ঔষধ কোম্পানির দেওয়া খাবার / উপহার গ্রহণ করা যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এর পাশাপাশি সপ্তাহে ২ দিন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ ভিজিট করেন,
তারা ওষুধ, ছোট খাটো গিফট, খাবার ইত্যাদি দিয়ে থাকেন।
এগুলো নেওয়া কি জায়েজ হবে ?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ওষুধ কোম্পানির দেওয়া খাবার, উপহার ও নমুনা গ্রহণের বিধান নিম্নরূপ:
সাধারণ নীতি
ইসলামে ঘুষ (রিশওয়াত) স্পষ্টভাবে হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিসম্পাত।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫৮০; তিরমিজি, হাদিস নং ১৩৩৬)
ঘুষের মধ্যে কেবল টাকা-পয়সা নয়, বরং এমন কোনো উপহার বা সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত যা গ্রহীতার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ ও হানাফি ফকিহগণ এ ব্যাপারে একমত।
ওষুধ কোম্পানির উপহার ও খাবারের বিধান
ডাক্তার হিসেবে আপনার অবস্থান এমন যে, ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা আপনার কাছে আসেন এবং আপনাকে ওষুধের নমুনা, খাবার, ছোটখাটো উপহার (গিফট) ইত্যাদি দেন। এগুলোর উদ্দেশ্য সাধারণত আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং ভবিষ্যতে তাদের কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করার জন্য প্রভাবিত করা। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ঘুষের শামিল এবং গ্রহণ করা বৈধ নয়।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল হিবা) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
যদি কোনো ব্যক্তি এমন কাউকে উপহার দেয় যার সিদ্ধান্ত তার স্বার্থে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা ঘুষ এবং গ্রহণ করা হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৬/৩৬০)
একই কথা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ডাক্তারের কাছে ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে নিয়মিত উপহার আসা একটি প্রক্রিয়াগত ঘুষ (systematic bribe) হিসেবে গণ্য, কারণ এতে করে ডাক্তার স্বাভাবিকভাবেই ঐ কোম্পানির ওষুধ লিখতে উৎসাহিত হন। মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. ও মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম এই মর্মে ফাতাওয়া দিয়েছেন।
নমুনা ওষুধ ও খাবারের ব্যতিক্রম?
- নমুনা ওষুধ: যদি তা শুধুমাত্র রোগীকে বিনামূল্যে দেওয়ার জন্য হয় (যেমন গরিব রোগীকে দেওয়া), তবে এতে সমস্যা নেই, তবে তা গ্রহণ করে নিজে ব্যবহার করা বা জমিয়ে রাখা যাবে না। তবে বাস্তবে কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের নিজ ব্যবহারের জন্যও নমুনা দেয়, যা উদ্দেশ্যমূলক ওষুধ প্রেসক্রাইব করার পথ প্রশস্ত করে। তাই তা গ্রহণ না করাই উত্তম।
- খাবার ও ছোটখাটো উপহার (যেমন কলম, নোটপ্যাড): যদি এগুলো সরাসরি কোনো শর্ত বা প্রতিশ্রুতি ছাড়া দেওয়া হয় এবং আপনার সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব না ফেলে, তবে কোনো কোনো হানাফি আলিম তা জায়েজ বলেছেন, তবে অধিকাংশ আধুনিক ফকিহ (যেমন মুফতি তাকি উসমানি) বলেন: যেকোনো উপহারই ঘুষের সম্ভাবনা তৈরি করে, তাই তা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলাই উত্তম। বিশেষত সরকারি হাসপাতালে কর্মরত থাকায় আপনার ওপর দায়িত্ব আরও বেশি, কারণ সরকারি কর্মচারীদের জন্য এসব গ্রহণ প্রায়ই নিয়মবহির্ভূত এবং দুর্নীতির শামিল।
সেমিনারের খাবার
যদি ওষুধ কোম্পানিগুলো 'সায়েন্টিফিক সেমিনার' আয়োজন করে, এবং সেখানে আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তবে সে সেমিনারে অংশগ্রহণ করলে আপনি যদি শুধু জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে যান এবং কোনো উপহার বা খাবার এর মূল উদ্দেশ্য না হয়, তবে সেখানে সাধারণ আপ্যায়ন (যেমন লাঞ্চ) গ্রহণ করা জায়েজ হতে পারে** যদি তা কোম্পানির পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো চাপ বা প্রতিদান না থাকে।** তবে অধিক সতর্কতা এই যে, এ ধরনের সেমিনারে না যাওয়াই ভালো, কারণ সেগুলো মূলত বিপণনের কৌশল। কুরআনে আল্লাহ বলেন: “তোমরা সত্য ও ন্যায়ের সাক্ষী হও, আর কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত করো না।” (সূরা মায়িদা: ৮)
উপসংহার
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ওষুধ কোম্পানিগুলো থেকে নিয়মিতভাবে খাবার, উপহার ও নমুনা গ্রহণ করা ইসলামী দৃষ্টিতে বৈধ নয় (হারাম)। কারণ এটি ঘুষের পর্যায়ভুক্ত এবং আপনার পেশাগত সততা ও ন্যায়বিচারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি ছোটখাটো উপহারও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব তৈরি করে। তাই সব ধরনের উপহার ও খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই উত্তম এবং এটি আপনার ঈমান ও পেশাগত সততা রক্ষার জন্য আবশ্যক।
সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো: ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে, আপনি কোনো উপহার, খাবার বা নমুনা গ্রহণ করতে পারেন না, কারণ এটি আপনার ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্বের পরিপন্থী। আর সেমিনারে শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের জন্য যান, কিন্তু সেখানের কোনো উপহার গ্রহণ করবেন না।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)
প্রাসঙ্গিক হানাফি গ্রন্থ ও ফাতাওয়া:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৬/৩৬০, কিতাবুল হিবা
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) – ৬/৩৬০
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি) – খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫২১-৫২২ (আধুনিক চিকিৎসা নীতি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৪০
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – ঘুষ ও রিশওয়াত অধ্যায়
- শারহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী) – হাদিস ও ফিকহী নীতিমালা
সতর্কীকরণ: কোনো অবস্থাতেই ওষুধ কোম্পানির দেওয়া উপহার গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আপনার ও রোগীর অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই সর্বোত্তম পথ হলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা।
— আল্লাহু আলাম