মেলা উপলক্ষে দাওয়াত দেয়া/খাওয়া যাবে?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমাদের গ্রামে আগে প্রতিবছর হিন্দুদের একটি মেলা হতো। সেই মেলায় হিন্দুরা পূজা করত এবং পূজাকে কেন্দ্র করেই মেলা বসত। পরে কয়েক বছর মেলাটি বন্ধ ছিল।
এ বছর আবার মেলা শুরু হয়েছে। তবে এবার সেখানে কোনো পূজা হচ্ছে না। গ্রামের মুসলমানরাই মেলার আয়োজন করছে। তবে মেলায় লাঠিখেলা, ঢোল-তবলা, গান বাজানোসহ বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
আমার প্রশ্নগুলো হলো—
১. এই ধরনের মেলাকে কেন্দ্র করে আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো কি শরীয়তসম্মত?
২. যদি দাওয়াত না দিই, তাহলে আত্মীয়দের হক নষ্ট করা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক অবহেলা করার গুনাহ হবে কি? কারণ দাওয়াত না দিলে আত্মীয়রা মন খারাপ করে, আমাদের এলাকায় এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় সবার বাড়িতেই আত্মীয়-স্বজন দাওয়াতে আসে।
৩. এই মেলা থেকে প্রয়োজনীয় বা সাধারণ জিনিসপত্র কেনাকাটা করা কি জায়েজ?
৪. বাচ্চারা অন্যদের দেখে মেলা থেকে খেলনা কিনতে চায়। তাদের জন্য এই মেলা থেকে খেলনা কিনে দেওয়া কি জায়েজ?
৫. শুধু খেলনা বা অন্য বৈধ জিনিস কিনে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাচ্চাদের এই মেলায় নিয়ে যাওয়া কি জায়েজ?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী নীতি বিবেচনা করতে হবে—
১. মেলার প্রকৃতি ও শরয়ী বিধান
প্রথমত, উক্ত মেলা মূলত হিন্দুদের পূজা-অর্চনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। পরে তা বন্ধ ছিল, বর্তমানে মুসলমানরা আয়োজন করছে এবং সেখানে পূজা না থাকলেও রয়েছে লাঠিখেলা, ঢোল-তবলা, গান-বাজনা ইত্যাদি।
এ ধরনের অনুষ্ঠান শরীয়তে নাজায়েয বলে গণ্য হবে, কারণ—
-
এতে মুশরিকদের উৎসবের সাদৃশ্য (তাশাব্বুহ বিল কুফফার) বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ»
“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আবূ দাউদ, হাদীস সহীহ) -
এতে গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র রয়েছে, যা অধিকাংশ সালাফী আলিমের মতে হারাম। ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, আলবানী, ইবনু বায, ইবনু উসাইমীন প্রমুখ গান-বাজনাকে হারাম বলেছেন।
-
মেলাটি মূলত শিরকী উৎসবের স্থানান্তর, যা মুসলমানদের জন্য অংশগ্রহণ করা জায়েয নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন,
“মুসলিমদের জন্য কাফিরদের কোনো উৎসবে অংশগ্রহণ করা বা তাদের সাহায্য করা জায়েয নয়, এমনকি যদি উৎসবের ধর্মীয় দিকটি বাদ দেওয়া হয় তবুও।” (ইক্বতিদা আস-সিরাত আল-মুস্তাকীম, ১/২০৭)
২. আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেওয়া (প্রশ্ন ১ ও ২)
উত্তরঃ এই মেলাকে কেন্দ্র করে আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেওয়া জায়েয নয়। কারণ এটা এমন একটি অসৎ অনুষ্ঠানকে সমর্থন ও প্রচারের শামিল। এতে অংশগ্রহণ না করলে আত্মীয়তার হক নষ্ট হবে না, বরং আপনি তাদেরকে সৎপথে দাওয়াত দিতে পারেন। যদি তারা মন খারাপ করে, তবে তা তাদের দায়িত্ব, আপনার নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন,
“لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق”
“সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (বুখারী, মুসলিম)
বরং আপনি তাদেরকে দ্বীনের সঠিক পথে আহ্বান করুন, মেলার অপকারিতা বোঝান।
৩. মেলা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা (প্রশ্ন ৩)
উত্তরঃ মেলা থেকে সাধারণ জিনিসপত্র কেনা-বেচা নাজায়েয হলে মাকরূহ বা হারাম হবে। কারণ—
- এটা মেলা অনুষ্ঠানকে বৈধতা দেওয়ার শামিল।
- মেলায় গান-বাজনা ও হারাম কার্যকলাপ চলছে, সেখানে গিয়ে কেনাকাটা করা গুনাহের কাজে অংশগ্রহণ। কুরআনে এসেছে,
“وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ”
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সাহায্য কর, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।” (সূরা মায়িদা ৫:২)
সুতরাং মেলা থেকে কেনাকাটা না করাই উত্তম, বিশেষ করে যদি অন্যত্র সহজলভ্য হয়।
৪. বাচ্চাদের জন্য খেলনা কেনা (প্রশ্ন ৪)
উত্তরঃ যদি খেলনা বৈধ হয় (যেমন পুতুল নয় যা আকৃতির কারণে নিষিদ্ধ), তবুও এই মেলা থেকে কেনা জায়েয নয়। কারণ—
- খেলনা কেনার জন্য মেলায় যাওয়া মানে সেই হারাম পরিবেশে উপস্থিত হওয়া, যা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর।
- শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন, “যে স্থানে হারাম কাজ হয়, সেখানে যাওয়া জায়েয নয়, এমনকি বৈধ জিনিস কেনার জন্যও।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২/২১৩)
৫. বাচ্চাদের মেলায় নিয়ে যাওয়া (প্রশ্ন ৫)
উত্তরঃ একেবারেই জায়েয নয়। কারণ—
- শিশুরা গান-বাজনা, বেহায়াপনা, ও অবৈধ বিনোদন দেখে প্রভাবিত হবে।
- তাদেরকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেখানে আল্লাহর নাফরমানি হয়, তা পিতামাতার জন্য গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন,
“كلكم راعٍ وكلكم مسئول عن رعيته”
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী, মুসলিম)
সারসংক্ষেপ
- মেলাকে কেন্দ্র করে দাওয়াত দেওয়া: নাজায়েয।
- দাওয়াত না দেওয়ায় আত্মীয়তার হক নষ্ট হবে না: তারা নাফরমানি চাইলে তা মানা জরুরি নয়।
- মেলা থেকে কেনাকাটা: নাজায়েয (গুনাহে সহযোগিতা)।
- খেলনা কেনা/বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া: নাজায়েয (শিশুর ঈমান ও চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর)।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।