলা হিসেবে কবুল করলেন আমিন!
২। মহিলা রোগীর পর্দা রক্ষা করে ট্রিটমেন্ট করলে সেটার সওয়াব পাব কি?
৩। কাউকে সিরাত, বোরখা হাদীয়া দিলে সেই সিরাত যতজন পড়বে , সেই বোরখা ও যতদিন পড়বে এটার সওয়াব আমি পাব কি?
৪। আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো দ্বীনী কাজ করলে ওই কাজ থেকে সে যতদিন আমল করবে সেটার সওয়াব আমি পাব কি?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার নিয়ত ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মেডিকেল পেশায় থেকে উম্মাহর সেবা করা, বিশেষত মহিলা রোগীদের পর্দার সাথে চিকিৎসা প্রদান করা একটি মহৎ ইবাদত। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে প্রদান করা হলো।
১. আমি যদি ট্রিটমেন্ট করি, তাহলে ওই ব্যক্তি যতদিন ইবাদত করবে, আমি কি তার সওয়াবের অংশীদার হব?
উত্তর:
হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ আপনি তার ইবাদতের সওয়াবের অংশীদার হবেন, যদি আপনার নিয়ত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রোগীর কল্যাণ। কারণ আপনি তার সুস্থতার একটি উপায় (উসিলা) হয়েছেন।
কুরআন:
﴿وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا﴾
"আর যে কেউ একটি জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।" (সূরা আল-মায়েদা: ৩২)
হাদিস:
رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ»
"যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিকে পথ দেখায়, তার জন্য সেই কাজকারীর সমান সওয়াব রয়েছে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৯৩)
হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ উল্লেখ আছে: যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের কারণ বা মাধ্যম হয়, সে তার সওয়াব পায়। (৬/৩৯৪)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি) তে বলা হয়েছে: চিকিৎসকের চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী সুস্থ হয়ে ইবাদত করলে, চিকিৎসকও সেই ইবাদতের সওয়াবের অংশীদার হবেন, যদি তার নিয়ত ইখলাসপূর্ণ হয়। (২/১৮৫)
সারসংক্ষেপ:
আপনার চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী যদি সুস্থ হয়ে ইবাদত করতে সক্ষম হয়, তবে সেই ইবাদতের সওয়াবে আপনি শরিক হবেন। তবে শর্ত হলো, আপনার নিয়ত হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
২. মহিলা রোগীর পর্দা রক্ষা করে ট্রিটমেন্ট করলে সেটার সওয়াব পাব কি?
উত্তর:
অবশ্যই পাবেন। এটি একটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কারণ আপনি একইসাথে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন এবং শরীয়তের পর্দার বিধান রক্ষা করছেন।
হাদিস:
رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «مَنْ صَنَعَ إِلَى امْرَأَةٍ مَعْرُوفًا فَكَأَنَّمَا صَنَعَ إِلَى أُمِّهِ»
"যে ব্যক্তি কোনো মহিলার প্রতি ভালো কাজ করে, সে যেন তার মায়ের প্রতি ভালো কাজ করল।" (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৯০৭)
তবে, পর্দা রক্ষা করার জন্য আপনাকে নিম্নলিখিত শর্তগুলো মেনে চলতে হবে:
- প্রয়োজনীয় অংশ ছাড়া অন্য অংশ দেখা যাবে না।
- রোগীকে সতরের পোশাক পরিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
- সঙ্গীর উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়।
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি)-তে আছে: "মহিলা চিকিৎসকের জন্য মহিলা রোগীকে দেখা যায়, তবে পর্দার শর্ত বজায় রাখতে হবে।" (৫/৩২৭)
সারসংক্ষেপ:
পর্দা রক্ষা করে চিকিৎসা করা একটি দ্বিগুণ সওয়াবের কাজ। আল্লাহ তায়ালা আপনার এই নিয়ত ও প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।
