যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া কেউ খারাপ ব্যবহার করার পর তার কথা অন্যর কাছে শেয়ার করলে কি গীবত হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১) কেউ যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া খারাপ ব্যবহার করে & আমি কষ্ট পেয়ে আমার হাসব্যান্ডের কাছে ওর ব্যাপারে রেগে অনেক কিছু বলি,যেমন-
ও একটা বলদ,গাধা.. ওকে থাপরাইতে পারলে ভাল্লাগতো
এমনকি আমি যদি আমার ক্লেজ ফ্র্যান্ডের কাছেও এভাবে বলি
আমি কি গীবত করে ফেলছি?
২) রাগের মূহুর্ত কিভাবে ডিল করা উচিত?
একদমি চুপ থাকা? নাকি কিছু নিজের হয়ে বলা?
নাকি সামনে থেকে চলে আসা?
৩) যে আমাকে এরকম বলেছে, ও মাফ না চাওয়া অবধি আমার ওর সাথে কথা বলা উচিত? যদি আত্নীয় হয় তো?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১) আপনার কথা কি গীবত হয়েছে?
হ্যাঁ, আপনি যে কথাগুলো বলেছেন (যেমন “বলদ”, “গাধা”, “থাপরাইতে পারলে ভালো লাগতো”) তা গীবতের অন্তর্ভুক্ত।
কারণ:
গীবতের সংজ্ঞা হলো: কোনো মুসলিমের অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা যা সে শুনলে অসন্তুষ্ট হবে—সেটা সত্য হলেও (মুসলিম শরিফ: ২৫৮৯; মিশকাত: ৪৮৪৩)। আপনি এখানে তার দোষ বা খারাপ গুণ বর্ণনা করছেন, যা তাকে কষ্ট দেবে। এমনকি যদি আপনি শুধু “বলদ” বা “গাধা” বলে থাকেন, তবুও তা গীবত বা অপমান (সাব্ব) হিসেবে গণ্য হবে, যা আরও বড় গুনাহ।
কুরআন ও হাদিসের দলিল:
- আল্লাহ বলেন: “আর তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাতে দোষ বর্ণনা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণাই করো।” (সুরা হুজুরাত: ১২)
- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “গীবত হলো তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে।” (মুসলিম)
তবে ব্যতিক্রম:
যদি আপনি তার অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য বা তার অন্যায় প্রতিরোধের জন্য কোনো ওলি-মুরুব্বি বা বিচারকের কাছে অভিযোগ করেন, তবে তা গীবত হবে না। কিন্তু আপনি এখানে স্বামী ও বান্ধবীর কাছে শুধু রাগ দেখিয়ে অপমান করছেন—এটি বৈধ নয়।
সুতরাং:
আপনি গীবত করেছেন। এখন তওবা করুন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং সম্ভব হলে যাকে নিয়ে কথা বলেছেন তার কাছ থেকে ক্ষমা নিন (যদি তার জানা গিয়ে ফিতনা সৃষ্টি না হয়) অথবা অন্তত আল্লাহর কাছে তওবা করে তার জন্য দোয়া করুন।
২) রাগের মুহূর্তে কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
রাগান্বিত অবস্থায় করণীয়:
ক. চুপ থাকা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন চুপ থাকে।” (মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৯৪; সহিহুল জামি: ৬৯৩)
খ. নিজের অবস্থান পরিবর্তন করা:
“যদি তোমাদের কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়, তবে সে যেন বসে যায়; যদি বসা অবস্থায় হয়, তবে শুয়ে যায়।” (আবু দাউদ: ৪৭৮২)
গ. অজু করা:
“রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে হয়, আর শয়তান আগুনের তৈরি। তাই পানির মাধ্যমে তা নিভিয়ে ফেল।” (আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
ঘ. সামনে থেকে চলে আসা:
রাগান্বিত অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত বা কথা না বলাই উত্তম। সাময়িকভাবে সেই স্থান ত্যাগ করে নিজেকে শান্ত করা উচিত।
সারসংক্ষেপ:
“একদম চুপ থাকা” বা “সামনে থেকে চলে আসা”—দুটোই উত্তম। “নিজের হয়ে কিছু বলা” বলতে যদি আপনি রাগের বশবর্তী হয়ে অন্যায় কথা বা গালি বোঝান, তবে তা নিষিদ্ধ। যদি আপনি ন্যায়সংগত প্রতিবাদ শান্তভাবে করেন, তবে তা জায়েজ, কিন্তু রাগের মাথায় তা না করাই ভালো।
৩) যে আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, সে মাফ না চাওয়া পর্যন্ত কথা না বলার বিধান কী? বিশেষ করে আত্মীয় হলে।
ইসলাম ধৈর্য ও ক্ষমার নির্দেশ দেয়, বিশেষ করে আত্মীয়দের ব্যাপারে।
- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তিন দিনের বেশি ভাইদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হালাল নয়।” (বুখারি: ৬০৭৭; মুসলিম: ২৫৬০)
- আরও বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (বুখারি: ৬১৩৮)
সুতরাং:
- যদি সে মাফ না চায়, তবুও আপনি তার সাথে কমপক্ষে সালাম ও প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন। সম্পূর্ণভাবে কথা বন্ধ রাখা হারাম, বিশেষ করে আত্মীয়ের ক্ষেত্রে।
- তবে যদি তার আচরণ আপনার ধর্ম বা ইজ্জতের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে আপনি তাকে পরামর্শ দিতে পারেন, কিন্তু সম্পর্কচ্ছেদ নয়।
- সবচেয়ে উত্তম হলো: আপনি নিজে ক্ষমা করে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান চাওয়া। কুরআনে এসেছে: “তারা যেন ক্ষমা করে দেয় এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন?” (সুরা নূর: ২২)
উপসংহার:
আপনি তার মাফ চাওয়ার অপেক্ষা না করে নিজে উদ্যোগ নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করুন। যদি তিনি না মানেন, তবে আপনি সালাম ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখুন।
আল্লাহ তওবা কবুল করুন এবং আমল করার তাওফিক দিন।