পিতা-মাতার সাথে রাগ, বিরক্তি ও নাশুকরি থেকে বাঁচার উপায়।

Waswasa-OCD · Hanafi

Question No: 2822
Questioner: No name
Question Asked: 17 Jul 2026, 10:50 PM
Reviewed & Published: 17 Jul 2026, 10:54 PM
Views: 29
Tokens: 3,937
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
উস্তাজ আমি কেনো যেনো খুব সহজে আব্বু আম্মুর সাথে রেগে যাই। সহজে রাগ উঠে থাকে। বিরক্ত লাগে কেনো যেনো সব কিছু। খুব বিরক্তি আর অধৈর্য প্রকাশ করি। নাশুকরি করি। আমি কি কর‍তে পারি? আমাকে একটু নসীহাহ দিন

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় ভাই, আপনার সমস্যা বুঝতে পেরেছি। আপনি নিজেই অনুভব করছেন যে আপনি খুব সহজেই বাবা-মায়ের সাথে রেগে যান, বিরক্ত হন, অধৈর্য হন এবং নাশুকরি (অকৃতজ্ঞতা) প্রকাশ করেন। এটি একটি সাধারণ মানবিক দুর্বলতা, তবে ইসলাম এ ব্যাপারে খুব স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। আপনি যেহেতু এই সমস্যা সমাধানে আগ্রহী, তাই আল্লাহর রহমতে ইনশাআল্লাহ আপনি পরিবর্তন আনতে পারবেন।

নিচে কুরআন-হাদীস ও হানাফি কিতাবের রেফারেন্সসহ কিছু নসীহাহ দেওয়া হলো:

১. রাগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব ও উপায়

রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ» – “নিশ্চয় রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে।” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৭৮০; সহীহুল বুখারি ও মুসলিমের ভাষ্য অনুযায়ী)

তাই রাগ উঠলে করণীয়:

  • أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ পড়া। রাসূল ﷺ বলেছেন: রাগ উঠলে এই দোয়া পড়লে রাগ দূর হয়ে যায়। (সহীহুল বুখারি, হাদীস: ৬১১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬১০)
  • যদি দাঁড়ানো থাকেন, তাহলে বসে পড়ুন; আর যদি বসা থাকেন, তাহলে শুয়ে পড়ুন। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৭৮২; মুসনাদে আহমাদ)
  • চুপ থাকা: রাগের সময় কথা না বলা। রাসূল ﷺ বলেছেন: “তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন চুপ থাকে।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৪১৮৪; মুসনাদে আহমাদ)

২. পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও ধৈর্য

পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা ফরজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৩) – “তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।”

তিনি আরও বলেন: إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا – “তাদের কেউ বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ্’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৩)

সুতরাং রাগের কারণে বাবা-মাকে ধমক দেওয়া, বিরক্তি প্রকাশ করা, উচ্চস্বরে কথা বলা—এগুলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (৫/২৫৪) এবং ফাতাওয়া আলমগীরি (৫/৩৫১) তে পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণকে কবিরা গুনাহ বলা হয়েছে।

৩. নাশুকরি (অকৃতজ্ঞতা) থেকে বাঁচার উপায়

নাশুকরি অর্থ আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করা বা তার শুকর না করা। পিতা-মাতার প্রতি অকৃতজ্ঞতা একটি বড় গুনাহ। হাদীসে এসেছে, রাসূল ﷺ বলেছেন: «أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ: الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ» – “বড় বড় গুনাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো: আল্লাহর সাথে শরিক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।” (সহীহুল বুখারি, হাদীস: ৬৯২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮৭)

নাশুকরি থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় الحَمْدُ لِلَّهِ বলার অভ্যাস করুন। মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)-এ সূরা ইবরাহীমের ৭ নং আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে: لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ – শুকর করলে আল্লাহ নেয়ামত বাড়ান, আর অকৃতজ্ঞ হলে শাস্তি দেন।

৪. সহজে বিরক্তি ও অধৈর্য দূর করার আমল

  • অজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়া: রাগ দূর করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকরী। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ২৬৪)
  • দোয়া পড়া: رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا – “হে আমার রব, আমার এবং আমার পিতা-মাতার প্রতি ক্ষমা করুন এবং তাদের প্রতি দয়া করুন যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৪)
  • ইস্তিগফার করা: বেশি বেশি أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ পড়লে হৃদয়ের অস্থিরতা দূর হয়।
  • বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরা, তাদের হাত চুমু দেওয়া, তাদের সেবা করা: এতে আপনার মন নরম হবে এবং ভালোবাসা বাড়বে।

৫. বিশেষ নসীহত (হানাফি কিতাবের আলোকে)

  • বাহিশ্তি জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ পিতা-মাতার হকের অধ্যায়ে বলা হয়েছে: “পিতা-মাতার সঙ্গে কখনও রাগ করা উচিত নয়। তাদের কোনো কথা খারাপ লাগলেও চুপ থাকা ও ধৈর্য ধরা উচিত।”
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকী উসমানি) তে এসেছে: পিতা-মাতার প্রতি রাগ ও অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা عُقُوق (অবাধ্যতা) এর অন্তর্ভুক্ত, যা কবিরা গুনাহ।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি শফি রহ.)-তে বলা হয়েছে: রাগ উঠলে সাথে সাথে “আউযু বিল্লাহ” পড়ুন এবং স্থান পরিবর্তন করুন।

৬. অবশেষে নিজের জন্য দোয়া করুন

আপনি যেহেতু বুঝতে পেরেছেন এবং পরিবর্তন চান, সেটাই সবচেয়ে বড় নেয়ামত। প্রতিদিন রাতে এই দোয়া পড়ুন: اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي، وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي، وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي إِلَيْهَا مَرْجِعِي، وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِي فِي كُلِّ خَيْرٍ، وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِي مِنْ كُلِّ شَرٍّ (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭২০)

আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও শান্ত দিল দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.