জিন ও মানুষের প্রেম ও বিবাহ কি ইসলামে বৈধ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একটা মেয়ে নাম মেহেরিমা
জ্বিনের নাম ইফরিত বাদশা আল ইবনে সাহাদ
এই জ্বিন নাকি মেয়েটাকে অনেক ভালো বেসে ফেলেছে ৬ বছর বয়সে
মেয়ের যখন বয়স ১১ তখন নাকি সামনে আইছে এক বছর অনেক চেষ্টা করার পরে
মেয়েও নাকি জ্বিন কে ভালো বেসে ফেলেছ
এখন মেয়েও পুরো রাজি
এখন ওদের কি করা উচিত?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ (মেয়ে) ও জিনের মধ্যে প্রেম ও বিবাহের সম্পর্ক ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও অবৈধ। নিম্নে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. জিন ও মানুষের বিবাহের বিধান
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, জিন ও মানুষের মধ্যে বিবাহ বৈধ নয়। কারণ:
-
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا"
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে হলো যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন স্ত্রীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও।” (সূরা রূম: ২১)এখানে ‘তোমাদেরই জাতি’ বলে মানুষকে বোঝানো হয়েছে। জিন জাতি ভিন্ন, তাই তাদের সাথে বিবাহ বৈধ নয়।
-
হাদীসে এসেছে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"الْجِنُّ ثَلَاثَةُ أَصْنَافٍ: صِنْفٌ لَهُمْ أَجْنِحَةٌ يَطِيرُونَ فِي الْهَوَاءِ، وَصِنْفٌ حَيَّاتٌ وَكِلَابٌ، وَصِنْفٌ يَحُلُّونَ وَيَظْعَنُونَ"
“জিন তিন প্রকার: এক প্রকার যাদের ডানা আছে এবং তারা আকাশে উড়ে বেড়ায়, এক প্রকার সাপ ও কুকুর, আর এক প্রকার তারা আবাস করে ও সফর করে।” (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৬/২৫৬)জিনদের বিবাহ তাদের নিজস্ব জাতির মধ্যেই হয়, মানুষের সাথে নয়।
-
হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে:
"وَلَا يَجُوزُ نِكَاحُ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ"
“জিন ও মানুষের মধ্যে বিবাহ জায়েয নয়।” (الفتاوى الهندية: ১/২৭৫, রদ্দুল মুহতার: ৩/২৩)ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
"لَا يَجُوزُ نِكَاحُ الْجِنِّ لِلْإِنْسِيِّ؛ لِأَنَّهُمْ لَيْسُوا مِنْ جِنْسِهِمْ"
“মানুষের জন্য জিনকে বিবাহ করা জায়েয নয়; কারণ তারা তাদের জাতিভুক্ত নয়।” (রদ্দুল মুহতার: ৩/২৩)
২. জিনের সাথে প্রেম ও সম্পর্ক স্থাপনের বিধান
জিনের সাথে প্রেম করা, সম্পর্ক স্থাপন করা বা বিবাহের চেষ্টা করা শিরক ও কুফরীর দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ এতে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভুল ধারণা ও ইবাদতের বিকৃতি ঘটে।
-
জিনের প্রেমে পড়া একটি বিপজ্জনক অবস্থা।
জিনের মাধ্যমে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা শয়তানের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ ابْنِ آدَمَ مَجْرَى الدَّمِ"
“নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্তপ্রবাহের ন্যায় তার ভেতরে চলাচল করে।” (সহীহ বুখারী: ৩২৮১)জিনও শয়তানের দলভুক্ত, তারা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বিপথগামী করে।
-
মেয়ে ও তার পরিবারের করণীয়:
১. তওবা ও ইস্তেগফার করা: এই সম্পর্কের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করা: সালাত জিনের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
৩. আয়াতুল কুরসি ও সূরা ফালাক, নাস পড়া: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পড়ুন।
৪. মেয়েকে জিনের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা: জিনের কোনো আহ্বানে সাড়া না দেওয়া।
৫. আলেম বা পীরের সাহায্য নেওয়া: রুকইয়াহ (দু‘আ দ্বারা জিন দূর করার পদ্ধতি) করানো।
৩. মেয়ের বয়স ও রাজি হওয়ার প্রভাব
মেয়েটির বয়স ১১ বছর হলে সে এখনও নাবালিকা (বালেগ হওয়ার বয়স সাধারণত মেয়েদের ৯ বছর থেকে শুরু)। ইসলামী আইন অনুযায়ী, নাবালিকার পক্ষে কোনো বৈধ স্বামী গ্রহণ বা বিবাহের চুক্তি বৈধ নয়, বরং অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। আর জিনের সাথে বিবাহ তো বৈধই নয়।
তাই মেয়ের ‘রাজি’ হওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
৪. পরামর্শ ও শেষ কথা
- এই সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
- মেয়েটির ওপর জিনের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে রুকইয়াহ করতে হবে।
- পরিবারের উচিত মেয়েটিকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দেওয়া, যাতে সে জিনকে ভয় না পায় বরং আল্লাহকে ভয় করে।
- জিনের নাম (ইফরিত বাদশা আল ইবনে সাহাদ) বলে কোনো জিনের অস্তিত্ব থাকলেও তা মানার কোনো ভিত্তি নেই। জিনেরা মিথ্যা নাম দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়।
মোটকথা: মানুষের জন্য জিনের সাথে বিবাহ বা প্রেম জায়েয নয়। এটি একটি কুসংস্কার ও শয়তানের ধোঁকা। তাই এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা ও আল্লাহর কাছে তওবা করা অপরিহার্য।
সূত্র:
- কুরআন (সূরা রূম: ২১)
- সহীহ ইবনে হিব্বান: ৬/২৫৬
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৭৫
- রদ্দুল মুহতার: ৩/২৩
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪৫৬
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৫৪