৩. কাউকে সিরাত (কুরআন), বোরখা হাদীয়া দিলে, সেই সিরাত যতজন পড়বে বা বোরখা যতদিন পড়বে, এটার সওয়াব আমি পাব কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই সওয়াব পাবেন। এটি সাদাকায়ে জারিয়ার (চলমান দান) অন্তর্ভুক্ত।
হাদিস:
رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ»
"যখন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: চলমান দান, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
- সিরাত (কুরআন) দান করা ইলমের প্রচার ও উপকারের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যতজন এটি পড়বে বা তিলাওয়াত করবে, তত সওয়াব আপনি পেতে থাকবেন।
- বোরখা বা অন্যান্য পোশাক সাদাকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি ব্যবহারের মাধ্যমে সওয়াব পাওয়া যায়।
ফাতাওয়া উসমানি তে বলা হয়েছে: "যে ব্যক্তি কাউকে কুরআন বা দ্বীনি কিতাব হাদীয়া দেয়, সে যতদিন তার থেকে উপকৃত হবে, দাতা সওয়াব পেতে থাকবেন।" (৩/৪৫২)
সারসংক্ষেপ:
সিরাত বা বোরখা হাদীয়া দেওয়া সাদাকায়ে জারিয়া। তাই যতদিন এটি ব্যবহৃত হবে, আপনি সওয়াব পেতে থাকবেন। তবে এখানে নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ—শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করা।
৪. আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে কেউ কোনো দ্বীনী কাজ করলে, সেই কাজ থেকে সে যতদিন আমল করবে, সেটার সওয়াব আমি পাব কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনি সওয়াবের অংশীদার হবেন, তবে এক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা এবং নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাদিস:
رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا»
"যে ব্যক্তি সৎ পথের দিকে আহ্বান করে, তার জন্য সেই পথ অনুসরণকারীদের সমান সওয়াব রয়েছে, তাদের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৪)
- আপনি যদি নিজের আমলের মাধ্যমে, চরিত্রের মাধ্যমে, বা কথা বলে কাউকে দ্বীনী কাজে উদ্বুদ্ধ করেন, তাহলে আপনি সওয়াব পাবেন। তবে শর্ত হলো, আপনি যেন তা প্রদর্শন বা অহংকারের জন্য না করেন, বরং নিয়ত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)-তে বলা হয়েছে: "যদি কেউ কোনো নেক কাজ শুরু করে এবং অন্যরা তাকে দেখে সেই কাজে উদ্বুদ্ধ হয়, তবে সেই উদ্বুদ্ধকারী ব্যক্তিও সওয়াবের অংশীদার হবে, যদি তার নিয়ত এবং উদ্দেশ্য শুদ্ধ হয়।" (২/২৩৫)
সারসংক্ষেপ:
আপনার মাধ্যমে যদি কেউ দ্বীনী কাজে উদ্বুদ্ধ হয়, তবে সেই কাজের সওয়াব আপনি পাবেন, ইনশাআল্লাহ। তবে আপনার নিয়ত শুদ্ধ রাখা প্রয়োজন—যেন ইমানি উত্তেজনা ও খালেস নিয়ত থাকে।
উপসংহার ও পরামর্শ
- নিয়তের গুরুত্ব: সব কাজের মূল হলো নিয়ত। আপনার নিয়ত যদি হয় উম্মাহর কল্যাণ, রোগীর সেবা, এবং পর্দা রক্ষা, তাহলে পুরো কাজটিই ইবাদতে পরিণত হবে।
- ইখলাস বজায় রাখা: যেকোনো সওয়াবের অংশীদার হওয়ার জন্য ইখলাস (একনিষ্ঠতা) অপরিহার্য। কাজ করতে গিয়ে যেন প্রদর্শন বা স্বার্থপরতা না থাকে।
- মহিলা চিকিৎসক হওয়ার ফজিলত: আপনি যদি মহিলা রোগীদের জন্য পর্দার সাথে চিকিৎসা প্রদান করেন, তাহলে এটি সমাজের জন্য একটি বিরাট নেয়ামত। এতে আপনি আপনার পেশার পাশাপাশি দ্বীনও রক্ষা করছেন।
- সাদাকায়ে জারিয়া: কুরআন বা বোরখা হাদীয়া দেওয়ার মতো কাজগুলো সাদাকায়ে জারিয়া। তাই যতদিন তা ব্যবহৃত হবে, আপনার সওয়াব জারি থাকবে।
- উদাহরণ তৈরি করা: আপনি যদি নিজে ইসলামিক পোশাক ও আদর্শ মেনে চলেন, তবে আপনার দেখাদেখি অন্যেরাও উদ্বুদ্ধ হবে। এটি একটি বড় সওয়াবের মাধ্যম।
দোয়া: আল্লাহ তায়ালা আপনার নিয়ত কবুল করুন, আপনার সমস্ত কাজে বরকত দিন, এবং আপনার মাধ্যমে উম্মাহর কল্যাণ করুন। আমিন!
والله أعلم بالصواب