হারাম ইনকাম করা আত্মীর দেওয়া খাবার খাওয়া
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: কোনো আত্মীয়ের উপার্জন (ইনকাম) হারাম হলে, তিনি যদি কোরবানির গোশত বা অন্য কোনো খাবার হাদিয়া/উপহার দেন, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ হবে কি না? এবং যদি জায়েজ না হয়, তাহলে সেই খাবারের কী করবেন?
হানাফি ফিকহের আলোকে এর বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. হারাম উপার্জনকারীর দেওয়া জিনিস খাওয়ার বিধান
ইসলামী শরিয়তে হারাম উপার্জন (যেমন: সুদ, ঘুষ, চুরি, প্রতারণা, হারাম বেচাকেনা) দ্বারা অর্জিত সম্পদ নাজিস (অপবিত্র) এবং তা ভোগ করা কারো জন্য জায়েজ নয়। তবে এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে:
- যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, আত্মীয়ের সমস্ত সম্পদই সম্পূর্ণ হারাম (যেমন: সে শুধু সুদের ব্যবসা করে, বা শুধু চুরি করে), তাহলে তার দেওয়া যেকোনো জিনিস (খাবার, গোশত, টাকা) গ্রহণ করা এবং খাওয়া হারাম। কারণ, নবী করীম (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কবুল করেন না। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই জিনিসেরই নির্দেশ দিয়েছেন, যার নির্দেশ তিনি রাসূলদেরকে দিয়েছেন। তারপর তিনি বলেছেন: হে রাসূলগণ! পবিত্র বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর। আর তিনি বলেছেন: হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু খাও।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৫)-এ ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন: "যদি কোনো ব্যক্তির সম্পদ সম্পূর্ণরূপে হারাম উপার্জন দ্বারা গঠিত হয়, তবে তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করা জায়েজ নয়, বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা নষ্ট করে দেওয়া উচিত।"
- যদি আত্মীয়ের উপার্জনে হালাল ও হারাম উভয়ই মিশ্রিত থাকে (যেমন: তার কিছু টাকা চাকরি থেকে আসে, কিছু টাকা সুদ থেকে আসে), তাহলে তার দেওয়া জিনিস মাকরুহ তানজিহি (অপছন্দনীয়) হবে, তবে সরাসরি হারাম হবে না। এমতাবস্থায় তাকওয়ার খাতিরে তা গ্রহণ না করাই উত্তম। কিন্তু যদি সম্পর্ক রক্ষা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে নিতে হয়, তবে গ্রহণ করলে গুনাহ হবে না। তবে সে জিনিস দান-সদকা করে দেওয়া উচিত নয়; বরং নিজে খাওয়া জায়েজ হবে বলে অধিকাংশ হানাফি ফকীহর মত।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: "হারাম উপার্জনকারীর জন্য তা ভোগ করা হারাম, কিন্তু অপর ব্যক্তির জন্য তা হারাম নয়; বরং মাকরুহ।" (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ৫/৩৫০)
২. কোরবানির গোশতের বিশেষ অবস্থা
কোরবানির গোশত সাধারণত হালাল উপায়ে অর্জিত হয় (নিজ কোরবানি বা হালাল টাকায় কেনা)। তাই:
-
যদি আপনার আত্মীয় নিজে কোরবানি করে থাকেন, তাহলে সেই গোশত হালাল। কেননা কোরবানি একটি ইবাদত এবং এর জন্য তিনি পশু কিনেছেন। সম্ভবত তিনি হালাল টাকাই ব্যবহার করেছেন। যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে তিনি সম্পূর্ণ হারাম টাকায় পশু কিনেছেন, তাহলে সু-ধারণা করা উচিত যে তিনি হালাল উপায়েই কিনেছেন। তাই সেই গোশত খাওয়া জায়েজ।
-
যদি আপনি নিশ্চিত হন যে, তিনি সম্পূর্ণ হারাম টাকায় পশু কিনেছেন, তাহলে সেই গোশত খাওয়া জায়েজ হবে না। তবে কোরবানির পশু হারাম টাকায় কেনা হলে কোরবানি সহীহ হবে না এবং সেই গোশত খাওয়াও হারাম হবে।
৩. ব্যবহারিক সমাধান (যদি খাওয়া অনুচিত হয়)
যদি আপনি মনে করেন যে, আত্মীয়ের উপার্জন সম্পূর্ণ হারাম বা তার দেওয়া খাবার গ্রহণ করা মাকরুহ/হারাম, তাহলে আপনি নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারেন:
১. ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা: তাকে বোঝান যে, হারাম রিযিক থেকে দান করা বা হাদিয়া দেওয়া শরিয়তে সমর্থনযোগ্য নয়। বরং তাকে তওবা করে হালাল উপার্জনের পথ অবলম্বন করতে উৎসাহিত করুন।
২. খাবার ফিরিয়ে দেওয়া: সম্ভব হলে খুব কৌশলে তাকে বুঝিয়ে খাবারটি ফিরিয়ে দিন। যদি এতে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা না করাই ভালো।
৩. খাবারটি অন্যত্র দান করা: যদি খাবারটি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয় এবং আপনি নিশ্চিত যে এটি হারাম, তাহলে আপনি তা নিজে খাবেন না; বরং গরিব-মিসকিন বা পশু-পাখিকে দান করে দিন। তবে নিজে খাওয়া জায়েজ নয়।
ফতোয়ায়ে উসমানী (২/৬৭)-এ এসেছে: "যদি কেউ জানে যে, অমুক ব্যক্তির উপার্জন হারাম, তারপরও সে যদি তাকে কিছু দেয়, তবে তা খাওয়া জায়েজ নয়। বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা নষ্ট করে দেওয়া উচিত। কিন্তু ফিরিয়ে দিলে যদি ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয়, তাহলে তা গরিবকে দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।"
৪. সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া
- যদি সম্পূর্ণ হারাম ইনকাম হয়: তার কোরবানির গোশত বা খাবার খাওয়া জায়েজ নয়। তা ফিরিয়ে দিন বা অন্য কাউকে দিয়ে দিন।
- যদি হালাল-হারাম মিশ্রিত হয়: খাওয়া মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। তবে প্রয়োজনে খেতে পারেন। তবে তাকওয়ার পথ হলো তা না খাওয়া।
- যদি সন্দেহ থাকে: মূলনীতি হলো, কোনো জিনিস হালাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাকে হালাল ধরা হবে। তাই কোরবানির গোশত সাধারণত হালাল টাকায় কেনা হয় বলে ধরে নেওয়া উচিত এবং খাওয়া জায়েজ।
আপনার জন্য নির্দেশনা: আপনার আত্মীয়ের ইনকাম সম্পূর্ণ হারাম বলে যদি আপনার নিশ্চিত ধারণা না থাকে, তাহলে তার কোরবানির গোশত বা খাবার খেতে পারেন। আর যদি নিশ্চিত হন, তাহলে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং কৌশলে তা ফিরিয়ে দিন অথবা অন্য কোনো গরিবকে দান করে দিন। সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে যদি তা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে নিজে না খেয়ে অন্যকে দিয়ে দিন। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।